বসন্তের নিউইয়র্ক

স্মৃতি সাহা

জেগে থাকা নিউইয়র্ক শহর। কবি লোরকার ভাষায় স্লিপলেস সিটি। সেই শহরে স্বপ্নও যেন নির্ঘুম। এই শহরের দিনরাত্রির রোজনামচা স্মৃতি সাহার কলমে প্রাণের বাংলায় নিউইয়র্ক থেকে ধারাবাহিক ভাবে।

উত্তর গোলার্ধের শীতের দৈর্ঘ্য আর তীব্রতায় মনের অসাড়তা আসা খুব স্বাভাবিক। এরমধ্যে এবার শীত প্রলম্বিত, তাই চারপাশের ধূসরতা মননে ছাই রঙের স্কেচ এঁকে চলছে প্রতিনিয়ত। সেই সেপ্টেম্বর থেকে হালকা শীতের শুরু, এরপর ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি’র তীব্র শীত, তুষারপাত। এরপর মার্চের মাঝামাঝি থেকে তীব্রতা একটু কমলেও সত্যিকারের দাপট কমে এপ্রিলে এসে। তবে পুরোপুরিভাবে শীত বিদায় নিতে মে মাসের মধ্যভাগ লাগিয়ে ফেলে। সাত মাসের অধিক সময় শীতের রাজত্ব চলে নিউইয়র্কে। ফেব্রুয়ারি শেষে মন যখন তীব্র শীতলতায় অসাড় ঠিক তখন মাটি ফুঁড়ে এক স্বর্গীয় দূত হাজির হয়। একটু উষ্ণতা আর বৃষ্টিজলের আভাস পেলেই কয়েকটি সবুজ পাতা আর হলদে কলি চোখ মেলে দীর্ঘ শীতের ঘুম শেষে। যদিও অনান্য ফুল/পাতা তখনো শীতঘুমে ব্যস্ত। আর সেই সবুজ পাতার কোলে যে হলুদ ফুলগুলো খিলখিলিয়ে হাসে সেটা হলো ড্যাফোডিল। তাই নিউইয়র্কে ড্যাফোডিলকে ধরা হয় বসন্তের আগমন ধ্বনি হিসেবে।
শীতের অসাড়তা কাটিয়ে উঠে গুটি গুটি পায়ে বসন্ত প্রায় দুয়ারে এসে হাজির হয়েছে। হলুদ ড্যাফোডিল মাটি ফুঁড়ে দেখা দেওয়া শুরু করেছে। বসন্ত প্রায় সমাগত। বসন্তে নিউইয়র্ক যেন আফ্রোদিতির মতো রূপসী হয়ে ওঠে। শীতে দীর্ঘসময় আভরণহীন প্রকৃতি যেন নিজেকে সাজিয়ে তোলে অক্লেশে। রুক্ষ বৃক্ষরাজীতে প্রাণের ছোঁয়া লাগতেই যেন হেসে ওঠে প্রকৃতি। চারদিকের হরেক রঙের সমাহার দেখে চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়ে। মার্চের মধ্যভাগে এখানে বসন্ত চলে আসে। প্রায় তিন মাস স্থায়ী হয় বসন্তকাল। আর এই বসন্তের পুরোটা সময়জুড়ে চলে ফুলের ফোটার মহা উৎসব। যাকে নিউইয়র্কে বলা হয় ” স্প্রিং ব্লুমিং”। আগেই বলেছি বসন্তের শুরুটা হয় ড্যাফোডিল পুণ্য স্পর্শে। এরপর একে একে আইরিশ, ফর্সিথিয়া,স্কিলা, এ্যানেমন নিজেদের রঙ ছড়িয়ে নিউইয়র্ক শহরকে রাঙাতে থাকে।
এসব ফুল সব বসন্ত ঋতুর প্রথমার্ধের। এরপর আসে বসন্তের মধ্যভাগ। সেই মধ্যভাগ জুড়ে চলে টিউলিপ, রডোডেনড্রন, ডগউড, ম্যাগ্নোলিয়া, টিলিয়াম, চেরি,আপেল ফুল, প্রিমরোজ ফুলের মোহনীয় রূপের প্রদর্শন। আর সেই রূপের ছটায় নিউইয়র্ক শহর ঊর্বশী হয়ে ওঠে। আর বসন্তের একদম শেষভাগে আসে লিলি, লিল্যাক, স্পিরিয়া, ফিউনিস, উড এ্যানেমন, ক্যামেলিয়ার চোখ জুড়ানো বাহার। পাতাহীন গাছে ফুলের সমারোহ সত্যিকার অর্থেই অবাক করার মতো। অল্প কিছুদিন আগের প্রাণহীন গাছগুলোতে যেন কোন যাদুবলে এমন প্রাণের জোয়ার আসে। আর একটা তথ্য এখানে দিয়ে রাখি। পাতাঝড়া ফল ঋতু এই শহরের সকল গাছের পাতায় রঙ লাগিয়ে নিভৃতে পাতাগুলো নিয়ে বিদায় নেয়। এরপর শীতের উদ্দামতা চলে পাতাহীন রুক্ষ গাছ আর প্রকৃতিতে। আর যখন বসন্ত জীবনের জয়গান নিয়ে হাজির হয় এই শহরে তখন অধিকাংশ গাছে শুরু হয় ফুলের রাজত্ব। এরপর এই ফুলগুলো ঝরে পড়লে আসে পাতা। কি অদ্ভুত এই শহরে ফুল আর পাতার সম্পর্ক!! যেন আড়ি আজন্মের! সত্যি কথা বলতে, বসন্ত ঋতুতে নিউইয়র্কে প্রকৃতির যে লাস্যময়ী রূপ, তা আসলে লিখে বোঝানো যাবে না। দীর্ঘ শীতে যে রূক্ষতা প্রকৃতিকে ম্রীয়মান করে রাতে, তা পুষিয়ে দিতেই মনে হয় এই শহরের প্রকৃতি এতটা রঙ আর প্রাণোচ্ছল হয়ে ওঠে।

ছবিঃ লেখক