প্রাণের শহর চট্টগ্রাম

মেহেরুন্নেছা

সমুদ্রের উন্মাতাল তরঙ্গে কিংবা কর্ণফুলী নদীতে
ভেসে বেড়ানো যে নৌকাখানির ছবি মানসপটে ভেসে উঠে তা সাম্পান নৌকা। এই কর্ণফুলী নদীর তীরে অবস্থিত সাম্পানের দেশ চট্টগ্রাম। বারো আউলিয়ার দেশ চট্টগ্রাম। আমার মেয়ে বেলার শহর চট্টগ্রাম। আমার যৌবনের লাল-নীল গল্পের শহর চট্টগ্রাম। এ শহরের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সাম্পান ও কর্ণফুলী নদী অলির মতই গুঞ্জরিয়া ওঠে।

   “ছোড ছোড ঢেউ তুলি ফানি,
লুসাই পাহাড়ত্তুন….
লামিয়ারে যার গৈ কর্ণফুলী।”

গানের এ কথাই বলে দেয় চট্টগ্রাম তার নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষার আঞ্চলিক গানে সমৃদ্ধ। এ ভাষার মূল প্রবণতা হলো সংক্ষিপ্তকরণ ও চন্দ্রবিন্দুর ব্যবহার। যেমন…

        আমার….আঁর;

কর্ণফুলি

আমাদের…আঁরার।

তাইতো রিক্ত বদনে প্রাণ কাঁপানো অথবা বিরহের
সমীরনের মাদকতায় বনপথে-কর্ণফুলী নদীর জলে কোনো মলিন বসনা মালতীবালা গেয়ে ওঠে …

    “ওরে কর্ণফুলীরে…..
স্বাক্ষী রাখিলাম তোরে….
অভাগিনীর দুঃখর কতা…
বলি বন্ধুরে….!”

নরনারীর বিরহজ্বালা-আবেগ-প্রেম-নিবেদন এবং গ্রামীণ সম্পর্কগুলো সহজিয়া ঢংয়ে স্বতন্ত্র নান্দনিকতায় উঠে এসেছে এতদঅঞ্চলের গানে।
থেকে থেকে আমার মন সমুদ্রতীরের ফেলে আসা বালুকাবেলায় এখনও হারায়। বিষন্ন বদনে চেয়ে রই ওই দূর আকাশের সন্ধ্যাতারার পানে। প্রাণের শহরের স্মৃতিমুখর সব রাগিনী কেবলি আকুতি ঝরায় হৃদ-মাজারে।

হেথায় কাঁদিছে নীরব বাঁশি সেই আরাকানের রাজকন্যার যে কিনা প্রেমে পড়েছিলো আদিবাসী এক রাজপুত্রের। কোনো এক জ্যোৎস্নারাতে
নৌবিহারে বের হলে রাজকন্যার কানে গোঁজা ফুলটি পানিতে পড়ে যায়। কাতর রাজকন্যা ফুল উদ্ধারের জন্য পানিতে ঝাঁপ দেয়। সাথে সাথে রাজকন্যাকে বাঁচাতে লাফিয়ে পড়ে রাজপুত্র। কিন্তু প্রবল স্রোতে ভেসে যায় তারা এবং সমাধি ঘটে একটি শাশ্বত প্রেমের। আত্মাহুতির এই করুণ কাহিনী থেকেই নদীটির নাম হয় কর্ণফুলী।

পাহাড়ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি চট্টগ্রামে আছে সমুদ্র সৈকত, বিশাল বনভূমি, আন্তর্জাতিক নৌবন্দর, আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর ও পোশাক শিল্প। এখানে এসেছেন বহু অলি-দরবেশ-সুফি-সাধক। কথিত আছে, হযরত বদর শাহ (রহঃ) এ অঞ্চলে আগমন করেন। তিনি জ্বীনদের সঙ্গে সন্ধি করেন। তাঁর এবাদতের  সীমানারূপে নির্ধারন করেন একটি চাটির আলোয় আলোকিত এলাকা। আধ্যাত্মিকতার প্রভাবে চাটির আলো ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। জ্বীনরাও চাটির আলোতে অসহ্য হয়ে এ অঞ্চল ছেড়ে পালাতে থাকে। ফলে এখানে একটি গাঁ-গেরামের সৃষ্টি হয়। এই গাঁ-গেরামখানি রূপান্তরিত হয় চাটিগাঁ বা চট্টগ্রাম হিসেবে। চিটাগাং নামের উৎপত্তি নিয়ে আরো কিছু কথা প্রচলিত আছে। আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজা
সু-লা-তাইং-সন্দয়া ৯৫৩ সালে সীতাকুন্ডে যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন তাতে লেখা ছিলো
‘চেৎ-ত-গৌং’ যার অর্থ হলো ‘যুদ্ধ করা অনুচিৎ’।
আরাকানী পুঁথির তথ্য অনুযায়ী এরপরই অত্র এলাকার নাম হয় চেত্তগৌং। ক্রমান্বয়ে চেত্তগৌং
থেকে চাটিগ্রাম, চাটগাঁ, চট্টগ্রাম, চিটাগং নাম ধারন করে। অবশ্য মোগলরা চট্টগ্রামের নাম দিয়েছিলো ‘ইসলামাবাদ’।

বায়েজীদ বোস্তামীর মাজার

হযরত শাহ আমানত চট্টগ্রামের একজন বিখ্যাত দরবেশ যাঁর মাজার চট্টগ্রাম শহরের লালদীঘির পূর্বদিকে এবং হযরত বায়েজীদ বোস্তামীর মাজার চট্টগ্রাম এর নাসিরাবাদের একটি পাহাড়ের উপর অবস্থিত। ছোটকালে আব্বা একবার আম্মাসহ আমাদের তিনভাই বোনকে
মাজার দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সবে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ি। সেই ছোট্ট কিশোরীর হৃদয়ে
দুটি মাজার এক অদ্ভূত অনুভূতির সৃষ্টি করেছিলো। কত রকমের লোকে লোকারণ্য মাজার প্রাঙ্গণ। ছিলো অসংখ্য আউলা-ঝাউলা ফকির। এই মাজারের উপর তারা নির্ভরশীল। এখানেই জিকির-আজগার করে এবং জীবন নির্বাহ করে। তাবিজ-কবজ-তসবি-টুপির পসরা সাজিয়ে বসে আছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। ধূপ-ধূনো-আগরের গন্ধ! আতর-গোলাপের সুবাস! সর্বত্র পবিত্র-পবিত্র ভাব। পাশাপাশি মানত আর তাবিজ-কবজের প্রতি মানুষের অতি আগ্রহ কুসংস্কারাচ্ছন্নতাকেই ফুটিয়ে তুলছে। এটা এমন একটা আবহ যেখানে পবিত্রতা আর অপবিত্রতা
হাত ধরাধরি করে চলছে। আবার দেখলাম বায়েজীদ বোস্তামীর মাজারে কতজন সূতা বাঁধছে। সেই সূতা বাঁধলে নাকি নিয়ত পূর্ণ হয়।
আব্বাকে বললাম, আমিও সূতা বাঁধবো যাতে পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাই। আব্বা চোখ কটমট করে তাকালেন। বললেন, পড়াশোনা করলে এমনিতেই বৃত্তি পাওয়া যাবে। অবশ্য আমি সূতা বাঁধা ছাড়াই বৃত্তি পেয়েছিলাম। অপার বিস্ময়ে
পরখ করেছিলাম বোস্তামীর কাছিম ও গজার মাছ যা আঞ্চলিকভাবে মাজারী ও গজারী হিসেবে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে, বায়েজীদ বোস্তামী দুষ্ট জ্বীন এবং পাপিষ্ঠ আত্মাকে শাস্তি স্বরূপ কাছিমে পরিণত করে আজীবন পুকুরে বসবাসের দন্ডাদেশ প্রদান করেন।

জিজ্ঞেস করলাম, আব্বা তাহলে এসব জনশ্রুতি
কি সত্যি?

আব্বা বললেন, আল্লাহ-তাআলা সব ভালো জানেন।

আমরা তিন ভাই-বোন মনে-প্রাণে বিশ্বাস করলাম যে, সেই জনশ্রুতি কঠিনভাবে সত্যি। এতো বিশাল বিশাল কাছিম আর গজার মাছ! এ কাহিনী যে মিথ্যা হওয়ার প্রশ্নই আসেনা। অথচ এতোকাল পরে জীববিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে আমি ঠিক জানি বিরাটকায় কাছিম ও গজার মাছের বাস্তুসংস্থানগত রহস্য। এই কাছিম আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি অত্যন্ত বিরল ও
চরম বিপন্ন প্রজাতি। তাছাড়া বায়েজীদ বোস্তামীর নাম অনুসারে মাজারটি হলেও ইরানের এই বিখ্যাত সুফি চট্টগ্রাম অঞ্চলে আগমনের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি

হেলেপড়া জীবনের এ বেলায় কেবলি ফিরিয়া চলি মলিন বদনে, উদাসী মনে, ক্লান্ত চরণে সেই চিরচেনা চাটগ্রামে। আব্বা সরকারি চাকুরি করতেন বিধায় আমরা আগ্রাবাদে ড্রাগস ল্যাবরেটরী কলোনীতে সরকারি কোয়ার্টারে থাকতাম। বাসার সামনে ছিলো খেলার মাঠ। বউ-ছি, কানামাছি, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্ধা সহ হরেক রকমের খেলায় মেতে উঠা ছিলো নিত্য-নৈমিত্তিক ব্যাপার। দুপুরে খাওয়ার পর ঘুমানোর কড়া নির্দেশ থাকলেও আব্বা-আম্মাকে ঘুম পাড়িয়ে একেবারে খেলার সাথীদের নিয়ে পগার পার। আজ যেখানে কর্ণফুলী শিশুপার্ক সেটা ছিলো জাম্বুরী মাঠ। শ্রাবণের ঝরো ঝরো বাদলে জাম্বুরী মাঠের ডোবায় একদম পুঁচকে কইমাছ, মাগুর মাছ ধরার নেশায় মেতে উঠতাম। আবার সেগুলো বাসায় এনে বালতির পানিতে জিঁইয়ে রাখতাম। এখন যেটা চট্টগ্রাম মা ও শিশু মেডিকেল কলেজ হসপিটাল সেটা একসময়
অবহেলা-অযত্নে অকেজো পড়েছিলো। শুধু এক
অংশে ড্রাগস ল্যাবরেটরীর সরকারি অফিস থাকলেও বাকী অংশে অসংখ্য কক্ষ ছিলো পরিত্যক্ত। সেখানে আমরা লুকোচুরি খেলতাম।
তবে লিফটের জন্য তৈরি গর্তগুলো ছিলো ভয়াবহ। ছাদ থেকে যখন লিফটের গর্তে নজর করতাম ভয়ে আঁতকে উঠতাম।

গা হিম করা আরেকটা স্মৃতিচারণ না করলেই নয়। আমার বয়স সাত কি আট। সেবার গুজব ছড়ালো যে, কালো ভয়ঙ্কর দর্শন এক জানোয়ার চোখের নিমেষে বাসা-বাড়িতে ঢুকে শিশুদের নিয়ে যায়। সে কি ভয়! সে কি আতঙ্ক! মনে পড়ে আব্বা একদিন তড়িঘড়ি করে বাসায় আসলেন।
বললেন, এখন থেকে বাসায় লাইট জ্বলবেনা; হারিকেন জ্বলবে তাও ডিম করে রাখতে হবে। সেই সঙ্গে দরজা-জানালা বন্ধ থাকবে। কারন, লাইটের আলোতে জানোয়ারের জন্য শিশুদের ধরা সহজ হয়ে যায়। পরে সেই জানোয়ার ধরা
পড়েছিলো। সে ছিলো একটা জানোয়াররূপী
মানুষ যে ভালুকের চামড়া পরিধান করে শিশু অপহরণ করতো।

চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি রেল স্টেশন

এমন হাজারো স্মৃতির শহর চট্টগ্রাম। ফাগুনের
ক্লান্তক্ষণে কিংবা ঘনঘোর বরিষণে স্মৃতিগুলোতে
কেবলি ডুবসাঁতার দিয়ে বেড়াই। স্তব্ধ বীণার তারে
সুরের খেলা আর করুণ বাঁশি দোল দিয়ে যায় মনের দ্বারে। বাল্যের সেই লাল-নীল ললিপপ কিংবা রঙিন আচারের স্বাদ! হাওয়াই মিঠা আর কটকটি খাওয়ার জন্য পুরনো লোহা-লক্কড়, বই-খাতা বিক্রি করে টাকা যোগাড়ের  প্রানান্তকর চেষ্টা! প্রাথমিকে পড়াকালীন এসব স্মৃতি জীবনের রাঙা পালে পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় এখনও উল্লাসমূখর।

যখন সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি তখনকার ঘটনা। স্কুল থেকে ফেরার পথে দেখি রাস্তার একপাশে অনেক মানুষ গোল হয়ে কি যেন দেখছে। ভিড় ঠেলে ভেতরে উঁকি দিলাম। আমার ছোট ভাই যে কিনা তখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে তার বয়সী একটা ছেলের চোখ বাঁধা। এক লোক মুখে নানারকম যাদুকরী কথা বলছে এবং এক পর্যায়ে
ছেলেটির মুখে ছুরি ছুঁড়ে দিলো।

উহ্ মাগো!

ছেলেটির মুখ থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। লোকটি দ্রুতলয়ে উচ্চৈস্বরে বলে চলেছে … এটা এমন কেরামতি যাতে ছেলেটির কিছুই হবেনা।
ভয়ে-বেদনায় ভিড় থেকে দ্রুত বের হয়ে বাসায় চলে এলাম। আম্মাকে বলার পর তিনি বললেন,
আর যেন কখনো এসব না দেখি। এরা নাকি বাজিগর। এখনো ছেলেটির রক্তমাখা কচি চেহারা অবিকল মনে গেঁথে আছে। এখনো তার
কথা মনে হলে হৃদয় কেঁদে উঠে।

শাটল ট্রেন

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শাটল ট্রেন’ স্মৃতির খাতায় অম্লান। সময়টা ছিলো তারুণ্যের-যৌবনের। এই শাটল ট্রেনে আসা-যাওয়ার ভ্রমণ বেলায় বিভূতি, বঙ্কিম, সুনীল, সমরেশ, শীর্ষেন্দু, বুদ্ধদেবদের চিনেছি। চিনেছি শরৎবাবুকে, চিনেছি নজরুলকে, চিনেছি রবীন্দ্রনাথকে। সাহিত্যের পাতায় বিচরণ করেছি আর জীবনকে নব তপ্ত হাওয়ায় প্রজাপতির ন্যায় প্রফুল্লতায় রাঙিয়েছি। কখনো ঝরেছে পথের পাঁচালীর দূর্গার জন্য গোপনে গোপনে অশ্রুশিশির। কখনোবা হয়ে যেতাম কালবেলা, কালপুরুষ আর উত্তরাধিকারের মাধবীলতা। আবার অন্তরধন ছেয়ে যেতো সাতকাহনের দীপাবলীর
জীবন সংগ্রামের অনঢ়তায়।

জৈবিক ভূগোলের কাল পরিক্রমায় চিটাগং ছেড়েছি কর্মজীবনের শুরুতে। যবে ছেড়েছি সেই শহর তব হৃদয়ের শূণ্য মন্দিরে চঞ্চল হিয়ার গোপন কোনে দীর্ঘ বিভাবরী নিয়ে আজো স্বরূপরূপিনী বেশে কিংবা অলোক সুন্দরীরূপে
দেখা দেয় আমার প্রাণের শহর। এই শহরে আমার যৌবন এসেছিলো! এসেছিলো বসন্ত!
এসেছিলো রোমাঞ্চ! মিলিত হয়েছিলাম প্রাণসখার সঙ্গে। অতঃপর অরুণ আলোকের স্বপনদুয়ারের মধুরবেদনবিধুর সব স্মৃতিকাব্যরা
কোনো একদিন হারিয়ে যাবে। কিন্তু রয়ে যাবে আমার বর্ণিল স্বপ্নগাঁথার মর্মর বয়ান।

আজিকে জীবনানন্দের চরণগুলো রোদন করিছে মোর প্রাণে। ওলো সই!  উথলে উঠিছে নয়নবারি!

   ” উজ্জ্বল আলোর দিন নিভে যায়,
মানুষেরও আয়ু শেষ হয়!
পৃথিবীর পুরানো সে পথ
মুছে ফেলে রেখা তার,…
কিন্তু এই স্বপ্নের জগৎ
চিরদিন রয়!”

ছবি: গুগল