নারীর জন্য আলাদা দিবসের প্রয়োজন নেই

রুমা মোদক

আমার কলেজে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। সামনের দিকের বেঞ্চগুলো শুধু ছাত্রীদের জন্য সংরক্ষিত। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গেছি,প্রথম প্রথম ক্লাসে বলতাম, যে যেখানে জায়গা পাবে সেখানেই বসবে। কিন্তু অচিরেই টের পেলাম স্থান কাল পাত্র ভেদে অধিকার বদলে যায়। বর্ষার গান ফাল্গুনে গাইলে হয়না। প্রতিদিন ছাত্রীদের নানারকম কমপ্লেইন ফেইস করতে করতে শেষ পর্যন্ত প্রচলিত নিয়মেই ফিরে গেলাম আপাত সমাধান হিসাবে। 
নিজেও বেশ একটা যুক্তি খুঁজে পেলাম। মেয়েরা ক্লাসে আসতে দেরি করলে সামনের বেঞ্চগুলো দখল করে ছাত্ররা বসে থাকে। ছাড়তে চায় না। সমস্বরে বলতে থাকে- ম্যাডাম সম-অধিকার,সম-অধিকার। ক্লাসে দেরিতে প্রবেশের শাস্তি হিসাবে হয়তো ছাত্রীদের পিছন দিকেই বসতে বলতাম। কিন্তু ছাত্রদের শ্লোগানে শ্লেষের সুর বুঝে ওদের জিজ্ঞেস করি, এই ক্লাসে ছাত্র কজন? ওরা উত্তর দেয়,ম্যাডাম ৮০ জন। আর ছাত্রী? ওরা জানায় -২০ জন। বলি যেদিন ছাত্র-ছাত্রী অনুপাত ৮০:৮০ হবে। সেদিন সম-অধিকার হবে। ছেলেদের সরিয়ে সামনের দিকেই মেয়েদের বসতে বলি।
কেনো নারীদের জন্য আলাদা দিবস? কারণ আমাদের পুরুষদের এখনো মনে বাকি ৩৬৪ দিন ছেড়ে দেয়ার মানসিকতা তৈরি হয় নি। সম-অধিকার অধিকাংশ পুরুষের কাছে উপহাসময় শব্দ-বন্ধ।
কিন্তু এই যে বছরের পর বছর ধরে নারীর জন্য আলাদা দিবস পালিত হচ্ছে, তাদের নারীদের আদতে লাভটা কী হচ্ছে? এক আনুষ্ঠানিক উদযাপন আর বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সফল হওয়া ছাড়া? নারী দিবসের শাড়ি, নারী দিবসের মালা….. ইত্যাদি বিজ্ঞাপন চোখ ঝলসে দিচ্ছে। মিডলক্লাস নারীর বাইরে মাটিকাটা, ইটভাংগা নারীদের কাছে এর কী গুরুত্ব??

আর আমরা মিডলক্লাস নারীরা দলবেঁধে বেগুনি শাড়ি পরছি,আলোচনা সভায় যাচ্ছি, সংবর্ধিত হচ্ছি।কিন্তু সেই চার দশক আগে আমার যেমন গেটের বাইরে যাবার অধিকার ছিলোনা, চার দশক পরেও আমার মেয়েটাকে তার খুব প্রিয় সাইকেল নিয়ে গেটের বাইরে যেতে দেই না। ওর ছলছল দৃষ্টিতে আমার অন্তর্দাহ আমাকে আরো অসুখী করে,যতোটা করতো আমার মায়ের বাঁধা।
এইসব দিবস টিবস পালন আসলে কেবলই চাপিয়ে দেয়া আনুষ্ঠানিকতা। নারীদের সন্তান ধারণ আর পালনকালীন উৎপাদন কাজের সঙ্গে জড়িত না থাকার কারণে যতোদিন তাঁকে অভিনন্দিত করার মানসিকতা তৈরির শিক্ষা সমাজ না পাবে ততোদিন নারীর মুক্তি নেই।
সমাজকে জানতে হবে নারীর যেটুকু শারীরিক দুর্বলতা তা প্রাকৃতিক, সৃষ্টির ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে। এর সুযোগ নেয়া অমানুষের কাজ। অসভ্যের কাজ।
যেদিন সমাজ সত্যি এটা জানবে সেদিন নারীর জন্য আলাদা দিবসের প্রয়োজন নেই। এর আগে পর্যন্ত আমি দিবসটি পালন করবো এই কথাগুলো মনে করিয়ে দেয়ার জন্য। বাণিজ্যিক স্বার্থে নয়।

ছবি: গুগল