মেয়ের স্বপ্নে এটা ছিলো আমার চতুর্থ মৃত্যু

 

চৈতি আহমেদ, সাংবাদিক

(সুইডেন থেকে): বাসার কাছে একটা সেলুন আছে। শহর জুড়ে সবে মাত্র তিনটি সেলুনের একটি এটি। এখানে চুল কাটাও এক মহা ঝক্কি একমাস আগে এপয়েন্টমেন্ট করে যেতে হয়। সেলুনে একটু আগেই চলে গিয়েছি। সাথে দুই বাচ্চা। এরা দুইজন যেখানেই যাক তাদের জন্য চেয়ারে পিন গাঁথা থাকে। কিছুতেই তারা বসবে না। সেলুনের সব জিনিষ তাদের খুটিয়ে খুটিয়ে দেখতে হয়। মাঝে মাঝেই বিরক্ত হয়ে তাদের জোর করে বসিয়ে দেই। বলি চুপ করে বস। ওই যে বললাম চেয়ারে তাদের জন্য পিন গাঁথা থাকে।

আমার কন্যারা

সেলুনের মালিক উলরিকা একাই নাপিত। এক বুড়ির চুল কাটছে সে। আমি সোফায় বসে কিছু করার নেই বলে হেয়ার ষ্টাইলের ক্যাটালগের পাতা উল্টাচ্ছি। এমন সময় আরো দু’জন লোক ঢুকলো সেলুনে। লোক দু’জন উলরিকার সাথে কি সব কথা বলে ওদিকে রাখা সোফায় গিয়ে বসলো। ওখানে দুই বাচ্চা দুরন্তপনা করছিলো। উলরিকা কাজের ফাঁকে এটা সেটা সাজিয়ে রাখা জিনিস বাচ্চাদের নাগালের বাইরে সরিয়ে রাখছিলো। এক বছরের আসা যাওয়ায় উলরিকার সাথে তাদের একটা ভাব বিরক্তির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। হঠাৎ মেধা এসে আমার গা ঘেসে বসে ফিস ফিস করে বললো -চলো চলে যাই। বিরক্ত হয়েই বললাম চলে যাবো কেনো? চুল কাটবো না? -না চুল কাটতে হবে না। এখুনি এখান থেকে চলো। এখানে বিপদ। ও আরো ফিস ফিস করে বললো-ঐ লোক দুটোর কাছে আমি পিস্তল দেখেছি, প্লিজ চলো…. কি বাজে কথা বলছো!
-আমি বলছি ওরা এখানে চুল কাটতে আসেনি, তোমাকে মেরে ফেলতে এসেছে!
কি সব বলো না, এখানে কেউ চাইলেই কাউকে মেরে ফেলতে পারে না। মেধা না পেরে জোনাককে নিয়ে দৌড়ে সেলুন থেকে বেরিয়ে গেলো। তখন লোক দুটো উঠে এসে আমাকে সোফায় বসা অবস্থাতেই গুলি করলো। মেধা পুলিশ নিয়ে যখন ফিরে এলো তখন আর সময় ছিলো না!

ওদের আনন্দ

রাত তিনটায় ও আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুললো। কি হলো! মা আমি ভাত্তেন (পানি) খাবো। -আচ্ছা আনছি বলেই যেই উঠবো, অমনি ও আমাকে চেপে ধরলো। না না তুমি যাবে না, আমি ভাত্তেন খাবো না। বলেই ও কান্নায় আমাকে জড়িয়ে ধরলো। কি হলো?
-কেনো তুমি আমার কথা শুনো না বলোতো? আমি তোমাকে বার বার বললাম তাও তুমি আমার কথা শুনলে না! আমি পুলিশ নিয়ে আসতে আসতেই ওরা তোমাকে মেরে ফেললো! বলেই ও আমাকে ছুঁয়ে দেখতে থাকলো, আমার বুকের কাপড় সরিয়ে সরিয়ে দেখতে থাকলো। –
-তোমার জন্য পানি নিয়ে আসি। -না তুমি যাবে না। ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। -কারা আমাকে মারবে কি বলছো! -লোক দুটো আরাবিস্কা মা, ওদেরকে কোনোদিন আমি লাকসোতে দেখিনি। আমি শিওর ওরা তোমাকে মারতেই এসেছে।

-কি সব বলছো! এখানে কেউ চাইলেই কাউকে মারতে পারে না।
-তুমি স্বপ্নতেও এমন বলেছো। আমি খুব ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখেছি মা। আমার ভয় লাগছে।
-শোনো স্বপ্ন স্বপ্নই। দেখছোতো আমি বেঁচে আছি। এবার আমাকে ছাড়ো পানি নিয়ে আসি। -প্লিজ মা! আমি পানি খাবো না, তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না!
-এতো ভয় পেলে চলে না মা।
-তুমি কেনো আমাকে বিশ্বাস করলে না, আমি তোমাকে বলেছি, চলো এখান থেকে চলে যাই, ওরা তোমাকে মেরে ফেলবে। তুমি আমার কোনো কথাই শুনলে না।
তুমি প্রমিজ করো, আমার কথা শুনবে!
-আচ্ছা শুনবো। আর কাঁদে না।

আমার মেয়ের স্বপ্নে এটা ছিলো আমার চতুর্থ মৃত্যু।

এ আমার কেমন জীবন-জন্ম-জগৎ! যেখানে আমার বাচ্চারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না! এ কেমন জীবন মাঝরাতে ভয়ে বাচ্চা তৃষ্ণা ভুলে যায়! শিশুর বাসযোগ্য পৃথিবী কি আমাদের স্বপ্ন থেকেও হারিয়ে যাবে!!!

লেখকের ফেইসবুক থেকে