লেখকদের ঘরবাড়ি

প্রখ্যাত কথা সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৪৯ সালের জানুয়ারী মাসের এক রোববারে তাঁর ডায়েরিতে লিখছেন, ‘বাড়ি চাই। এ মাসের মধ্যেই। ভোরে উঠে বরানগর রওনা। শরীর ভালো না। শচীনবাবু মিনিট দশেক পরে এলেন। নিজের অংশ ভালো-ভাড়াটে অংশ যেমন তেমন। ভাড়া ৬০ টাকা, অগ্রীম ছয়‘শ টাকা। তাই সই! পড়েছি ফাঁদে। ’

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস

শওকত আলী

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ডায়েরিতে লিখছেন ভাড়াটে বাড়ি পাওয়ার জটিলতার কথা। এরও ১৪ বছর পর তেমনি এক বাড়িত ঘুমন্ত শিশু সন্তানদের পাশে খাবার গুছিয়ে রেখে রান্নাঘরের দরজার ফাঁক ফোকড় চওড়া টেপ দিয়ে ভালো করে আটকে দিয়ে স্টোভের চাবি খুলে দিচ্ছেন আরেক প্রখ্যাত আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্ল্যাথ। তারপর নিজের মাথাটা সেই স্টোভে ঢুকিয়ে দিয়ে পৃথিবীকে অবলীলায় বলে দিচ্ছেন-গুড বাই।
সিলভিয়া প্ল্যাথ যখন পৃথিবীকে বিদায় জানাচ্ছেন তখন হয়তো ওই কাছাকাছি সময়ে ঢাকা শহরের টিকাটুলি এলাকায় ‘বিরতি ভিলা’ নামে এক চারতলা বাড়ির নিচ তলায় বসবাস করতেন বাংলা সাহিত্যের আরেক দিকপাল সাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। জগন্নাথ কলেজে অধ্যাপনার কাজ নিয়ে সেই কুঠুরিটা ভাড়া নিয়েছিলেন তিনি।তখনও বাড়িটার চারপাশ ছিলো খোলামেলা।

অস্কার ওয়াইল্ডের ঠিকানা

লেখক আর কবিদের ঘরবাড়ি নিয়ে ছড়িয়ে আছে এমনি সব গল্প। জড়িয়ে আছে তাঁদের জীবনের ভয়াবহ সব ঘটনার ইতিহাস। তাদের মধ্যে কে্উ ছিলেন দ্বীপবাসী, সুদৃশ্য বাংলো বাড়িকে অতিবাহিত করেছেন জীবন। কেউ লিখে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে থাকছেন প্রাসাদসম বাড়িতে আবার কেউ জীবনের শেষ সময় অতিক্রম করেছেন হোটেলে, মেসে। আবার কারো ঠাঁই হয়েছে উন্মাদ আশ্রমে। আসলে মানুষের ঘরবাড়ির গল্প সত্যিই বড় অদ্ভুত।আরেকটু বেশী অদ্ভুত হয়তো পৃথিবীজোড়া লেখকদের ফেরার ঠিকানা।
প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে এবার রইলো খ্যাতিমান লেখকদের ঘরবাড়ি নিয়ে নানা কথা।
হ্যারি পটারের গল্প লিখে বিশ্ব বিখ্যাত লেখক জে. কে রাউলিংস স্কটল্যান্ডের এডিনবার্গে একটা বাড়ি কিনেছেন ২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে। তাঁর এই ঠিকানাটিকে বাড়ি বললে বোধ হয় অপমানই করা হয়ে যায়। বলা উচিত প্রাসাদ। পটার-কাহিনীর অনুসরণে ওই বাড়ির ভেতরে তৈরী করেছেন ছোট্ট পাথরের কুড়েঘর। অথচ মৃত্যুর আগে এক অখ্যাত হোটেল কামরায় শুয়ে অস্কার ওয়াইল্ড ঘরের ওয়াল পেপারের দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করেছিলেন ‘হয় এই ওয়ালপেপার ঘর থেকে বিদায় নেবে অথবা আমি’।

ডেথ হাউজ

ফ্রাঞ্জ কাফকা

নাট্যকার, উপন্যাসিক অস্কার ওয়াইল্ড, উশৃংখল অস্কার ওয়াইল্ড, সমকামী অস্কার ওয়াইল্ড। তাকে নিয়ে সাহিত্যের অঙ্গনে যেমন আলোচনার কোনো শেষ নেই তেমনি অফুরান সমালোচনা। জীবনের শেষটা হোটেলে থাকলেও তার কিন্তু বাড়ি ছিলো ইংল্যান্ডের চেলসা অঞ্চলের টাটে স্ট্রিটে। লাল ইটের তৈরী বাড়ি। সে বাড়ির এক তলায় হালকা হলুদ রঙ করা লেখার ঘরে বসে ওয়াইল্ড লিখেছিলেন তাঁর সেই বহুল আলোচিত উপন্যাস ‘পিকচার অফ দি ডরিয়ান গ্রে’। ১৮৮৪ সালে নববিবাহিত স্ত্রী কন্সটান্সকে নিয়ে সেই বাড়িতে উঠেছিলেন অস্কার ওয়াইল্ড।এখানে বসেই লিখে ফেলেছিলেন ‘লেডি উইন্ডারমেয়ার‘স ফ্যান’ আর ‘এ ওম্যান অফ নো ইম্পর্টেন্স’-এর মতো আলোচিত নাটক।
ওয়াইল্ডের সেই একতলার ঘর এখন পরিণত হয়েছে এক বড় সাইজের বেডরুমের ফ্ল্যাটে। সেখানে রয়ে গেছে সেই ওক কাঠের তৈরী মেঝে আর উঁচু ছাদ। বাড়িটি বিক্রির জন্য নতুন মালিক দর হেঁকেছে এক মিলিয়ন পাউন্ড।

লোরকার ঘরবাড়ি

লোরকা

পাশ্চাত্যের সাহিত্যে জটিলতম লেখকদের একজন ছিলেন ফ্রাঞ্জ কাফকা। অস্কার ওয়াইল্ডের মতো লাল ইঁটের দালানে জীবন কাটানোর সৌভাগ্য হয়নি তার। ১৯২৪ সালে টিবি রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ঠাই হয়েছিলো অষ্ট্রিয়ার কোলস্ট্রেনবার্গ শহরের কাছে কেরলিং শহরের এক স্যানেটরিয়ামে। সেটাই ছিলো তাঁর ‘ডেথ হাউজ’। সাত বছর টিবি রোগের সঙ্গে বসবাস করেন ‘দি ট্রা্য়াল’ উপন্যাস খ্যাত কাফকা। তিনতলা সেই বিষন্ন বাড়িটি এখন অনেক বদলে গেছে।যে ছোট ঘরটায় কাফকা থাকতেন সেটা চলে গেছে ভাড়াটেদের দখলে। তবে সেখানে কাফকার স্মৃতি ধরে রাখতে একটি স্মৃতি ঘর তৈরী করা হয়েছে। দরজার বাইরে লেখা আছে, ‘ডেথ হাউজ অফ ফ্রাঞ্জ কাফকা’।
সেই ঘরের লাগোয়া একটি সংকীর্ণ ব্যালকনি আছে। টিবি রোগীদের জন্য রোদ খুব উপকারী বলে চিকিৎসকরা তখন ব্যবস্থাপত্র লিখে দিতেন। কাফকাকেও সেই বারান্দায় ১৯২৪ সালের এপ্রিলের রোদে খালি গায়ে বসে থাকতে দেখা যেতো।
সেই স্মৃতি-ঘরে পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে লেখা শেষ চিঠি, হাসপাতালের কাগজপত্র, অন্যান্য লেখার পান্ডুলিপি সাজিয়ে রেখে দেয়া হয়েছে। আছে তাঁর ডেথ সার্টিফিকেটও।

রাউলিংসের প্রাসাদ

কলকাতার মুক্তারাম স্ট্রিটের সেই মেসবাড়ি আছে কি না জানি না, তবে জানি শিবরাম চক্রবর্তী নেই। অকৃতদার মানুষটি একটা জীবন পার করে দিয়েছিলেন শহর কলকাতার মেসের ছোট্ট এক কুঠুরিতে। কুঠুরির দেয়ালে পরিচিত মানুষদের ঠিকানা
আর ফোন নম্বর লিখে রাখতেন, চৌকির তলায় জমিয়ে রাখতেন মুর্গির হাড় সারমেয়দের খাওয়ানোর জন্য। পৃথিবীকে বিদায় বলার সময়ও জ্বরের ঘোরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলেন সেই মেসের-ই বাথরুমে।ওই ঘরে বসেই শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছেন বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সব হাসির গল্প। তৈরী করেছেন অসাধারণ সব চরিত্র-হর্ষবর্ধন, গোবর্ধন, বিনু, ইতুকে।

রাউলিংস

লন্ডনের প্রিমরোজ হিলের ২৩ নম্বর ফিটজিরয় রোডের একটি বাড়িতে থাকতেন প্রখ্যাত ইংরেজ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস। স্বামী কবি টেড হিউজেসের সঙ্গে ১৯৬২ সালে সম্পর্কের আলো নিভিয়ে দিয়ে সিলভিয়া প্ল্যাথ তখন বাচ্চাদের নিয়ে বাড়ি খুঁজছেন। হঠাৎই জানতে পারলেন ইয়েটসের সাবেক বাড়িটি লিজ দেয়া হবে। আর এক মুহূর্ত দেরী করলেন না তিনি। পাঁচ বছরের চুক্তিতে উঠে এলেন সেই কবি ভবনে। ফিটজিরয় রোডের বাড়িতে উঠে বেশ অনেকদিনই আনন্দে দিন কাটিয়েছেন প্ল্যাথ। তার লেখাপড়া করার ঘরটি পূবমুখী। ফলে সকালবেলা রোদ এসে ভরে যেতো ঘরে। ঘর লাগোয়া বারান্দাটিও ছিলো কবির খুব প্রিয়। রাতে সেখানে বসেই দেখতেন আকাশের চাঁদের শোভা। কিন্তু এখানেও কী তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিলো জীবনানন্দের সেই অমোঘ লাইন-‘জ্যোৎস্নায় দেখিলো সে কোন ভূত?’ আর ভূত যদি না-ই দেখবেন তাহলে কেন ১৯৬৩ সালের ১১ ফ্রেব্রুয়ারী সেই বাড়িতেই স্টোভের ভেতর মাথা ঢুকিয়ে নির্মম মৃত্যুকে ডেকে নিলেন তিনি? ‘শিশুটিও ছিলো’ জীবনানন্দ লিখেছেন। তিনি কি প্ল্যাথের মৃত্যু দৃশ্য নির্মাণ করে গিয়েছেন তাঁর কবিতায়! সন্তানদের জন্য খাবার ঠিক করে রেখে সিলভিয়া ঘরের একটা জানালা খুলে দিলেন। তারপর ধীর পায়ে হেঁটে চলে গেলেন রান্নাঘরের দিকে। তারপর? তারপর রান্নাঘরের সব দরজা জানালা বন্ধ করে দিলেন। ফাঁক ফোকড় বন্ধ করলেন মোটা টেপ আর কাপড় দিয়ে। চালু করলেন গ্যাস স্টোভ।তারপর সম্ভবত ঠান্ডা মাথায় নিজের মাথাটা ঢুকিয়ে দিলেন ভেতরে। তাঁর নিঃশব্দ কান্নার সঙ্গে মিশে গেলো ফিটজিরয় রোডের সেই বাড়ির রান্নাঘরের বিষাক্ত বাতাস।

বিদায় সিলভিয়া প্ল্যাথ

লোরকা তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, ‘ওরা আমাকে কোথাও খুঁজে পেলো না’। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে কি এই পৃথিবীর আকাশ, বাতাস, বিষন্ন মেঘ, নির্ঘুম শহর, ঘাতকরা কেউ কোনদিন খুঁজে পেয়েছিলো? লোরকাকে কি খুঁজে পাওয়া যায়? কিন্তু তার বাড়িঘরের পুরোটাই পাওয়া যায় স্পেনের সেই গ্রাম আর শহরে। লোরকা বড় হয়ে উঠেছিলেন ফুয়েন্তা ভ্যাকারুস নামে এক গ্রামে।সেবুজ দরজা কপাটসহ সেই দোতলা বাড়িতে কেটেছে লোরকার শৈশব, কৈশোর।
গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে ফিরতে দেখা পাওয়া যায় ফিলডুরিবিওর সেই বাড়ি যেখানে বসে তিনি লিখেছিলেন বিখ্যাত নাটক ‘হাউজ অফ বার্নার্ডা আলবা’। লোরকার বাড়ি পড়ে পরিণত হয়েছে জাদুঘরে।

মস্কো শহরের কার্সেনিয়া পার্সেনিয়া স্ট্রিটের ভেতরে গা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অ্যাপার্টমেন্ট। একদা ঘর গড়েছিলেন এখানে রুশ সাহিত্যের প্রধানতম কবি ও নাট্যকার ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি। এই একই বাড়িতে আত্নহত্যাও করেছিলেন তিনি পিস্তলের গুলিতে।
সেই ফ্ল্যাট বাড়িটি এখন রুশ সরকারের অধীনে জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে।
১৯২৬ সালে মায়াকোভস্কি জেনড্রিকভ লেনে একটি চার বেডরুমের বাড়িতে ছিলেন। সেই বাড়িটিও এক সময় মস্কো শহরের সংস্কৃতি ও সাহিত্য চর্চার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

সিলভিয়া প্ল্যাথ

এডগার অ্যালান পো‘র বাড়িটি কি ভৌতিক আকৃতির ছিলো? মোটেই না।১৮৩০ সালে তৈরী হয়েছিলো সেই বাড়ি। ইঁটের তৈরী বাড়ির নম্বর ছিলো ৩ এমিটি স্ট্রিট। পো তাঁর পরিবার নিয়ে এই বাড়িতে ওঠের ১৮৩৩ সালে।
আড়াই তলা বাড়ির ছাদ ছিলো লোহার ফ্রেম দিয়ে তৈরী। বাম দিকে ছিলো মূল প্রবেশ দ্বার। তবে বাড়ির দক্ষিণে কোনো জানালা ছিলো না। আমেরিকার পশ্চিম বাল্টিওেমার রাজ্যে অবস্থিত এই বাড়িটি এখনো আছে।
শুরুতে বলছিলাম ঢাকার টিকাটুলির বিরতি ভিলার কথা। সেখানে থাকতেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। পরে সেই ভবনেই বসবাস করতে শুরু করেন বাংলা সাহিত্যের আরেকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক শওকত আলী। চারতলা বিরতি ভিলা‘র প্রায় পরিত্যাক্ত ঘরেই জীবনের শেষ সময় কাটিয়ে গেছেন ‘প্রোদষে প্রাকৃতজন’-এর লেখক। সঙ্গে লাগোয়া ছোট বারান্দা, হাওয়ার প্রায় প্রবেশ নিষেধ সেই ঘরের বেশীর ভাগ জায়গা দখল করেছিলো বইয়ের সেলফ আর অষুধ। দেয়ালে ঝুলতো স্ত্রী‘র বাঁধানো ছবি।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল