সব আয়োজন ফুরিয়ে যায়…

মিজানুর রহমান খান (সাংবাদিক)

আমিও তো ওদের মতো এই বিমানে থাকতে পারতাম। সঙ্গে থাকতে পারতো আমার পরিবারও, যেমন আমরা বছরে দু‘তিনবার এদিকে ওদিকে যাই। কে বাবার পাশে বসবে, আর কে মার পাশে- এটা নিয়ে বাচ্চারা হয়তো একটু মারামারি করতো, মোবাইল ফোনে দু‘একটা ছবি তুলতে চেষ্টা করতাম, ওদের মাথা ঝুঁকে পড়তো এন্টারটেইনমেন্ট স্ক্রিনের উপর। একসময় মজা করে সবাই মিলে বিমানের খাবারও খেতাম। তারপর ক্লান্ত আমি পড়তাম ঘুমিয়ে। কিন্তু যখন বুঝতে পারতাম বিমানে আগুন লেগেছে, এখনই বিধ্বস্ত হবে, ওই কয়েক মুহুর্তে কি করতাম আমি! আমি কি স্ত্রীর চোখের দিকে তাকিয়ে ওদের সবাইকে জড়িয়ে ধরতাম? কেমন লাগতো আমার?

কাল রাতে যখন ঘুমাতে যাই, ঘুম আসছিলো না কিছুতে। শুধু একটা পরিবারের ছবি ভেসে উঠছিলো মনে। বাবা মা আর মাসুম একটা ছোট্ট বাচ্চা। ওরা নেপালে বেড়াতে যাচ্ছিলো। কতো না পরিকল্পনা ছিলো ওদের। হয়তো খুব ভোরে উঠেছে ঘুম থেকে, আগের রাত জেগে গুছিয়েছে লাগেজ, কষ্ট করে এই হলিডের জন্যে টিকেট কেটেছে, বসের কতো কথা শুনে হয়তো ছুটিও ম্যানেজ করতে পেরেছে, এয়ারপোর্টে যাওয়ার সময় টেনশন করেছে, বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে সবাইকে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছে সবকিছু, আরো কতো কি। তারপর লাউঞ্জে বসে খুশি খুশি মনে হয়তো ফেসবুকে চেক ইনও দিয়েছে।

ভাবছিলাম, এই যে এতো কিছু করছি, উদয়াস্ত হাঁড়ভাঙা খাটুনি, ছেলেমেয়েরা যাতে পড়ালেখায় ভালো করে, যেন অসুখ না হয়, একটা বাড়ি, একটা গাড়ি কিম্বা এক টুকরো জমি কেনার স্বপ্ন দেখি, এর ওর পেছনে লেগে থাকি, ক্ষমতার দাপট দেখে, অপমান সহ্য করে ক্ষুদ্র কীট হয়ে বেঁচে আছি- কেন, কিসের জন্য!। আমিও তো ওই পরিবারটির মতো থাকতে পারতাম ওই বিমানে। তারপর এক মুহুর্তেই ধ্বংস হয়ে যেত সবকিছু। জীবনকে কষ্ট দিয়ে এই যে বাড়িটা, ওই যে গাড়িটা আর ব্যাঙ্কে যে টাকাটা রেখে গেলাম- তার কি হবে!

ছবি: গুগল