বন্ধুদের সঙ্গে কুমিল্লায়…

আন্জুমান রোজী,(টরন্টো প্রতিনিধি)

 (পূর্ব প্রকাশিতর পর): ধর্মসাগরের আশপাশ ঘুরে  আর ক্যামেরায় দৃশ্যবন্দী করে আমরা চলে যাই শালবন বিহারে। কোটবাড়িতে বার্ডের কাছে লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকায় এই বিহারটির অবস্থান। এর আশপাশে এক সময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল বলে এ বিহারটির নামকরণ হয়েছিলো শালবন বিহার। এর কাছের গ্রামটির নাম শালবনপুর। এখনো ছোট একটি বন আছে।  এই বনের প্রবেশমুখে ঢুকে  গাড়ি পার্ক করে আমরা সবাই নেমে পড়ি। গাড়ি পার্কিং এর জায়গায় লক্ষ্য করলাম বাস আর মাইক্রো ভর্তি মানুষের কোলাহল। সব বনভোজনের উদ্দেশ্যে এখানে এসেছে। ধূলা আর রোদতাপের মাখামাখিতে তখন  আমরা সবাই ক্লান্ত।  প্রত্যেকে লাল, নীল, হলুদ, কমলা রঙের বরফের ললি আইসক্রিম কিনে নেই।  খেতে খেতে  বরফের ঠাণ্ডাভাব নিতে নিতে  সেই কোলাহল ছেড়ে সামনের দিকে পা বাড়াতেই চোখজুড়ানো মনোহর  এক বৌদ্ধমন্দির দেখতে পাই।  ভেতরে যাওয়ার কোনো প্রবেশপথ বনের দিক থেকে ছিল না বলে আমরা দূর থেকেই দেখি।  সঙ্গে তো ক্যামেরার কারসাজি ছিলই। গত ২১ অক্টোবর ২০১৭তে  উদ্ধোধন করা হয় এই পিস প্যাগোডা আনালয় বৌদ্ধমন্দিরটি। ঐতিহ্যবাহী ময়নামতি শালবন বিহারের (কোটবাড়ি) কোলঘেসে প্রতিষ্ঠিত নব শালবন বৌদ্ধ বিহারে থাইল্যান্ড সরকার ও সেদেশের জনগণের সহযোগিতায় নির্মিত হয় এই পিস প্যাগোডা আনালয়। এটি  থাইল্যান্ডের  প্যাগোডার অনুকরণে নকশা তৈরি করেছেন  স্বনাম খ্যাত থাই স্থপতি মিঃ সুরাসাই। শ্রীমৎ শীলভদ্র মহাথের ও শ্রীমৎ সুগত ভিক্ষু মহোদয়ের উদ্যোগে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়।

দৃষ্টিনন্দন প্যাগোডাটি দেখে পায়ে পায়ে হেঁটে চলে আসি  শালবন বৌদ্ধ বিহারে।  দর্শনীর বিনিময়ে প্রবেশ করতে হয়। ঢুকেই সবুজ সতেজ অনুভূতি পেলাম।  সবুজগাছগুলো যেন এইমাত্র বৃষ্টিতে নেয়ে উঠেছে। বৌদ্ধবিহারটিতে একটু পরিচর্যার নমুনা পেলাম। জুতো খুলে খালি পায়ে পুরো বৌদ্ধবিহার ঘুরি আর বৌদ্ধদের নিদর্শনগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখি। সেইসঙ্গে আমরা সবাই ক্যামেরায় বন্দী হলাম।

কুমিল্লার শালবন বৌদ্ধবিহার  বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলের অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনাগুলোর একটি এই বৌদ্ধ বিহার । এটি ১২শ প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।

ধারণা করা হয় যে খৃস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। আকারে এটি চৌকো। শালবন বিহারের প্রতিটি বাহু ১৬৭.৭ মিটার দীর্ঘ। বিহারের চার দিকের দেয়াল পাঁচ মিটার পুরু। কক্ষগুলো বিহারের চার দিকের বেষ্টনী দেয়াল পিঠ করে নির্মিত। বিহারে ঢোকা বা বের হওয়ার মাত্র একটাই পথ ছিল। এ পথ বা দরজাটি উত্তর ব্লকের ঠিক মাঝামাঝি স্থানে রয়েছে। প্রতিটি কক্ষের মাঝে ১.৫ মিটার চওড়া দেয়াল রয়েছে। বিহার অঙ্গনের ঠিক মাঝে ছিল কেন্দ্রীয় মন্দির। বিহারে সর্বমোট ১৫৫টি কক্ষ আছে। কক্ষের সামনে ৮.৫ ফুট চওড়া টানা বারান্দা ও তার শেষ প্রান্তে অনুচ্চ দেয়াল। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে তিনটি করে কুলুঙ্গি রয়েছে। কুলুঙ্গিতে দেবদেবীর মূর্তি, তেলের প্রদীপ ইত্যাদি রাখা হতো। এই কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন। সেখানে বিদ্যাশিক্ষা ও ধর্মচর্চা করতেন। বিহারের বাইরে প্রবেশদ্বারের পাশে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি হলঘর আছে। চার দিকের দেয়াল ও সামনে চারটি বিশাল গোলাকার স্তম্ভের ওপর নির্মিত সে হলঘরটি ভিক্ষুদের খাবার ঘর ছিল বলে ধারণা করা হয়। হলঘরের মাপ ১০ মিটার গুণন ২০ মিটার। হলঘরের চার দিকে ইটের চওড়া রাস্তা রয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে বিহারটির ধ্বংসাবশেষ থেকে আটটি তাম্রলিপি, প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়া মাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে।

শালবন বৌদ্ধবিহার

শালবন বৌদ্ধবিহারে আমরা বেশ অনেকক্ষণ সময় কাটাই। ছায়া শীতল জায়গা দেখে সবুজ ঘাসের ওপর হাত পা ছড়িয়ে বসে পড়ি। চলতে থাকে খুনসুটি আর কথার ফোয়ারা। সেইসঙ্গে চলে প্রাণের বাংলার পত্রিকার শুটিং।  সে এক আনন্দঘন মুহূর্ত। ক্যামেরার কাজ তো  চলছেই অনবরত।  সেখান থেকে বের হয়ে সূর্য ডোবার আগে চলে আসি ময়নামতি ওয়ার সেমিট্রিতে। এটি কুমিল্লাতে অবস্থিত একটি কমনওয়েলথ যুদ্ধ সমাধি। ১৯৪১-১৯৪৫ সালে বার্মায় সংঘটিত যুদ্ধে যে ৪৫০০০ কমনওয়েলথ সৈনিক নিহত হন, তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে মায়ানমার (তৎকালীন বার্মা), আসাম, এবং বাংলাদেশের ৯টি রণ সমাধিক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশে দুটি কমনওয়েলথ রণ সমাধিক্ষেত্র আছে, যার অপরটি চট্টগ্রামে অবস্থিত। প্রতিবছর প্রচুর দর্শনার্থী যুদ্ধে নিহত সৈন্যদের প্রতি সম্মান জানাতে এসকল রণ সমাধিক্ষেত্রে আসেন।  ময়নামতি রণ সমাধিক্ষেত্র মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে (১৯৩৯-১৯৪৫) নিহত ভারতীয় (তৎকালীন) ও বৃটিশ সৈন্যদের কবরস্থান। এটি ১৯৪৩-১৯৪৪ সালে তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের খুব কাছেই এই যুদ্ধ সমাধির অবস্থান। প্রতি বছর নভেম্বর মাসে সকল ধর্মের ধর্মগুরুদের সমন্বয়ে এখানে একটি বার্ষিক প্রার্থণাসভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সমাধিক্ষেত্রের ৭৩৬টি কবর আছে। এর মধ্যে অধিকাংশ হলেন সেসময়কার হাসপাতালের মৃত সৈনিকরা। তাছাড়াও যুদ্ধের পর বিভিন্ন স্থান থেকে কিছু লাশ স্থানান্তর করেও এখানে সমাহিত করা হয়। বাহিনী অনুযায়ী এখানে এর মধ্যে রয়েছেন ৩জন নাবিক, ৫৬৭জন সৈনিক এবং ১৬৬জন বৈমানিক। সর্বমোট ৭২৩ জন নিহতের পরিচয় জানা সম্ভব হয়েছিল।

ময়নামতী ওয়ার সিমেট্রি

সমাধিক্ষেত্রটির প্রবেশমুখে একটি তোরণ ঘর, যার ভিতরের দেয়ালে এই সমাধিক্ষেত্রে ইতিহাস ও বিবরণ ইংরেজি ও বাংলায় লিপিবদ্ধ করে একখানা দেয়াল ফলক লাগানো রয়েছে। ভিতরে সরাসরি সামনে প্রশস্থ পথ, যার দুপাশে সারি সারি কবর ফলক। সৈন্যদের ধর্ম অনুযায়ী তাদের কবর ফলকে নাম, মৃত্যু তারিখ, পদবির পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতীক লক্ষ করা যায়- খ্রিস্টানদের কবর ফলকে ক্রুশ, মুসলমানদের কবর ফলকে আরবি লেখা (যেমন: হুয়াল গাফুর) উল্লেখযোগ্য। প্রশস্থ পথ ধরে সোজা সম্মুখে রয়েছে সিঁড়ি দেয়া বেদি, তার উপরে শোভা পাচ্ছে খ্রিস্টধর্মীয় পবিত্র প্রতীক ক্রুশ। বেদির দুপাশে রয়েছে আরো দুটি তোরণ ঘর। এসকল তোরণ ঘর দিয়ে সমাধিক্ষেত্রের পিছন দিকের অংশে যাওয়া যায়। সেখানেও রয়েছে আরো বহু কবর ফলক। প্রতি দুটি কবর ফলকের মাঝখানে একটি করে ফুলগাছ শোভা পাচ্ছে। এছাড়া পুরো সমাধিক্ষেত্রেই রয়েছে প্রচুর গাছ। সমাধিক্ষেত্রের সম্মুখ অংশের প্রশস্ত পথের পাশেই ব্যতিক্রমী একটি কবর রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে ২৩টি কবর ফলক দিয়ে একটা স্থানকে ঘিরে রাখা হয়েছে। এই স্থানটি ছিল মূলত ২৩ জন বিমানসৈনিকের একটি গণকবর।

আমি, কলি আপা আর মেহেরুন নেসা কবরগুলো ঘুরেঘুরে দেখছিলাম। ইমাম ভাই আমাদের সঙ্গে থেকে  ক্যামেরার কাজ করে যাচ্ছিলেন। পাঁচটায় গেট বন্ধ হয়ে যাবে বিধায় পাহারাদার বারবার  তাগাদা দিচ্ছিলেন বের হয়ে যাওয়ার জন্য। ভাবছিলাম, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া,  যুক্তরাজ্য আরো কত দেশের সৈন্য এসে এখানে ঘুমিয়ে আছে। কোথায় তাদের জন্ম আর কোথায় তাদের মরণ! মনে হলো, এক পৃথিবী যেন এক দেশ হয়ে আছে।  আর এদিকে আমাদের ছেলেবন্ধুরা সেমিট্রির বাইরে গিয়ে সুখটানে ব্যস্ত হয়ে রইলো। সেখান থেকে বের হয়ে আমরা বিদায়ের আগে একটু বিরতির জন্য সবাই কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের পাশে, শপিংমলের একটি কফিশপে বসি। চমৎকার একটি কফিশপ। কফির সঙ্গে এলো কুমিল্লার বিখ্যাত মিষ্টি আর স্যাণ্ডুইচ। চললো আরেক পশলা আড্ডা।

শালবন বৌদ্ধবিহার

 চা চক্র শেষে  মেহেরুন নেসা আর ইমাম ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায়পর্ব সেরে আমরা আবার ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করি। সবার মধ্যে ট্রাফিক জ্যামের কথা ভেবে উদ্বিগ্নতা দেখা দিচ্ছিলো। রাত কতটার মধ্যে আমরা পৌঁছাতে পারবো, সেই চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়লাম। গুগুল ম্যাপ দেখে দেখে রাস্তার অবস্থা বুঝে নেয়া হচ্ছিলো। সুচতুর ড্রাইভার রাস্তার মতিগতি বুঝে এদিকওদিক দিয়ে গাড়ির মাথা গুলিয়ে  এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মেঘনাব্রিজের পর থেকে যন্ত্রণাকর ট্রাফিক জ্যামে আটকা পড়লাম। তবে ড্রাইভারের সুতীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার কারণে,  বলতে গেলে অনেকটা রিস্ক নিয়েই পাশ কেটেকেটে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। যা দেখে আমরা সবাই এক আতঙ্কের মধ্যে ছিলাম। বিশেষ করে আমি পারতপক্ষে চোখ খুলতে চাইনি। মনে হচ্ছিলো এই বুঝি পড়ে গেলাম খাদে।  তার ওপর ভাঙ্গারাস্তার করুণ কাহিনী তো আছেই। এই আতঙ্কের মধ্যেও হাসির ফোয়ারা কমেনি। আমাদের গাড়ি  ঢাকায় প্রবেশমাত্রই সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচলাম।

কুমিল্লায় একদিনের আনন্দভ্রমণ স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। বিশেষ করে মেহেরুন নেসা আর ইমাম ভাইয়ের আন্তরিক আতিথেয়তা মনে দাগ কেটে আছে। তাছাড়া কুমিল্লার  শতশত বছরের ইতিহাস একদিনে উদ্ধার সম্ভব নয়।  যতটুকু নাগালের মধ্যে ছিল ঠিক ততটুকুই তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।  তার সবটুকুর কৃতিত্ব ইমাম ভাইয়ের। উনার নির্দেশনায় আমাদের এই অভিযাত্রা সফল হয়। আমি আর ইরাজ আহমেদ পূর্বপুরুষের নিঃশ্বাসের ছোঁয়া নিয়ে এলাম। এক ভালোলাগা থেকে এখনো বুদ হয়ে আছি। ভালো থাকুক আমাদের কুমিল্লা।

 ছবি: সম্রাট