বেলী ফুল ও কলি-শবনম সমাচার …

কাওসার চৌধুরি

রাবনের বোন সুর্পনখা।

এই সুর্পনখা একদিন রামের সহোদর লক্ষণের প্রেম চাইতে গিয়ে নাকি নিজের নাক হারিয়েছিল লক্ষনের তরবারির আঘাতে (ভুল হলে শুধরে দেবেন)। তাই রাক্ষস রাজা রাবন এই পরিণতি দেখে তার বোনের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন- “কী কুক্ষণে গিয়েছিলি তুই রে অভাগী পঞ্চবটি বনে, সুর্পনখা……”!

আমার অবস্থাও গতকাল সুর্পনখার মত হতে যাচ্ছিল আর একটু হলেই।

বিষয়টি খুলে বলি।

গতকাল (১৭ মার্চ, ২০১৮) সন্ধ্যায় আলিয়ঁসের আড্ডাশেষে গিয়েছিলাম ‘বেঙ্গল বই’তে বোনাস-আড্ডা দিতে। ওখানে গিয়ে পড়লাম ‘প্রাণের বাংলা’র সম্পাদক আবিদা নাসরিন কলির সামনে। দীর্ঘদিন ওঁকে লেখা দেবো বলে প্রতারিত করে আসছিলাম নানান ছলে! আজ বেঙ্গল বই-এ ঢুকেই পড়তে হল সেই রায় বাঘিনীর মুখে! দেখি, কলি বসে আছেন তাঁর মেয়ে নিয়ে, আর তার পাশের চেয়ারে আছেন প্রথিতযশা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শবনম ফেরদৌসী। এদের দুজনই আবার অনেক গুণের গুণি। দেখতে-শুনতে বেশ সুন্দরীও বটেন!

দেখা হওয়ার প্রথম চোটেই কলি মিজাইল ছুঁড়লেন- ‘আমার লেখা কই’!

শবনম

আমার তো তখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা। বহুদিন মিথ্যা বলে পার পাবার চেষ্টা করেছি কলির হাত থেকে। কিন্তু বিধি বাম! আজ সরাসরি বাঘের মুখে পড়তে হল সামান্য ভুলে। একটু আগেই ওঁদের দেখতে পেলে বাগানের দিকে না গিয়ে দোতলায় ওঠে চুপ মেরে বসে থাকতাম দুই বাঘিনীর প্রস্থান না হওয়া পর্যন্ত। এখন সামনে পড়ে গিয়েছি, কী আর করা!

মিজাইলের আক্রমন ঠেকাতে ওঁদের প্রেমে গদগদ হয়ে যাই!

হাজার হোক, শবনম ফেরদৌসী কিন্তু আবিদা নাসীরন কলির ভালো বন্ধু। ভাবলাম, শবনমকেও যদি কোনভাবে ম্যানেজ করা যায় তাহলে ওঁর সুপারিশে কলি হয়তো মিজাইল ছোঁড়া বন্ধ রাখবেন কিছুক্ষণ!

প্রথমেই খুব মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে শুরু করি।

ওঁদের রূপের প্রশংসা, জামাকাপড়ের ফ্যাশন, শাড়ি-চুড়ি গয়না- এসবের ব্যাপক প্রশংসা শুরু করি। তাতে কলির আগুনের আঁচ কিছুটা কমে এলেও শবনম কিন্তু অগ্নিশর্মা! উনি আবার ভীষণ ঠোঁটকাটা। ফট-ফটাশ করে সত্য কথাটি মুখের ওপরে বলে ফেলেন! শবনম সিঙ্গেল শটে দু’একটি ফায়ার করেই যাচ্ছিলেন।

এমন সময় হঠাৎ মনে পড়লো-

আমার হাতে দু’টি বেলী ফুলের মালা আছে। ওগুলো দিয়ে ওদেরকে ম্যানেজ করিনা কেনো! ওই মালাদু’টো আবার আলিয়ঁস থেকে বেরোবার সময়ে দিয়েছিল আমার এক অনুরাগী। বেরোবার সময় একদম গেটের মুখে দেখা সেই অনুরাগীর সঙ্গে। মেয়েটি আবার আমার ছাত্রীও বটেন। আলিয়ঁসের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে একটি বাচ্চা মেয়ে ফুলগুলো বিক্রী করছিল।  আমাকে দেখেই ছাত্রীটি দু’টো মালা কিনে আমার হাতে দিয়ে বললো- স্যার এগুলো আপনার জন্য। জানি ভালোবাসার অর্ঘ্য ফেরাতে হয়না! সে কারনে মালা দু’টো সাদরে গ্রহন করি।

তারওপরে বেলী ফুলের প্রতি আমার ভিন্ন একটি আকর্ষণ আছে।

আমার প্রথম প্রেমিকার নাম বেলী। আহা রে প্রথম প্রেম, সে আজ বহু বছর আগের কথা। সেই তিয়াত্তর সালে মা মারা যাবার পরে স্নেহ-ভালোবাসার কাঙাল হয়ে ঘুরছিলাম! বাবা মারা গিয়েছিলেন বাহাত্তরে। আমার এতিম হৃদয়টি তখন একেবারেই তরল! সেই সময়ে উষ্ণ প্রেমের ডালি নিয়ে এগিয়ে এলো বেলী। প্রেমের ডানায় আগলে রাখলো অনেকদিন। একদিন আমাদের অভিভাবকের কাছে ধরা পড়ে প্রথম প্রেমে এলো বিচ্ছেদ। সে কী বেদনা, সে কী হাহাকার! একদিকে বাবা-মা হারানোর শোক, অন্যদিকে প্রথম প্রেমের বিচ্ছেদ- পাগল হয়ে যাবার দশা!

আসলে পুরুষরা বোধহয় এক নারীতে ‘কন্যা-জায়া-জননী’ খুঁজে বেড়ায় সারাজীবন!

আমিও খুঁজেছিলাম বেলীর মাঝে! জীবনের ওই প্রারম্ভিক-বয়সে বেলী এই ‘কঠিনতম’ বিষয়টি কতটা বুঝেছিল সঠিক বলা যাবেনা! তবে ওর ওই বয়সে বুঝতে না পারাটাই তো স্বাভাবিক। …… আহা রে বেলী-ফুল, আমার প্রথম প্রেম!

বেলী ফুলের বয়ান দিতে গিয়ে কত না কাহিনী এসে গেলো।

তবে মূল বিষয় হল, হাতের বেলী ফুলের মালা দু’টো দিয়ে কলি আর শবনমকে ম্যানেজ করার চেষ্টা করলাম। প্রথমে মালা দুটো ওদের খোঁপায় জড়াতে গিয়ে দেখি খোঁপা তো দূরের কথা ছোট্ট এক টুকরো বেনীও নেই ওদের। দুজনেরই একই অবস্থা! হায় রে ‘কলি-কাল’!

কী আর করা!

অবশেষে ওদের হাত টেনে ধরে তাতেই পরিয়ে দেই মালা দু’টো, অনেকটা জোর করেই! কলি অবশ্য যেমন তেমন, শবনম তো হাতই ধরতে দিতে চায়না! পাশের টেবিলে ক’জন অল্প বয়েসী ছেলেমেয়ে বসে ছিল। ওরা আমাদের বুড়োবুড়ির কাণ্ড দেখে মনে মনে হাসছিল বোধহয়! কিন্তু কে শোনে কার কথা!

জোর করে দুজনের হাতে ফুলের মালা পরালাম বটে,

কিন্তু একজনও দেখি সে মালা খুলে রাখলোনা! হয়তো আমার মান রক্ষার্থে কিংবা ভালোবাসায়! কী মজার ব্যাপার দেখুন, আলিয়ঁসের সামনে আমার এক অনুরাগীর দেয়া ফুল- আমার প্রথম প্রেমের স্মৃতি নিয়ে চলে গেলো নতুন দুটি হাতে। প্রেম-ভালোবাসা বড়ো বিচিত্র। প্রেমের কোন কাল নেই, সময় কিংবা স্থান নেই! নেই কোন পাত্র-পাত্রী কিংবা জাতপাতের বাধা। সেই তিয়াত্তরের বেলী ফুল আলিয়ঁস হয়ে বেঙ্গল বই-এর আঙ্গিনায়! নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন এ কারনেই বোধহয় লিখেছিলেন- “ আহা রে জীবন, এক জনমে কত বদল”!

তবে বন্ধুগণ, একটি বিষয় একটু পরিষ্কার না করলে ভুল বুঝবার অবকাশ থেকে যাবে।

তিয়াত্তরে, বেলীর কাছে আমার মত আনাড়ি এক প্রেমিকের আবেগ, আর দু’হাজার আঠারোতে এসে আলিয়ঁসের সামনে আমার ছাত্রীর অর্ঘ্য, আর বেঙ্গল বই-এ কলি-শবনমের হাতে বেলী ফুলের মালা পরানোতে যোজন যোজন ব্যবধান রয়ে গেছে। তিয়াত্তরে বেলীর কাছে অনেক চাওয়া ছিল আমার, প্রত্যাশা ছিল, প্রতিশ্রুতি ছিল। এখন আলিয়ঁসের সামনে আমার ছাত্রীটি কিংবা কলি-শবনমের কাছে আদৌ কি সে রকম কোন প্রত্যাশা আছে? আমার মনে হয় নেই! এখানে শুধুই বন্ধুত্ব, শ্রদ্ধা আর শুধুই ভালোবাসা!

তবে ভালোবাসা থেকে প্রেমের দূরত্ত্ব কি এতটাই বেশি?

এরা কি একে অন্যের মাঝে বসবাস করেনা? হয় তো করে, হয় তো করেনা! এই ষাটোর্ধ বয়সে এসে আমার সেই ছাত্রীটি কিংবা কলি-শবনমের কাছে তিয়াত্তরের সেই বেলী ফুলের প্রেম নিশ্চই চাইবোনা!

অনেক ভালো থাকুন কলি-শবনম আঃর আমার ছাত্রিটি!

প্রেম ভালোবাসার জয় হোক।

বেলী ফুলের সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক সবার মাঝে!

ছবি: কাওসার চৌধুরী