নারীদের সত্যিই মুক্তি ঘটেছে

হোসনে আরা জলি (অধ্যাপক)

৭ মার্চ রাস্তার পাশে নারীর সঙ্গে যে অশ্লীল আচরণ করা হয়েছে, তার জন্য কি কেবলই সোনারবাংলার সোনার ছেলেরা দায়ী? সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে নৈতিকতাবোধসম্পন্ন সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে বুঝতে শেখার পর মা-বাবা তাদের সন্তানদের যে মহান শিক্ষকদের হাতে তুলে দেন, তাদের কি কোনো দায় নেই? একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বলবো- আছে, অনেকের চেয়ে অনেক বেশিই আছে। আর এই দায় আছে বলেই অধিকাংশ শিক্ষকই তাদের শিক্ষার্থীদের সত্যিকারের সুশিক্ষায় গড়ে তুলতে চান। কিন্তু শিক্ষকসমাজে কিছু মেরুদণ্ডহীন অসুস্থ মানসিকতার অশ্লীলতা-চর্চাকারী শিক্ষক নামের কলঙ্কও আছে। এরা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনের পর দিন ছাত্রীদের নানানভাবে, নানাকৌশলে যৌনহয়রানী করেই চলেছে।
প্রতিবাদ করতে গেলেই তাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-একাডেমিক বা প্রশাসনিক ভয়-ভীতি দেখিয়ে থামিয়ে দেয়া হচ্ছে। সাহস করে প্রতিবাদ করে তদন্তসাপ্ক্ষে কেউ কেউ কিছু ক্ষেত্রে বিচার পেলেও অধিকাংশরাই বিচার পায়না বা তাদের অভিযোগ আমলেই নেয়া হয়নি। বরং
একাধিকবার অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত এবং প্রমাণিত এমন নরপশু শিক্ষককেও নানা পদ-পদবী, সুযোগ-সুবিধা দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং হচ্ছে। যে সব শিক্ষক দিনের পর দিন একাডেমিক দায়িত্ব অবহেলা করে এবং শ্রেণিকক্ষে সিলেবাসের পড়া বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে যৌনউস্কানীমূলক কথা বলেন, পাশের সহপাঠীর সঙ্গে কথা বলার অপরাধে কোনো নারী শিক্ষার্থীকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে নগ্ন হয়ে নাচতে বলার অপরাধে অভিযুক্ত হয়েও রেহাই পেয়ে যান, তাদের কাছ থেকে কী শিখবে আমাদের শিক্ষার্থীরা? বিচার চেয়ে যারা বিচার পায় না, তাদের কি কোনো শ্রদ্ধা, কোনো আস্থা থাকবে শিক্ষকদের প্রতি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি?
শ্রেণিকক্ষে অশ্লীলতার কথক মহান(?) শিক্ষকদের অনুসারী কতিপয় সোনার(?) ছেলেরা যে তখন রাস্তার পাশে, উৎসব-পার্বণে কিংবা যেখানে-সেখানে নারীদের সাথে অশ্লীল আচরণে মেতে উঠবে, উল্লসিত হবে সোনারবাংলায় আজ এটাই স্বাভাবিক।

একদিন পুরুষশাসিত এই সমাজে পুরুষের নিপীড়ন-নির্যাতন ও শৃঙ্খল থেকে নারীদের মুক্তির আন্দোলন করেছিলেন পুরুষরাই। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, শিক্ষার মাধ্যমেই নারীর ভয় দূর হয়ে মুক্তি আসবে। বেগম রোকেয়া বলেছিলেন, ‘আমরা পুরুষের ন্যায় সুশিক্ষা অনুশীলনের সম্যক সুবিধা না পাওয়ায় পশ্চাতে পড়িয়া আছি।’ তারপর যখনই তিনি ‘অতএব জাগ, জাগ গো ভগিনী’ বলে ডাক দিলেন, অমনি নারীরা জেগে উঠলো। জজ-ম্যাজেস্ট্রিট-ব্যারিস্টার, ডাক্তার-ইন্জিনিয়ার হয়ে আজ রোকেয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছে। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতায়ও আজ নারী।
কিন্তু তারপরও কি নারীদের সত্যিই মুক্তি ঘটেছে?
রাষ্ট্রক্ষমতায় নারী থাকার পরও নারীদের অভিযোগ শোনার সত্যিই কি কেউ আছে?
বিদ্যা-শিক্ষায় নারী-পুরুষ আমরা অনেক দূর এগিয়েছি ।কিন্তু বিদ্যাসাগর বা রোকেয়ার মতো কেউ হয়ে উঠতে পারিনি।

ছবি:গুগল