কত কি বলার আছে বাকী…

লুতফুন নাহার লতা

সে অনেক আগের কথা । দেশ তখনো স্বাধীন হয় নি । খুলনায় আমাদের পাড়ায় সে সময় হিন্দু , মুসলমান , বৌদ্ধ , খৃস্টান আমরা সবাই এক সঙ্গে অসম্ভব সৌভ্রাত্রিত্বের মধ্যে ছিলাম । আমরা বড় হয়েছি ঈদ , পূজো, বড় দিন, বৌদ্ধ পূর্ণিমা সব পালন করে। খুব যখন ছোট ছিলাম আমার মা বাড়ীতে ফেরিওয়ালা ডেকে গজ কাপড় কিনে খালা বা মামীকে দিয়ে যেমন আমাদের ঈদের নতুন জামা দেবার ব্যবস্থা করতেন, তেমনি পূজো আসলেও নতুন জামা বানিয়ে দিতেন । বাড়ীর সামনে সুশীল সরকারের বাড়ী !উনাদের সকল জ্ঞ্যাতিদের ঘর বাড়ী ঘিরে ছিল এই পাড়া, সে কারনেই এই পাড়ার নাম সরকার পাড়া। আমাদের বাড়ীর সামনেই সুশীল কাকার বাড়ীর বড় মাঠ, তারপরে তাঁদের পুরনো দিনের পলেস্তারা খসা ইটের দালান বাড়ী । আমাদের পাড়ায় তখন ইটের বাড়ী খুব কম ছিল । তো সেই বাড়ীর বারান্দা ছিল অসম্ভব রকমের উঁচু । মাঠে দাঁড়িয়ে মাথা উঁচু করে তাকালে , মনে হত মঞ্চের দিকে চেয়ে আছি । সুশীল কাকার এক জন ভাই ছিল, কালী পূজোর দিনে তিনি অনেক কান্না কাটি করতেন , সম্ভবত একটু আধটু নেশা টেশা করতেন বলে, আজ তাঁর নাম আর মনে নেই । ওনার মাকে ছেলেমেয়েরা সবাই ডাকতো ঠাকুর মা , কিন্তু সংক্ষেপে ঠাম্মা । আমিও তাই ঠাম্মা’ কাছে ডেকে নাড়ু খেতে দিলে একবারের জায়গায় দুইবার ঠাম্মা ঠাম্মা করতাম ।

আমাদের সেই খেলার মাঠে হোলির রঙ খেলা হতো । পূজো হতো । বাতাসা ,মোয়া , চিড়ে কলা নারকেল দিয়ে মাখা , আখ কিম্বা নাড়ু এসব খেতাম সারাদিন , আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পূজোর আনুষঙ্গিক ক্রিয়াকর্ম দেখতাম মুগ্ধ হয়ে ! সন্ধ্যার পরে আমরা সব ছেলেমেয়েরা দল বেধে চাটাইয়ে বসে রাত জেগে কীর্তন গাইতাম কীর্তনিয়াদের সঙ্গে, সঙ্গে বাজতো ঢাক, ঢোল , কাসর , মন্দিরা , আর মাঝে মাঝে শাঁখ ,উলুধ্বনি । মাথায় শিশির পড়বে বলে মা চাদর দিয়ে হাত টাত সমেত মাথা মুড়ে একটা কাঠ পুতুলের মত কাপড়ের পোটলা বানিয়ে দিতেন।

সুশীল কাকার ছেলে মেয়েদের অদ্ভুত বাজে ধরনের নাম ছিল ! যেমন পাদা দিদি , টেমু দিদি , রুনু , ঝুনু, টুনু ,ভোদড় , ত্যান্দড় , বান্দড় । উনার ছেলেমেয়েদের যমের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এই সব নামকরণ , অথচ ওদের ভালো নামগুলো রেখেছিলেন অসাধারন । অরুন , গোরা , রূপা । গোরা দা কে আজো আমরা ডাকি গড়া দা বলে ।

স্বাধীনতার পরে উনার সেই ভাই আর ফিরে আসেনি , পথে শরনার্থী শিবিরে ঠাম্মা মারা যান , আর টেমু দি এসেছিলেন ফিরে ! কিন্তু কি জানি কি হল, কিছুদিন পরে একটু একটু করে শিশি ভরে এসিড কিনে কিনে জমিয়ে রাখছিলেন! ওদের বাড়ীর কেউ ওর সঙ্গে ভাল ব্যাবহার করতো না ! টেমু দি মাঝে মাঝে মিনিদের বাড়ীতে আসতেন , আমাদের সঙ্গে কত যে গল্প করতেন , কিভাবে দেশ থেকে পালিয়েছিল , কোথায় কোথায় কিভাবে কেটেছে পথে প্রান্তরে ! শরনার্থী শিবিরে কিভাবে ছিল ওরা ! আজ মনে প্রশ্ন জাগে ও কি সত্যি যেতে পেরেছিল ওপারে ! নাকি মিলিটারী আটকে ফেলেছিল ওকে ! কি হয়ে ছিল সেখানে ওর !

তখন সে সব কথা জানতে চাওয়ার মত বয়স হয়নি আমার বা মিনির ! কিন্তু আমরা নীরব হয়ে টেমুদির কথা শুনতাম । হঠাৎ মুক্তির আশায় একদিন সেই জমিয়ে রাখা এসিড পান করলেন আকন্ঠ ! কিন্তু না , সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হল না তাঁর ! আরো কতদিন অর্ধদগ্ধ তন্ত্রী নিয়ে আর্তনাদ করে করে একসময়ে হারিয়ে গেলেন । একদিন ভোর বেলায় ঘুম ভেঙ্গে সামনের বাড়ীর বন্ধু মিনি’র কাছে শুনলাম টেমু দি আত্মহত্যা করেছেন । হ্যাঁ কাল রাতে ও মারা গেছে । ও বাড়ী থেকে সকাল হবার আগেই ওঁর সকল স্মৃতি মুছে ফেলা হল ! খুলনার রূপসা নদীর ধারে শ্মশানে ওকে চির বিদায় দিয়ে নিঃশব্দে ফিরে এলেন ওঁর বাবা , দাদারা ! আমার মা খুব ভোরে উঠে চুলায় ভাত চাপিয়ে দিয়ে জায়নামাজে বসে নামাজ না পড়ে মুখে আঁচল চেপে নিঃশব্দে কাঁদছেন ! পাশের বাড়ীর জর্জদার বোন বেলাদি, রোজকার মত সেদিনও গলা সাধছেন ‘উঠাতা বাজা মুরালী আজা গুনিয়ান কি কুঞ্জমে ‘

সেদিন থেকে ওবাড়ীতে কেউ কোনদিন ওঁর নাম উচ্চারন করেনি আর !

কেন ?

নাহ মন খারাপ হয়ে গেল ! ভেবেছিলাম টেমুদির কথা একদিন সময় করে লিখবো , আজ কেবল হোলির আনন্দ, পূজোর আনন্দের কথা লিখবো আর এবারের হোলির দিনে আমাকে কেউ আসতে বললো না ! আমার বন্ধুরা ! এমন কি খুশীও একবার বললো না ! এসব ভেবে অভিমানে কিছু লিখতে চেয়েছিলাম !

আমার যে অনেক কথা বলার ছিল !

ছবি: লেখকের  ফেইসবুক থেকে