আমি বোকার মতো বসে আছি সেই থেকে..

জসিম মল্লিক,টরন্টো থেকে

বিচিত্রায় একবার ঘুম নিয়ে একটা কভার স্টোরি ছাপা হয়েছিল। মানুষ কেনো ঘুমায় সেই রহস্য নিয়েই ছিল লেখাটা। খুবই বিজ্ঞানভিত্তিক একটা লেখা ছিল। বিচিত্রার কভারে মডেল হিসাবে ববিতার ছবি ছাপা হয়েছিল। ঘুমের রহস্য উদঘাটিত হয়েছে কিনা জানি না তবে আমি গত কয়দিন ধরে শুধু ঘুমাচ্ছি। আমার বাংলাদেশের কিছু বন্ধু আছে যারা দিনে ঘুমায় রাতে জেগে থাকে। এটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশে যখন রাত কানাডায় তখন দিন। আমার বন্ধুরা কানাডার টাইমে চলছে। সময়ের পার্থক্য কোনো সমস্যা তৈরী করছে না। সাধারণতঃ রাত হচ্ছে ঘুমানোর জন্য। দিন হচ্ছে কাজের সময়। আমার এক বন্ধু টরন্টোতে থাকে, এখানে আসার পর থেকে গত প্রায় বিশ বছর ধরে রাতে কাজ করে, দিনে ঘুমায়। মানুষের শরীর সম্ভবতঃ রাতে ঘুমানোর জন্য তৈরী হয়েছে। তাই আমার বন্ধুর নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিয়েছে। এখন আর সে রাতে কাজ করে না, দিনে করে এবং সে তার সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠছে ক্রমশঃ।
আমার এখনকার ঘুমটা রহস্যময়। ঘুম নিয়ে আমার কোনো সমস্যা নাই। নির্ঘুম রাতের কষ্ট তারাই জানে যাদের ঘুমের সমস্যা আছে। আমার ঢাকার এক বন্ধু বলেছে সে মাত্র দুই ঘন্টার বেশি ঘুমাতে পারে না। শত চেষ্টা করেও ঘুম দেবীর দেখা পায় না। সে এটা মেনে নিয়েছে। আমার বস বলতেন জসিম, আমি দিনে আঠার ঘন্টা কাজ করি আর রাতে ছয় ঘন্টা ঘুমাই। গাছের গুঁড়ির মতো পড়ে থাকি যখন ঘুমাই। আমাকে এক জায়গা থেকে আর জায়গায় নিয়ে গেলেও টের পাব না এমনই নিঃসার সেই ঘুম। আমার এখনকার ঘুমটার নাম হচ্ছে জেট ল্যাগ। প্রতিবারই এমনটা হয় আমার। দেশ থেকে আসার পর চার পাঁচ দিন লাগে সবকিছু স্বাভাবিক হতে। জেট ল্যাগ কেনো হয় এটাও এক রহস্য। অথচ আমি ফ্লাইটে যথেষ্ট ঘুমিয়েছি। বিজনেস ক্লাসে বিছানার মতোই ব্যবস্থা থাকে।

এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ নাকি ভাবছে এমন এয়ারক্রাফট বানাবে যাতে ভ্রমন করলে জেটল্যাগ হবে না। সময়ের পরিবর্তনের কারনে কি জেটল্যাগ হয়! আমার তা মনে হয় না। আমি যখন ঢাকা যাই জাষ্ট ব্যাগটা রেখেই বেড়িয়ে পরি। জেটল্যাগ আমাকে কাবু করতে পারে না। একবার মনে আছে আমি তখনও কানাডা আসিনি। নিউইয়র্ক থেকে ঢাকা ফিরছি। পথে লন্ডনে পাঁচদিনের স্টপওভার নিলাম। কিন্তু পাঁচদিনের তিনদিনই ঘুমিয়ে কাটিয়েছি। লন্ডনের বিকেল হলেই ঘুমে আমি কাদা হয়ে যেতাম। মাত্র ছয় ঘন্টার টাইম ডিফারেন্স নিউয়র্কের সঙ্গে লন্ডনের তারপরও কেনো এমনটা হলো সেই রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। সেটা ২০০০ সালের কথা।
প্রতিবারই ঢাকা থেকে কানাডা ফিরলেই রাজ্যের ঘুম এসে হামলে পরে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেই কোথা থেকে যেনো ঝাঁপিভরা ঘুম এসে জড়িয়ে ধরে। নিজেকে শক্ত রাখি, বলি না ঘুমানো চলবে না। একবারে রাতে ঘুমাবো। কিন্তু বিছানা শুধু ডাকে আয় আয়। জেসমিন কমফোর্টার লুকিয়ে রাখে যাতে ওটা নিয়ে বিছানায় ঝাঁপ না দিতে পারি। কিন্তু পাঁচটা বাজতে না বাজতেই নিজেকে আবিষ্কার করি বিছানায়। কেমন একটা নেশার মতো লাগে। শরীর গুলিয়ে ওঠে, মাথা আউলা ঝাউলা হয়ে যায়। বিছানায় গেলে কোথা থেকে রাজ্যের ঘুম এসে চোখ জুড়িয়ে দেয়। কয়েক ঘন্টা ঘুমানোর পর নিজেকে ফ্রেশ লাগে। আজকেও ভেবেছিলাম ঘুমাবো না। পাঁচদিনতো হলো। ঘুমের জন্য ক’দিন লিখতেও পারিনি। কারো সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।

আজও সারাদিন বাসায় বসে মুভি দেখেছি। সকালে ঘুম থেকে উঠেছি বাংলাদেশের খেলা দেখার জন্য। আমাদের সকাল সাড়ে আটটায় খেলা শুরু হয়েছে। ভাবলাম জেসমিন কাজ থেকে আসলে কোথাও ঘুরতে যাব দু’জনে। পরশু সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম হুইটবি। টরন্টো থেকে এক ঘন্টার ড্রাইভ। জেসমিন বারবার বলছিল ড্রাইভ করতে পারবা তো! আচ্ছা কফি নিয়ে নিচ্ছি। বেশ ভালভাবেই হুইটবি থেকে ঘুরে এসেছি। বিকেলে না ঘুমিয়েও। আজকে যখন ঘুমটা ভাঙল দেখি জেসমিন আমার লেখার চেয়ারে বসে মিটিমিটি হাসছে।
রাত দশটা কিন্তু!
আমি লাফিয়ে উঠলাম। ইশ্‌ ডাকবা না আমাকে!
ঘুম ভাঙালে তোমার মেজাজ আমার জানা আছে।
কোথাও ঘুরতে যেতে চেয়েছিলাম বিকেলে।
আমি পাঁচটায় এসে দেখছি তুমি ঘুমাচ্ছ।
ডাকতা।
না। অরিত্রি বাইরে গেছে, বলে গেছে বাবাকে না ডাকতে, তাই ডাকিনি।

অরিত্রি দুপুরে জীম থেকে আসার সময় পপাইস থেকে খাবার নিয়ে এসেছে।
আমি বললাম এগুলা কেনো আনছো আম্মু, জাঙ্কফুড। তুমিতো এগুলো খাও না।
তোমার জন্য আনছি। তুমি না বললা বাসার খাবার খেতে ভাল লাগছে না।
আমি মজা করে পপাইস খেলাম।
রাতে খেতে বসে জেসমিনকে বললাম তোমার হাতের রান্না এতো খারাপ হয়ে গেছে। মনে হয় ভুলে গেছো রান্না করা।
জেসমিন মহা ক্ষেপে বলল, তাহলে দেশে চলে যাও আসছ কেনো। সেখানের মজার মজার খাবার খাও গিয়ে।
তাই যাব। চলে যাব দেশে।
গিয়ে তো আমার আম্মাকে জ্বালাবা।
না। নিজেই লোক ঠিক করে নেবো। টাকা দিলে বাঘের চোখও মিলে বুজছো!
জেসমিন রাগ করে চলে গেলো।
আমি বোকার মতো বসে আছি সেই থেকে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে