বইমেলা, অন্য মেলা

আজ থেকে প্রায় পাঁচ ছয়’শ বছর আগে জোহানস্ গুটেনবার্গের টাইপরাইটার বা মুদ্রণযন্ত্র  আবিষ্কারের ফলে সারা বিশ্বে ঘটে গিয়েছিল  প্রযুক্তির উন্নয়ন আর সাংস্কৃতিক  বিপ্লব।ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত বই  গ্রামে গ্রামান্তরে প্রত্যন্ত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়েছিলো। স্কুল কলেজে বিদ্যাশিক্ষা হয়েছিল বইনির্ভর। প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষদের জন্য বই হলো সহজলভ্য। মানুষের জ্ঞানের দুয়ার হয়েছিলো উন্মুক্ত ।

কলকাতা বইমেলা

মেলা শব্দটির সঙ্গে আমরা শৈশব থেকেই পরিচিত।একেক ধরনের মেলার আকর্ষণ একেক রকম।মেলার উৎসবমুখর পরিবেশ চারপাশে মন কাড়া সামগ্রী সবসময় মনকে টানে।সাম্প্রতিককালের একটি জনপ্রিয় মেলা হলো বইমেলা।একটি দেশের শিল্প সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়
বইয়ের মাধ্যমে।  ফ্রাঙ্কফুর্ট, কায়রো, লন্ডন , সিঙ্গাপুর
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বইমেলা যথেষ্ট জনপ্রিয়।এছাড়া
প্রতিবছর উৎসবের মেজাজে শুরু হয় কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা যা বিশ্বে তৃতীয় স্থানে আছে। ফ্রাঙ্কফুর্ট আর লন্ডনের পরেই।ঢাকা শহরের বইমেলা ও যথেষ্ট জনপ্রিয়।বইয়ের প্রচার প্রসার আর বাজার সৃষ্টির জন্য প্রকাশকরা বইয়ের পসরা নিয়ে বসেন যার আধুনিক রূপায়ন বইমেলা।বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত গ্রন্থ সহজেই মানুষের কাছে পৌছে যায়। ভালো লেখার সঙ্গে মানুষ পরিচিত হন। আজকের দ্রুতগতির জীবনে  সময়ের অভাবে বই আমাদের জীবন থেকে অনেকখানি সরে গেছে।বিশেষ করে আমাদের বাঙালিদের ইংলিশ মিডিয়ামে বাচ্চাদের পড়ানোর যে প্রবণতা তার জন্য শিশুরা ছাড়াও অনেক প্রাপ্তবয়স্করাও বাংলা পড়তে পারেন না। বাংলা সাহিত্য অনেকটাই ক্ষতিগ্রস্ত। এছাড়া অনলাইনে
নিজের পছন্দের বই পড়ার সুযোগ,  ঘরে বসে খুব সহজেই বই কেনার সুযোগ মানুষকে করে তুলছে বইমেলা বিমুখ।

একটি জাতির মেধা ও মননের আঁতুড়ঘর হল বইয়ের জগত। মানুষকে বইমুখী করে তোলার পেছনে বইমেলার যথেষ্ট অবদান রয়েছে। বইমেলা যে শুধু বইয়ের কেনাবেচা তা নয়। প্রকাশক ও লেখকদের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য সাধনের পাশাপাশি নানারকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ,সাহিত্য নিয়ে আলোচনাচক্র ,বিভিন্ন লেখকের উপস্থিতিতে বইমেলাকে নানাভাবে আকর্ষণীয় করে তোলা হয়। আজকাল বইমেলা অনেকখানি প্রযুক্তিনির্ভর। লেখকরা অনলাইনে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে নিজের পাঠকমন্ডলী তৈরী করে নেন।ফলে পাঠকরাও লেখকের লেখার সঙ্গে আগে থেকেই পরিচিত থাকেন।
বইমেলায়  প্রিয় লেখকের উপস্থিতি লেখক পাঠকের সম্পর্কের উষ্ণতায় মুখর হয়ে ওঠে। লেখকের অটোগ্রাফসহ বই সংগ্রহ করার ইচ্ছেতেও পাঠকরা বইমেলায় উপস্থিত থাকেন।লেখক পাঠকের অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠেন। তার মধ্যে ও লেখার স্পৃহা জাগে ভাবী কালের লেখক হবার স্বপ্ন জাগে। এতে বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধ হচ্ছে বা বইয়ের বিক্রি কিছুটা হলেও বাড়ছে। কিন্তু বইমেলা ঘুরে দেখলে মনে হয় মানুষ এখনো অনেকখানি বইমুখী নন। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ভীড় জমলেও বই হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করা মানুষ খুব কম।

ঢাকা বই মেলা

বিশেষ করে বাংলা বই কেনার একটা অনীহা আজ ও আছে।ইন্টারনেটের অতি রিক্ত প্রচার ও প্রসার আমাদের  বই পড়ার অভ্যাসকে নষ্ট করেছে। ইন্টারনেটে বিনোদনের কোন অভাব নেই। সেখান থেকে সরে গিয়ে বইয়ের জন্য সময় বের করা মুশকিল।আবার বইমেলাকে মাথায় রেখে ও অনেক বই প্রকাশিত হয় যার গুণগত মান  ঠিক থাকেনা। নানা কারণে বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তা কোথাও যেন থমকে আছে। দুই বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে বাংলা বই য়ের একটা বড় বাজার তৈরী হতে পারত।

বই কেনা বা বই পড়া একটা বিশ্বাসের জায়গা। লেখক যা বলতে চাইছেন তা বিশ্বাস করতে পারা বা পাঠকের মনে তার গভীর রেখাপাত এটাই দরকার আর অনলাইন সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে এই জায়গাটা থেকে পাঠক তৈরী হচ্ছে। একসময়ের বিপন্নতা হয়ত কাটিয়ে উঠছে বাংলা সাহিত্য।বইমেলায় সব বয়সের পাঠকদের জন্য সব রকমের বইয়ের বিপুল সম্ভার থাকে।ফলে স্কুল পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও আমরা আমাদের জ্ঞানের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করতে পারি। একজন প্রকৃত শিক্ষিত জ্ঞানী মানুষ হয়ে ওঠার জন্য প্রচুর বই পড়ার প্রয়োজন। যান্ত্রিক পরিসরে বই পড়ার সীমাবদ্ধতা তো আছেই।  একটি তরতাজা বইয়ের পৃষ্ঠা উলটে পালটে দেখা নতুন বইয়ের মলাটের মিষ্টি গন্ধের আবেদন কখনোই ফুরোবে না। ছাপার অক্ষরে বই পড়লে আমাদের চোখটা ও অনেকখানি সুরক্ষিত রাখা যায়। বইমেলার আয়োজন জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারকে মানুষের কাছে তুলে ধরার এক অনবদ্য প্রয়াস। দেশ বিদেশের সাহিত্য পড়ার মধ্যে দিয়ে পৃথিবীর পরিধি ও অনেক ছোট হয়ে আসে আমাদের কাছে। নাগরিক জীবনের ক্লান্তিকর একঘেয়েমির মাঝে বইমেলার ক’টা দিন জীবনে শান্তি আনে স্নিগ্ধতা আনে। বইমেলার উৎসবমুখর প্রাঙ্গণ অনেক মানুষের মিলনমেলা।  বইমেলা আজ ও বিশেষ করে বাঙালিদের কাছে প্রাণের উৎসব। প্রিয় লেখকদের প্রতি ভালোবাসা আবেগ মানুষকে টেনে নিয়ে আসে বইমেলায়।  এছাড়া জাতীয় মেধা  ও মননকে সমৃদ্ধ করে বইমেলা। তাই  এই মেলাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে আমাদের।

শুধু বইমেলা কে মাথায় রেখে নয়, সারাবছর সৃষ্টির সম্ভারকে সমৃদ্ধ করতে হবে । ভালো লেখাকে মর্যাদা দিতে হবে , লেখার গুণগত মান বজায় রাখতে হবে।
বইকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে অনেক পাঠকের হৃদয়কে যা ছুঁয়ে যাবে। সাহিত্য নিয়ে আলোচনা সভায় সাধারণ মানুষকে ও অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত। তাদের মতামত বা তারা যদি সাহিত্য নিয়ে চিন্তাভাবনা প্রকাশের সুযোগ পান বা তাদের চাহিদা অনুযায়ী লেখার দায়িত্ব নিলে বই পড়া বা বই কেনার চাহিদা ও বাড়বে।
পারস্যর কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন ‘  রুটি মদ একদিন ফুরিয়ে যাবে,প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে,একখানি বই অনন্তযৌবনা যদি তেমন বই হয়’। বড় বড় সাহিত্যিকদের বই আজ ও সমান জনপ্রিয়। কিন্তু আজকের  বিশ্বায়নের যুগে নতুন প্রজন্মকে বইমুখী করে তোলা বা ইন্টারনেটের দুনিয়া থেকে বইমেলায় তাদের টেনে নিয়ে আসার খুবই প্রয়োজন।বিশেষ করে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ থাকা বাঞ্ছনীয়।

ফ্রাঙ্কফুট বইমেলা

সাহিত্যবোধ না থাকলে জীবনে রসবোধ থাকেনা জীবন  হয় যান্ত্রিক। প্রচুর মানুষের বইমেলায় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি মেধাবী জাতি তৈরী হতে পারে। এর জন্য সরকার থেকে শুরু করে  সাধারণ মানুষ আমাদের সকলেরই দায়িত্ব জন্মায় বইমেলার আয়োজন যেন সব জায়গায় সাফল্যমণ্ডিত হয়। ভালো বই পড়া অন্যকে পড়ানো প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া এসব কিছুর মধ্যে দিয়ে যেন মানুষ বই এর অনুরাগী হন এই চেতনা মানুষের মধ্যে জাগাতে হবে।
বিশেষ করে আজকের তরুণ প্রজন্ম যারা নেট দুনিয়া থেকে চোখ সরাতে পারেন না।তাদের মধ্যে এই চেতনার খুবই প্রয়োজন।আজকের তরুণ লেখকদের অনেকখানি দায়িত্ব এই প্রজন্মকে সাহিত্য অনুরাগী করে তোলার।রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ‘ভালো বই আত্মশুদ্ধির শ্রেষ্ঠ উপায়। বন্ধুত্ব মানুষের সুখ দুঃখ দুইয়েরই কারণ হতে পারে। একটি ভালো বই  এমন বন্ধু হতে পারে যা কখনো প্রতারণা করেনা।’ বইমেলার আয়োজন সকল মানুষের সর্বাঙ্গীন উপস্থিতিতে ভীষণভাবে সাফল্যমণ্ডিত হোক ভবিষ্যতে এটি একটি বৃহত্তর সাংস্কৃতিক মেলায় পরিণত হোক।

ছবিঃ গুগল