বিট…বিটনিক…বিদ্রোহ

হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক, বিত্তশালী পরিবারের ছেলে, গদ্যলেখক উইলিয়াম বারোজ যখন নিউ ইয়র্কে ছিলেন তখন তাঁর মেস-বাড়ির বন্ধু, হার্বার্ট হাংকের মুখে তিনি প্রথম ‘বিট’ শব্দটি শোনেন। সময়টা ছিলো ১৯৪৪ সাল। আর ওই হাংকে ছিলেন এক ঠগবাজ। হাংকের হাত ধরেই হেরোইনের নেশার জগতে বারোজের আগমন। বারোজ অবশ্য হাংকেকে নিয়ে এসেছিলেন লেখালেখির দুনিয়ায়। ওই বাড়িতে উইলিয়াম বারোজের কাছে আসতেন আরেক উঠতি গদ্যলেখক, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত ছাত্র জ্যাক কেরুয়াক। হাংকের কথাবার্তায় বারংবার ‘বিট’ শব্দটির উল্লেখ শুনে তাঁর মনে হয়েছিল যে শব্দটির অর্থ হলো মনমরা অবজ্ঞা । তার মনে হয়েছিল ‘বিট’ শব্দটার মধ্যে আছে এমন এক বৈশিষ্ট যা রহস্যময় এবং আধ্যাত্নিক।

অ্যালেন গিন্সবার্গ

এই কেরুয়াকের বন্ধু ছিলেন অ্যালেন গিন্সবার্গ। হাংকের কথায় আর নিউ ইয়র্কের রাস্তায় চোর-বাটপারদের মুখে বিট শব্দটি শুনে উপলব্ধি করেন যে ওই অঞ্চলে বিট শব্দটির অর্থ হল পরিশ্রান্ত, ঘুমহীন, সমাজের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত, ইন্দ্রিয়তাড়িত, সন্মানের অযোগ্য আত্মনির্ভর মানুষের অবস্থা ।
কবি লুসিয়েন কার গিন্সবার্গকে উইলিয়াম ব্লেক ও জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবোর কবিতা ও জীবনী পড়তে দেন, এবং পরিচয় করান বেনজেড্রিন ও মারিজুয়ানার নেশার সঙ্গে, যেন ওই কবিদের মতন তাঁরাও কবিতা লেখার এক নবীনতম দিব্যদৃষ্টি পান । কেরুয়াকের সঙ্গে পরিচয় ছিল আরেকজন উঠতি লেখকের, তাঁর নাম জন ক্লেলান হোমস। এই কবি কেরুয়াকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তাদের পূর্ববর্তী লস্ট জেনারেশনের সঙ্গে তাদের প্রজন্মের পার্থক্য কী?হোমসের এই প্রশ্নের জবাবে কেরুয়াক বলেছিলেন যে, তাঁদের নিজের প্রজন্মে রয়েছে অস্হির অনুসন্ধানস্পৃহা, বাস্তবের প্রতি ভিন্ন মনোভাব, উচ্ছ্বসিত চাঞ্চল্য, যাবতীয় ফর্ম সম্পর্কে ক্লান্তি, সমাজের নিয়ম-নিষেধ সম্পর্কে বিরক্তি। কেরুয়াক বলেছিলেন যে তাদের প্রজন্মে লোকদেখানো ব্যাপার নেই, তাঁরা ‘বিট জেনারেশান’ ।

মার্কিন লস্ট জেনারেশান বলতে বোঝাত সেই সব লেখকদের যাঁরা স্বদেশের প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর রক্ষণশীলতা, ধর্মের গোঁড়ামী, নীতিবাগীশদের বক্তৃতা, মদ্যনিষেধ আর সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীনতা এড়াবার জন্যে প্যারি শহরে গিয়ে বসবাস করতেন। যাঁদের মধ্যে ছিলেন এফ স্কট ফিটজেরাল্ড, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, কে বোয়েল, রবার্ট ম্যাকঅ্যালমন, হেনরি মিলার প্রমুখ । এফ স্কট ফিটজেরাল্ড বলেছিলেন যে, তাঁদের পরের প্রজন্ম গড়ে উঠেছে আগের প্রজন্মের উন্মাদ ও উন্মার্গগামীদের কারণে । জন ক্লেলন হোমস বিট জেনারেশান কথাটা প্রয়োগ করা আরম্ভ করেন উপরে উল্লিখিত উইলিয়াম বারোজের আড্ডার লেখকদের ক্ষেত্রে। বিট জেনারেশান খুব দ্রুত খ্যাতিমান হয়ে ওঠে। আমেরিকা জুড়ে বহু সাহিত্যযশপ্রার্থী নিজেদের বিট বলে ঘোষণা করতে শুরু করে।

জ্যাক কারুয়াক

তখন ১৯৫৮ সালে এসকোয়ার পত্রিকায় ( দি ফিলজফি অব দি বিট জেনারেশান ) এবং ১৯৫৯ সালে প্লেবয় পত্রিকায় ( দি অরিজিন্স অব দি বিট জেনারেশান ) কেরুয়াক বলতে বাধ্য হন যে বিট জেনারেশান বলতে পাঁচ-ছয় জনের একটি নিউক্লিয়াস বোঝায়, এবং চারিদিকে যে ‘জুভেনাইল ডেলিংকোয়েন্ট’ দেখা যাচ্ছে, তাদের বোঝায় না ।
বারোজ-কেরুয়াক-গিন্সবার্গকে নকল করে আমেরিকায় যেসব উঠতি লেখকরা উদয় হচ্ছিল তখন, স্যান ফ্রানসিসকো ক্রনিকল ১৯৫৮ সালে রাশিয়ার ছাড়া স্পুটনিকের আদলে তাদের নামকরণ করল বিটনিক । লুক ম্যাগাজিন বিট জেনারেশানের সদস্যদের জন্যে একটা পার্টি দিলে, তাতে হাজির হয়েছিল দাড়িগোঁফঅলা বিদঘুটে পোশাকের আড়াইশো বিটনিক যুবক-যুবতী । এসব দেখেশুনে হোমস লিখলেন যে বিটনিকরা আর গণমাধ্যম মিলে বিট জেনারেশানের গুরুত্বপূর্ণ দর্শনকে খেলো, ধোঁয়াটে, হাস্যকর আর বুদ্ধিহীন করে দিয়েছে । বিট জেনারেশান আসলে সাহিত্যিকদের একটা ছোট গোষ্ঠী হিসেবে আবির্ভূত হলেও, গণমাধ্যমের প্রচারে বোহেমিয়ান সাহিত্যিকরা সবাই বিট তকমা পেতে শুরু করেছিলো ।
জাপানে পারমাণবিক বোমা ফেলার পর, এবং নানাভাবে কমিউনিস্ট আতঙ্ক সৃষ্টি করে বামপন্হী মতামতকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী কুড়ি বছর যেভাবে আমেরিকায় কোনঠাসা করা হয়েছিল, নিজেদের স্বাধীন লেখালিখির জন্যে বিদেশে পালিয়ে না গিয়ে খোদ আমেরিকায় বসে যুব সম্প্রদায় যে লেখনীকে আঁকড়ে ধরে তারই ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও নান্দনিক ফসল হল বিট প্রতিসন্দর্ভ অথবা কাউন্টার কালচার ।
লস্ট জেনারেশানের কবি-লেখকরা যেমন বাড়ি ছেড়ে প্যারি মহানগরীতে পালিয়েছিলেন, তেমনি বিট জেনারেশানের নিউক্লিয়াস সাহিত্যিকরা, অর্থাৎ উইলিয়াম বারোজ, জ্যাক কেরুয়াক, অ্যালেন গিন্সবার্গ, গ্যারি স্নাইডার, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টি, গ্রেগরি কোরসো, জন ক্লেলন হোমস, মাইকেল ম্যাকক্লুর, ফিলিপ হোয়ালেন, ডায়না ডিপ্রাইমা, লেরয় জোনস ( আমিরি বারাকা ) প্রমুখ, ছোটো ছোটো শহর ও গ্রাম থেকে পালিয়ে জড়ো হয়েছিলেন নিউ ইয়র্ক ও সানফ্রানসিসকো মহানগরীতে।
হোমস বলেছেন যে, পাঠকের কাছে বিট সাহিত্য পৌঁছে গিয়েছিল একরকম বিকল্প ইমেজ নিয়ে। পৌঁছে দিয়েছিল নবীন মার্কিনী অপ্রতিরোধ্য যুবাচরিত্রর ছবি, যার সঙ্গে পূর্বসূরীদের মিল বলতে আদি আমেরিকান বাধাবন্ধনহীনতা । লস্ট জেনারেশানের সাহিত্যিকরা আমেরিকানদের চোখের আড়ালে প্যারি মহানগরীতে বসে বোহেমিয়ান জীবন কাটাবার ফলে মার্কিন সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে পারেননি । বিট জেনারেশানের বিপুল প্রভাব দেখা দিল আমেরিকার সংস্কৃতিতে । প্রথমে আবির্ভুত হল বিটনিকরা, যাদের প্রভাবে ভিয়েৎনাম যুদ্ধের সময়ে দেখা দিল হিপিরা, যাদের প্রভাবে দেখা দিল পাংকরা । নেশা করায়, যৌনজীবনে, পোশাকে, জীবনযাপনে, লেখায়, আঁকায়, কবিতা পাঠে, রাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের বিরোধীতায়, গ্রন্থ প্রকাশে, ধর্মাচরণে, খাওয়াদাওয়ায় প্রতিফলিত হল বিট জেনারেশানের বাধাবন্ধনহীনতা । বামপন্থী মতামত প্রকাশের জন্যে, মার্কিন সংস্কৃতির একেবারে মাঝখানে, কায়দা করে তারা তৈরী করলেন এমনই একটি পরিসর, যা তাদের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অবদানকে গ্রহণ করতে বাধ্য হলো আমেরিকার মূলস্রোত ।
পর পর কয়েকটি বই মার্কিন গণমাধ্যমকে আকর্ষণ করেছিল বিট সাহিত্যের প্রতি । বইগুলো হলো অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘হাউল’ ( ১৯৫৬ ), জ্যাক কেরুয়াকের ‘অন দি রোড’ ( ১৯৫৭ ), গ্রেগরি কোরসোর ‘বম্ব’, লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির ‘কোনি আইল্যাণ্ড অব দি মাইন্ড’ ( ১৯৫৮ ) এবং উলিয়াম বারোজের ‘নেকেড লাঞ্চ’ ( ১৯৫৯ ) । এই সময় বিটদের রচনা, অথবা বিটদের সাহিত্যে ছেয়ে গেল আমেরিকা জুড়ে প্রকাশিত লিটল ম্যাগাজিনগুলোয় । হাউল, অন দি রোড এবং নেকেড লাঞ্চ কী ভাবে রচিত হয়েছে, সে-সম্পর্কিত মিথ, যা গড়ে তুলতে বিটরা নিজেরাই সচেষ্ট ছিলেন, তা গণমাধ্যমের সাহায্যে ছড়িয়ে পড়তে লাগল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় । হাউল দীর্ঘ কবিতাটি রচিত হয়েছিল নেশার ঘোরে । অন দি রোড উপন্যাস একটানা টাইপ করা হয়েছিল কাগজের পাকানো বাণ্ডিলে । নেকেড লাঞ্চ লেখা হয়েছিল লিখিত বাক্যকে কাঁচি দিয়ে কেটে আর জুড়ে । উপরোক্ত তিনটি বইতে লেখকরা অন্যান্য বিটদের প্রসঙ্গ এনেছেন, এবং সেই সূত্রে খোলাখুলি বয়ান করেছেন পুরুষ সমকাম, যে-ব্যাপারটি তার আগে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বা ইশারায় বলা হতো । বিট লেখিকা ডায়না ডিপ্রাইমা, ক্যারল বার্জ ও মার্গারেট র‌্যানডাল ছাড়া, লেখকদের প্রচারের আলোয় প্রেমিকা বা স্ত্রী হিসেবে চাপা পড়ে গেছেন অনেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন, ক্যারলিন ক্যাসডি, বনি ব্রেমজার, হেটি জোন্স প্রমুখ । লেসবিয়ান উপস্হিতি পাওয়া যায় বিটনিক ও হিপিদের প্রজন্ম থেকে । চূড়ান্ত ভোগবাদী সমাজে, বিট ভাষ্যকাররা পরবর্তীকালে ব্যাখ্যা করেছেন, প্রথানুগত পারিবারিক জীবনকে এড়াবার জন্যে নেশা এবং পুরুষে-পুরুষে সম্পর্কে জরুরি ছিল । বিটদের সাহিত্য ও জীবনযাপনকে সেকারণেই বলা হয়েছিল মার্কিন ভোগবাদী সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রথম যুদ্ধ । তারপরই শুরু হয় নাগরিক অধিকার আন্দোলন, যুদ্ধবিরোধী আন্দোলন, যৌন স্বাধীনতার আন্দোলন, বিদ্যায়তনিক আধিপত্য-বিরোধী আন্দোলন, রক মিউজিকের আন্দোলন, যা অকল্পনীয় ছিল বিট জেনারেশানের আগে । পুলিটজার পুরস্কার পাবার পর গ্যারি স্নাইডার বলেছিলেন, ” বিট হল মনের এক বিশেষ অবস্হা, আর সেই মানসিক অবস্হায় আমি কিছুকাল ছিলুম”। আর কোনো বিট কোনো পুরস্কার পাননি, কেননা সুযোগ পেলেই তাঁরা কলমে আচ্ছা করে ধোলাই দিয়েছেন সমাজ অধিপতিদের । তবে মৃত্যুর পর তাঁদের পাণ্ডুলিপি-নথিপত্র কোটি-কোটি ডলারে কিনেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় । গিন্সবার্গ জীবিতকালেই এক মিলিয়ন ডলারে তাঁর সংগ্রহের চিঠিপত্র ও বই ইত্যাদি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে বিক্রি করেছিলেন ।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল