অতিমাত্রিক

সাব্বিরুল হক

এক.
পুরাকীর্তির বিশাল ধ্বংসস্তুপের সামনে দাঁড়িয়ে নাকে লাগল বিপদের গন্ধ। দমকা গরম হাওয়া বয়ে গেল চারপাশে কয়েক দফা। শেয়ালের ডাক শুনতে পেলাম দূরে। অথচ দেখে এসেছি এটা দিন-দুপুর। কর্কশ শব্দ করে উপর দিয়ে উড়ে গেল অজানা পাখি। আরও অচেনা তার গলার স্বর। উঁচু গাছ-পালার ডালে হুড়োহুড়ির আওয়াজ শুনে তাকালাম উপর দিকে । লাফিয়ে চলে গেল লালচে বানরের দল। দু’চারটে হনুমানও মনে হল রয়েছে দলের ভেতর। একসঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে আরেকটা বড় গাছে যাওয়ার পথে মল ত্যাগ কয়েক পশলা। পড়ল এসে আমার সামনেই। ধারে-কাছের শতবর্ষী গাছে ডাক শুনতে পেলাম বারকয়েক। মনে হল হুতোম প্যাঁচা ডাকছে । বিধ্বস্ত পুরাভবনের ওপারটা অন্ধকার। ওখানে যেতে সাবধান করে দেয়া হয়েছে আমাকে হাজারবার। করেছে জৈন্তা রেষ্ট হাউসের ম্যানেজার। নাম মনে করতে পারছি না ম্যানেজারের। মনে করতে চেষ্টা করলাম দু’একবার। এই কারণে যে, নাম মনে আসলে লোকটার জানিয়ে দেয়া সতর্ক বার্তা এবং অন্যান্য বিষয়গুলোও স্বরণ করতে পারতাম। প্রাচীন, অভিশপ্ত এই ধ্বংসকীর্তির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারা সহজ হয়ে যেত আমার জন্য।
সঙ্গে যে ক্যামেরাটা রয়েছে সেটা বেশ উন্নতমানের। বিদেশ থেকে পাঠিয়েছে এক বন্ধু। ক্যানন এসএলআর। ফটোগ্রাফিতে আমার শখ জানত সে। শক্তিশালী লেন্সের ক্যামেরা। জুম করলে অনেক দূরের বিষয়বস্তুও লাফ দিয়ে চলে আসে কাছে। দ্রুত ঝটপট ছবি তোলে ফেললাম বেশ কয়েকটা। ডিসপ্লে দেখে নিশ্চিত হলাম উঠছে ছবিগুলো। ভালই বেশ স্পষ্ট। পুরাভবনের ধ্বংসস্তুপের আকার বিরাট। অনুমান করলাম ১৫০-২০০ ফুট উঁচু হবে। স্থাপনাটা ছিল জৈন্তা রাজপরিবারের মূল বাসভবন। পুরোটা মিশে যেতে পারেনি মাটিতে। মাঝে মধ্যেই রয়ে গেছে ভেতরে ঢোকার মতো পথ। ফাঁকা দেয়াল আর বড় বড় খিলানের ভাঙ্গা অংশ বিশেষ। দীর্ঘযুগ ধরে জনবসতিহীন এলাকায় পড়ে আছে ধ্বংসভবন। প্রাচীন কীর্তির সাক্ষী দিতেই যেনো। রেষ্ট হাউসের ম্যানেজার বলেছিল প্রচুর অভিশাপ আছে জৈন্তা রাজবাড়ি ঘিরে। আছে অপশাসন আর নৃশংস অত্যাচারের শাপান্ত। কান পাতলে নাকি করুণ আর্তনাদ শোনা যায় বিদ্ধস্ত ভবনের দেয়ালে। অথচ জৈন্তারাজের শাসন কালের পর পেরিয়ে গেছে শতাব্দী। ম্যানেজারের নাম মনে আনতে চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হলাম আবারও। মনে পড়লে তার কাছে শোনা আরও কিছু বিপদ-আপদের কথাও চলে আসত নিঃসন্দেহে। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম যা হয় হবে ধ্বংসস্তুপের ভেতর দিয়ে এগিয়ে যাব সামনে। অনুভব করতে শুরু করলাম শ্বাসরুদ্ধকর রোমাঞ্চের হাতছানি। অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে, আসুক। একা অন্ধকারকে ভয় করি না আমি। বিপদ যতই ভয়ানক হোক, সাহস আর শক্তি সঞ্চয় করে নেয়ার অভ্যেস আমার অনেক দিনের। একদল কুকুরের ডাক শুনতে পেলাম হঠাৎ। পর-পরই শিয়ালের পলায়নপর আর্তনাদ। ঘেউ-ঘেউ, হুক্কা-হুয়া। এ সময়টায় শিয়াল কুকুর সামনা-সামনি হলো কোথা থেকে ! আশে-পাশে নির্জন বন-জঙ্গল দেখেছি। দূরে খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের চূড়াও চোখে পড়েছে। পাহাড়ের গায়ে জঙ্গল আর গাছপালা। যাকে বলে গহীন বনাঞ্চল। অভাব নেই অজানা-অচেনা জীবজন্তুর । একটু শীত নামলে পাহাড় জঙ্গল থেকে নেমে আসে চিতাবাঘ, বনবিড়াল আর বাঘডাসের দল। একশ বছরেও কাটা হয়নি এই রেইন-ফরেস্টের গাছ-গাছালি। সুবিশাল একেকটা গাছ মাথা উঠিয়েছে আকাশ পর্যন্ত। অবাধে চড়ে বেড়াচ্ছে গাছবানরের দল। ভাবনায় ছেদ পড়ে যায়। ইন্দিয় সক্রিয় হয় আমার। সামনেই ভাঙ্গা ইট-সুরকির উপর শুয়ে আছে বিশাল লম্বা কালো একটা সাপ !

দুই.
আমার শুরু চমক দিয়েই। অন্য সবার কাছে স্বাভাবিক হলেও আমার কাছে সবকিছুই রোমঞ্চকর। অতি নগন্য, তুচ্ছ ঘটনায়ও আমার জন্য অপেক্ষা করে অজানা চমক। ব্যক্তিগত পরিচিতির একটু ভূমিকা নিতে হচ্ছে একারণেই। রহস্য-রোমাঞ্চ, বিপদ-আপদ, ঘাত-প্রতিঘাত আর শিহরন-আতঙ্ক আগাগোড়াই পছন্দের আমার। বলতে গেলে ছোটকাল থেকে এনিয়ে নিজের আগ্রহ বুঝতে পারি নিজেই। স্কুলে পড়ার সময় শতবর্ষ পুরাতন বিদ্যালয়ের পরিত্যক্ত ভবনের একাংশ বিস্মিত করেছে বারবার। পাশেই আরও আগের শাখা-শিকড়ওয়ালা বিশাল বটগাছও টেনেছে আমাকে। পাতা ভর্তি মিশকালো বাদুড়ের দল মনে ছড়িয়ে দিয়েছে রক্তচোষা দেখার ভিন্ন অনুভূতি। জরাজীর্ণ বাতিল ভবন, তার উপরে শতবর্ষী বটবৃক্ষের ভ্যাম্পায়ার বাদুড় দেখে এমন ইচ্ছেও জেগেছে যে, কোনো এক পূর্ণিমা রাতে সেই ভবনে থেকে যাব একাই। সত্যিই রক্তচোষা বাদুড় কি-না সেই রহস্যের কিনারা করতে। এমন অন্যান্য আরও কিছু পরা-বাস্তব অসঙ্গতি চোখে পড়েছে আমার প্রতিদিনই । যেমন, শ্বশ্মান ঘাটের সাগরদীঘি। আকারে সাগরের মতো সুবিশাল প্রাচীন সেই দিঘীর ইতিহাস নিয়ে রটনা রয়েছে আজগুবি যত কাহিনীর। রোমাঞ্চের হাতছানি টেনে নিয়ে গেছে সেখানেও আমাকে। একটা তিমি আকৃতির ছায়া সেই দিঘীর জলে এক সন্ধ্যায় ভেসে বেড়াতে দেখেছি। যতদূর মনে পড়ে, মোটেও অবাক করেনি আমাকে ঘটনাটা। এছাড়াও দাদা বাড়ির উঁচুটিলায় দানব আকারের প্রাণী ঘুরে বেড়াবার দৃশ্য তো দিব্যচোখেই দেখতে পেয়েছিলাম। হতে পারে রহস্যবিভ্রম। অতি-কল্প ইন্দ্রিয়ের কাজ। আর পাহাড়ি সমতলে আমার পৌ-দাদাদের বংশানুক্রমিক নির্জন ভূমিতে রাতের জোনাকির আলোয় অশরীরীদের আনাগোনার দৃশ্য ভুলতে পারিনি অনেক বছর। এসবের ব্যাখ্যা কি ? ফোক-ফ্যান্টাসি মনে হতে পারে কারো কাছে। চালানো যেতে পারে আধিভৌতিক ব্যাপার-স্যাপার বলে। দোষ দেয়া যেতে পারে হেলুসিনেশন, দিবাস্বপ্ন, ভ্রমদৃষ্টি ইত্যাদির অভিযোগে অবচেতন মন এবং চোখের। আমি কিন্তু সবসময় জেনে এসেছি আমি পুরোপুরি সচেতন আর স্বজ্ঞান।
দৃষ্টি কিংবা রহস্য বিভ্রম আমার রোমাঞ্চ প্রবনতাকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। কেননা রহস্য-রোমাঞ্চ, থ্রিল-সাসপেন্সের খোঁজে অনেক ছোট বয়স থেকেই চারপাশ ঘিরে চালিয়ে আসছি পর্যবেক্ষন। সন্ধান করছি অদেখা এক জগতের।( চলবে)

ছবি: গুগল