মানুষের মৃত্যু একটু সহজ করে দাও আল্লাহ

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

নেপাল বেড়াতে গিয়ে বা নেপালের মানুষ দেশে ফিরতে গিয়ে এভাবে প্লেন ক্র‍্যাশ এ মারা গেলো, মনটা খুবই খারাপ হয়ে আছে।যদিও বিমান বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বাহন তবুও বিমানে একটা অস্বস্তি কাজ করে সবার। আমি বিমানে যখন কোথাও যাই কখনওই আমি ভয় পাইনা বা না পাওয়ার চেষ্টা করি।।কিন্তু সেই পয়লা বিমান ভ্রমণের মত আজো বিস্মিত হই।বিস্মিত হবার ক্ষমতা আমি এখনো হারাইনি। অতবড় দালানের সমান একটা দেহ কিভাবে অনায়াসে উড়ে যায়! এই প্রযুক্তির যুগেও আমি খুব অবাক হই। আরো অবাক হই যখন প্লেনে ওয়াইফাই কাজ করে।আমি ওয়াইফাইয়ে যখন বাচ্চাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি তখন রীতিমত কাঁদতে থাকি।আগে যে সময়ে ট্রেন, নৌকা করে দাদাবাড়ি যেতাম সেই সময়ে আমেরিকা পৌঁছাই, আলহামদুলিল্লাহ। আমি সব সময় বিমানে ওঠার সময় অজু করে দু রাকাত নামাজ পড়ে উঠি।আব্বার লিখে দেয়া সুরা সঙ্গে নিয়ে সীটে বসেই আগে তা তিনবার পড়ি সঙ্গে সঙ্গে আব্বাকে মনে পড়ে এবং মনে হয় আব্বার কাছাকাছি চলে এসেছি। বিমানে উঠেই বিশ্বাস রাখি, যে আল্লাহ যা লিখে রেখেছেন কপালে তাই হবে।এরপর হেডফোনে কোরান তেলাওয়াত শুনি, আর মেঘ দেখি।মেঘ দেখি আর কাঁদি।কাঁদি আর মেঘ দেখি। দেশে ফেলে আসা সবাইকে মনে পড়ে।মনে হয় আব্বার কথা! কতদিন আব্বার অফিস মতিঝিল ওয়াপদা থেকে পয়সা বাঁচানোর জন্য হেঁটে হেঁটে কমলাপুর দিয়ে মাদারটেক এসেছি! আব্বার অফিসের বাৎসরিক আনন্দ উৎসবে গানের প্রতিযোগিতা হতো।সেগুলো সেরে আব্বার সঙ্গে বাসায় হেঁটে ফিরতাম।তখন মনে হত আব্বাকে বড় হয়ে গাড়ি কিনে দেবো। আব্বাকে হাঁটতে দেবো না!সেই মানুষের মেয়ে আমি প্লেনে উড়ে মেঘ কাটাকুটি খেলি!কত মানুষ জীবনে ঢাকা শহরই দেখেনি! আর আমি প্লেনে চড়ে সারা দুনিয়া ঘুরি! আমার বড় আপা এখনো প্লেনে চড়েননি অথচ তার আদরের বোন আমি স্বার্থপরের মত প্লেনে চড়ি।কত দুঃখী মানুষ এক মুঠ ভাতের জন্য যুদ্ধ করে অথচ আমি প্লেনে চড়ে উড়ে বেড়াই । এইসব অপরাধ বোধ নিয়ে আমি প্লেনেই নামাজে দাঁড়াই। দিক নির্ণয় করা ছাড়াই আল্লাহ কে খুঁজতে থাকি। আল্লাহকে খুব কাছাকাছি মনে হয়।আত্মতৃপ্তি নিয়ে নামাজ পড়ি।কাঁদতে থাকি, কাঁদতে থাকি।বাঘমামা আমাকে সামলান।এই করে আসছি তিরিশ বছর! প্লেনে চড়েই ভাবি প্লেন পড়ে গেলে কোথায় পড়বো? বরফে? পাহাড়ে? কুমিরের খামারে? সাগরে? মরে যাবো একেবারে? চিন্তা করতে করতে অস্থির হলে ভাবি সাঁতারের উপর পানি নাই।তাই আমার এতো চিন্তার কিছু নাই।আল্লাহ যা লিখেছেন তাই হবে।প্লেনে বসে টিভি খুলি,মনিটর এ সার্ফিং করে করে খুঁজে খুঁজে আমি ভৌগোলিক কিছু জ্ঞান অর্জন এর চেষ্টা করি।বেছে বেছে ভালো ছবি দেখি।মিউজিক্যাল, ক্লাসিক,কার্টুন। আবার কোরান তেলাওয়াত শুনি। মনে হয় আল্লাহর কাছাকাছি।এবং প্লেনে বসেই আমি সর্বোচ্চ তওবা ইস্তেগফার পড়ি।যাওয়ার আগে সবার কাছে আমাকে লেখা চিঠি চেয়ে নেই।প্লেনে বসে পড়ি।প্লেনের সিটব্যক এ দানের প্যাকেট থাকে।সেখানে দান করি। সেগুলো চলে যায় সোমালিয়া বসনিয়ার শিশুদের কাছে।এভাবেই বোরিং সময়টাকে ওয়ার্কিং আওয়ার বানিয়ে ফেলি চটজলদি।তারপর ও যদি প্লেন ক্র‍্যাশেই মৃত্যু থাকে তবে তাই সই। আজ খুব মনে হচ্ছে ওই প্লেনের মানুষ গুলো কি এভাবে কিছু ভেবেছিলেন? ভয় পেয়েছিলেন? কান্নাকাটি? নাকি কোন কিছুরই সুযোগ হয়নি!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে।