ওরা ঘুরে আসুক আঁধার-নামা রাস্তা বেয়ে

রাজা ভট্টাচার্য

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

আপনারা কেউ সেই লোকটাকে চেনেন… যে সারা সপ্তাহ শহরের একটা ছোট্ট ফ্ল্যাটে থাকে, খুব পড়ে আর লেখে; আর সপ্তাহান্তে ফিরে যায় তার গ্রামের বাড়িতে? সেখানে তাকে সব্বাই ‘এই যে’ বলে ডাক দেয়, সে দিব্যি দাঁড়িয়ে যায় আড্ডা মারতে, আর শচীন না বিরাট… এই নিয়ে পাড়ার ছেলেদের সাথে বেজায় তক্ক করে? আর তারপর তাদের এড়িয়ে সন্ধ্যের আলপথ ধরে পায়ে পায়ে হাঁটা দেয় নিকোনো দাওয়া আর ধানক্ষেত পার হয়ে কলেজের মাঠের দিকে?
চেনেন না, তাই তো? আসুন, আলাপ করিয়ে দিই সেই আলাভোলা লোকটার সঙ্গে। সে প্রত্যেক শনিবার ফিরে যায় তার বাড়িতে… যাকে তার ইশকুলের ছেলেরা বলে ‘দেশ-পাড়াগাঁ’। আজও গিয়েছিল। আর যেই না সুয্যিমামার ডুব দেওয়া দেখবে বলে মস্ত ছাতটায় ওঠা, অমনি দেখে… বাড়ির সামনের মাঠটায় সাইকেল চালাচ্ছে ওর দুই বন্ধু; একজন পড়ে ক্লাস ফাইভে, অন্যজন সবে কেলাস থ্রি। আর তাকে পায় কে! হুড়মুড়িয়ে একার ছাত থেকে সবার মাঠে নেমে গিয়ে বলল…”শোন, সাইকেলটা দে, আমি চালাব।” তারা দেবে কেন! সাইকেল যদি এক্কেবারে ভেঙেই পড়ে মস্ত লোকটার চাপে! লোকটা অবিশ্যি ছাড়বার পাত্তর নয়। ওরই মধ্যে যেটা বড় সাইকেল, তার থেকে কেলাস ফাইভকে নামিয়ে দিব্যি চড়ে বসল তার উপরে। তারই রডে তুলে নিল কেলাস ফাইভকে। কেলাস থ্রি চলল তারই পিছন পিছন, তার ক্ষুদে সাইকেলটা চালিয়ে। তারপর মফস্বলের ছায়া-ঘেরা গলিঘুঁজি দিয়ে চলল সেই অদ্ভুত অভিযান… একজন অভিযাত্রীর বয়েস ছেচল্লিশ, অন্য দু’জনের যথাক্রমে দশ আর সাত। চলতে চলতে সন্ধে নামল, তিনকেলে অশ্বথ গাছটার নীচে জমল অন্ধকার, পাটক্ষেতের উপর ঝুলতে লাগল কুয়াশার চাদর। এক বুড়ো, এক বড়, আর এক ছোট চলল সাইকেল চালিয়ে; গপ্প করতে করতে, গান গাইতে গাইতে। আলোর জানলায় উঁকি দিতে লাগল কৌতূহলী সব অচেনা মুখ। অনেক ঘুরে, সন্ধে যখন পার; তারা বাড়ি ফিরল। দুই মা তখন চিন্তার গরাদ ধরে রাতের জানলায় দাঁড়িয়ে। আর অমনি সেই ছেচল্লিশ বলে কি…”আমার সঙ্গেই তো গেছে! অত চিন্তার কী আছে… অ্যাঁ!”

আপনারা সফল হ’ন, ভাই। সফল হ’ন, টাকা করুন, বিখ্যাত হ’ন, লাভবান হোন, ভোটে জিতুন। ওই বুড়োটাকে ছেড়ে দিন দু’টো সাইকেল আর দুই অসমবয়সী বন্ধুর সঙ্গে। ও বরং ঘুরে আসুক আঁধার-নামা রাস্তা বেয়ে, বুড়ো অশ্বত্থের তলা দিয়ে, পাটক্ষেত পেরিয়ে…এমন দুই বন্ধুর সাথে… যারা ওকে পাত্তাই দেয় না…বাপের বন্ধুকে শৈশবাবস্থা থেকেই ডাকে ‘রাজাদা’ বলে! কীই বা এমন ক্ষতি হবে তাতে…!!

ছবি: গুগল