জেলখানায় ভূত…!

পরিমল মজুমদার

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

৮৭ সাল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। আমিও সেই আন্দোলনে শামিল। এক পর্যায়ে আমাকে বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটক করে তিন মাসের ডিটেনশন দিলো জালিম সরকার। কুড়িগ্রাম জেল, আকারে ছোট। আমি মেডিকেলে রাজবন্দীর মর্যদা  পেলাম।

এরই মাঝে বর্ষা এসে গেল। সেই বর্ষার এক রাত। তখন আনুমানিক দু’টো বাজে। নির্ঘুম রাতে চায়ের তেষ্টা পেলো।মন্টু নামে এক ছেলে আমার ফুট-ফরমাস খাটার জন্য নিযুক্ত ছিলো। তাকে বললাম একটু চা বানাও। জেল খানার সম্বল থালা-বাটি-কম্বল বলে একটা কথা আছে। সেই থালা-বাটির বাটিতে চা বানানো হলো। সেই চায়ে উড়ে এসে ভাগ বসালো জেল খানার এক বাবু ( জেলে কারারক্ষীদের বাবু বলে সম্বোধন করতে হয়)।

বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে, সঙ্গে দমকা বাতাস। কারারক্ষী জানালো, সময় পার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার বদলী লোক এখনো আসছে না। উসখুশ করছে সে।
আমার ওয়ার্ডের সামনে একটা গেট আছে। গেট আর ওয়ার্ডের মাঝখানে ৪০/৫০ গজ ফাঁকা জায়গা। আমি বসে আছি কম্বলের উপর, গরাদের সামনে।

হঠাৎ স্বল্প আলোয় গেটের সামনে, একটা ডালিম গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে বর্ষাতি পরা এক কারারক্ষীর অবয়ব ফুটে উঠলো। আমি তখন আমার সঙ্গে থাকা কারারক্ষী সিরাজুলকে বললাম, আপনার ডিউটি শেষ বদলী লোক এসে গেছে। ওই কথা শোনার পর সিরাজুল তরিঘরি করে গেটের দিকে গেলো। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে আমাকে বললো, আপনি কি সত্যি সত্যি বদলী ডিউটিতে আসা কাউকে দেখেছেন ? আমি আবারো বললাম হাঁ দেখেছি। এ কথা শোনার পর আবার সে জেল খানার প্রধান ফটকে গেলো। সেখান থেকে সে ফিরে এসে জানালো, গেটের সেন্ট্রি তাকে বলেছে, কোনো কারারক্ষী বদলী ডিউটিতে যোগ দেয়ার জন্য জেলের ভিতরে ঢোকেনি।

এরপর যা ঘটলো তা নিয়ে রীতিমতো অস্বস্তিকর ব্যাপার। প্রায় ২০ মিনিট পর বদলী কারারক্ষীরা ভিতরে এলো। তারা সব কিছু শোনার পর ভয় পেতে শুরু করলো। একজন বললো, আমি ভূত দেখেছি। আর একজন বললো, সে যখন রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে কর্মরত ছিলো সেখানে এরকম ভূত দেখেছিলো। তার ভাষায় জেলে যে সমস্ত কয়েদীর ফাঁসি হয় তাদের অ-শরিরি অতৃপ্ত আত্মা জেলের ভিতর ঘুরে বেড়ায়। সুযোগ পেলে কাররক্ষীদের ঘাড় মটকে দেয়।

এরপর সেখানে এসে জড়ো হলো, জেলের ভিতরে ডিউটিরত ১০/১২ জন রক্ষী। অবস্থা এমন দাড়ালো, কেউ আর তাদের জায়গা মতো ডিউটিতে যাচ্ছেন না। কেউ আবার সুরা পড়ে গায়ে ফু দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রাচীরে ঘেঁষে যাদের ডিউটি, তারা একেবারেই বেঁকে বসলো।

এ খবর এক পর্যায়ে জেলারের কানে পৌঁছালো। জেলার অগ্নিশর্মা হয়ে আমার দিকে কটমট তাকাচ্ছেন আর কারারক্ষীদের ধমকাচ্ছেন ডিউটিতে যাওয়ার জন্য। একজন কেঁদে বললো, স্যার আমার বাল-বাচ্চা আছে..। আবার ধমক জেলারের। এক পর্যায়ে ডিউটিতে গেলো সবাই।

পরদিন সকালে জেলার আমাকে ডেকে পাঠালেন তার অফিসে। সেখানে যাওয়ার পর আমাকে প্রচুর ধমকানো হলো। বলা হলো যারা রাজনীতি করে তারা সব যায়গায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদের মতো আমার শাস্তি হলো। জেনারেল ওয়ার্ডে চোর-ছ্যাচরদের সঙ্গে থাকার জন্য কম্বল, থালা-বাটি সহ পাঠানো হলো।

আমাকে শাস্তি দিলে কি হবে, কারারক্ষীদের মন থেকে আর ভূতের ভয় যায় না। তারা জানে, আমার এসবে বিশ্বাস নাই, আমি ভূত দেখলে তা অবশ্যই সত্যি। এরপর আমি এদের যত বুঝাই ভূতে আমার বিশ্বাস নাই, তারা সে কথা কিছুতেই বিশ্বাস করে না। এভাবে প্রায় সাড়ে চার মাস যাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমার মুক্তির আদেশ আসে। আমি জেল থেকে মুক্তি পাই। আর গোটা জেল জুড়ে বাসা বেঁধে থাকে ভূতের ভয়…. ।

ছবি: গুগল