সীমাহীন স্বপ্নের সায়েন্স ফিকশন

বিজ্ঞানী জোহান্স কেপলারের মাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিলো ছেলের কল্পবিজ্ঞানের গল্প লেখার জন্য।অভিযোগ উঠেছিলো মহিলা ডাইনি। ছেলে নিজের লেখা বইতে এমনই এক ডাইনি মায়ের বিবরণ দিয়েছে।দাবি উঠেছিলো কেপলারের মাকে পুড়িয়ে মারার। শেষে অবশ্য কেপলারের মা মুক্তি পেয়েছিলেন আজগুবি অভিযোগ থেকে। একটা সময়ে কিন্তু সায়েন্স ফিকশন বা কল্পবিজ্ঞান কাহিনীকে লোকে আজগুবি গল্প বলেই অভিহিত করতো। কিন্তু বিষয়টা মোটেই সেরকম নয়। বিজ্ঞানের ভাবনারও আগে, মানুষের কল্পনারও আগে সায়েন্স ফিকশন পৌঁছে গেছে অন্য মাত্রায়, মনের মধ্যে ছবি ফুটিয়ে তুলেছে দেখার বাইরে, চেনার বাইরে অন্য এক জগতের।
জুলভার্ণ সাবমেরিন আবিষ্কারের আগেই লিখেছিলেন তাঁর টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ উপন্যাস। সেখানে বিশদ বিবরণ দিয়েছিলেন সাবমেরিনের। এইচ জি ওয়েলস লিখে ফেলেছিলেন মানুষের চাঁদে যাওয়ার কল্পকাহিনী। ‘স্টার ট্র্যাক’ সিনেমা বাস্তবে পরিণত করতে চেয়েছে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বের ফিল্ড ইকুয়েশন অনুসারে আলোর চেয়ে বেশি গতিতে ভ্রমণ করা অসম্ভব নয় এই ভাবনাকে। সায়েন্স ফিকশন আসলে মানুষকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে। ভাবনার সীমানাকে তছনছ করে দিয়ে কলমের টানে লেখকরা বিস্তৃত করে দিয়েছেন বহু যুগ ধরে।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সায়েন্স ফিকশনের নানা কথা।
কবে লেখা হয়েছিলো সায়েন্স ফিকশন? ইতিহাসেরও আগে? ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় ইতালীতে নবজাগরণেরও আগে কল্পবিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে গল্প লেখা হয়েছিলো। প্রাচীন জাপানী গল্প ‘দ্য টেল অফ দি ব্যাম্বু কাটার’। সেখানে চাঁদ থেকে এক রাজকুমারীর এই মর্ত্যে নেমে আসার কাহিনী বয়ান করা হয়েছে। প্রাচীন গ্রীসের লেখক লুসিয়ানের গ্রন্থ ‘দ্য ট্রু স্টোরি’ তে চাঁদ আর সূর্যের মানুষদের মধ্যে যুদ্ধের কল্পকথা বয়ান করা হয়েছে। পিছিয়ে নেই পারস্য দেশের বিখ্যাত এক হাজার এক আরব্য রজনীর গল্পও। সেখানে উড়ন্ত কার্পেট ছাড়াও পাওয়া যায় মানুষের তৈরী এমন এক ঘোড়ার কথা যে ঘোড়া গাড়ি টেনে নিয়ে যেতে পারে আমাদের এই ভূমন্ডলের বাইরেও। আসলে আমাদের প্রতি দিনের জীবনে যা সম্ভব তার সীমানায় আবদ্ধ থাকতে মানুষ নারাজ। মানুষের আকাঙ্ক্ষা বিচিত্র, অদ্ভুত অজানা ও অশ্রুতের অভিজ্ঞতা লাভের ইচ্ছাও তীব্র। আর তাই কল্পনা আর বিজ্ঞান চেতনার রঙ লাগিয়ে লেখকরা সৃষ্টি করেছেন কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমাদের পৌরাণিক কাহিনী, ধর্মীয় উপাখ্যান আর রূপকথায়ও এ ধরণের কাহিনীর উপাদান পাওয়া যায় প্রচুর। আকাশ চিরে উড়ে যাওয়া ঘোড়া তো আসলে স্পেসশিপেরই অন্য রূপ। রাক্ষসদের ধারণা তো আসলে এক ধরণের এলিয়ন অস্বিত্বের কল্পকথা।সদ্য প্রয়াত প্রখ্যাত বিজ্ঞানী স্টিফের হকিংও সুদূর মহাকাশের অচিন গ্রহে অজানা প্রাণের উপস্থিতির ব্যাপারে কথা বলেছেন। স্থলচারী মানুষের শুধু একটি আকাঙ্ক্ষার কথাও যদি বিবেচনা করা হয় – গগন বিহারের স্বপ্ন – তা হলেই বক্তব্য স্পষ্ট হবে।
১৮৮২ সালে বাংলা সাহিত্যে সায়েন্স ফিকশন লিখেন হেমল দত্ত যেটি বিজ্ঞান দর্পণ নামে একটা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সায়েন্স ফিকশনের জনক বলা হয় স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুকে। তিনি ১৮৯৬ সালে প্রথম সায়েন্স ফিকশন লিখেছিলেন।
তবে হেমল দত্তের আগে বাংলা সাহিত্যে কল্পবিজ্ঞানের কাহিনী লেখেন জগদানন্দ রায় ১৮৭৯ সালে। বইটির নাম ছিল ‘শুক্রভ্রমণ’। জগদীশ চন্দ্র বসু বহিঃর্জাগতিক প্রাণের দেখা পাওয়ার বিশ্বাস থেকে ‘সাইন্স ফিকশন’ নির্ভর সাহিত্য রচনা লিখতে শুরু করেন। ১৮৯৬ সালে লেখা ‘নিরুদ্দেশের কাহিনী’ বাংলা সাইন্স ফিকশনের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।হেমল দত্ত অথবা জগানন্দ রায়ের লেখা পাঠক সমাজের কাছে পৌঁছানোর প্রায় দুশো বছর আগে বিজ্ঞানী জোহান্স কেপলার ১৬৩৪ সালে ‘সোমনিয়াম’ নামে সায়েন্স ফিকশন কাহিনী নির্ভর বই লিখে ফেলেন। তার পাশাপাশি ১৬৩৮ সালে ফ্রান্সিস গডউইন লেখেন ‘ দ্য ম্যান ইন দ্য মুন’। দুটি কাহিনী ছিলো মানুষের চাঁদে অভিযান চালানো বিষয়ে।কেপলার তো তার গল্পে আকাশে ‘ডোমিয়ান’ নামে দ্বীপ আবিষ্কারের কথাও উল্লেখ করেছেন।
কল্পনা আর সায়েন্স ফিকশন নানা কাঠামোতে সুদীর্ঘকাল ধরেই জনপ্রিয় ছিল। নিঃসন্দেহে জুলভার্ন এ ক্ষেত্রে কিংবদন্তি। জুলস গ্যাব্রিয়েল ভার্ণ ১৮২৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। সায়েন্স ফিকশনের জগতে এই ফরাসী লেখককে পথিকৃত বলা হয়ে থাকে।সাবমেরিন তৈরী হওয়ার বহু বছর আগেই তিনি সাবমেরিন তৈরীর পদ্ধতি লিখে ফেলেছিলেন। সমুদ্রের অতলান্তে ঘুরে বেড়ানো ক্যাপ্টেন নিমোর অসাধারণ এক চরিত্র তৈরী করেছিলেন তাঁর ‘টুয়েন্টি থাউজেন্ড লিগস আন্ডার দ্য সি’ উপন্যাসে। ‘জার্নি টু দ্য সেন্টার অফ দ্য আর্থ’ উপন্যাসে শুনিয়েছেন পৃথিবীর কেন্দ্রে অভিযানের গল্প। বোতে পছন্দ করতেন জুল ভার্ণ। সমুদ্রচারী জাহাজ তাকে টানতো। আর সেই আকর্ষণই হয়তো তার লেখা সায়েন্স ফিকশনকে বিশিষ্ট করেছে দুনিয়াজুড়ে। এরপর ইংল্যান্ডের আরেক লেখক এইচজি ওয়েলস এবং আরও অনেকেই প্রচুর পরিমাণে সায়েন্স ফিকশন লিখেছেন। তবে ওয়েলসের লেখাগুলো ছাড়া, ঊনবিংশ শতকের বেশিরভাগ সায়েন্স ফিকশনই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। শুরুতে ১৯৩০ দশকের দিকে, ‘ওয়ান্ডার স্টোরিজ’ ও ‘অ্যামেজিং স্টোরিজ’ বইগুলো সায়েন্স ফিকশনের পাঠকদের আবিষ্ট করে রেখেছিলো। তবে তাদের যাত্রাও থমকে যায় একটা পর্যায়ে এসে।
এইচ জি ওয়েলস শুধু সায়েন্স ফিকশনই লেখেননি। তিনি পৃথিবীর ইতিহাস, পাঠ্য বই, যুদ্ধের নিয়ম সংক্রান্ত বইও লিখেছেন। তাঁর প্রথম বেস্ট সেলার বই হলো, ‘অ্যান্টিসিপেশন অফ দি রি-অ্যাকশন অফ মেকানিকাল অ্যান্ড সাইন্টিফিক প্রগ্রেস আপন হিউম্যান লাইফ অ্যান্ড থট’। ১৯০১ সালে বই প্রকাশের আগে একটি ম্যাগাজিনে ‘অ্যান এক্সপেরিমেন্ট ইন প্রফেনি’ শিরোণামে লেখাগুলো প্রকাশিত হয়। ওয়েলস ‘ইনভিজেবল ম্যান’ উপন্যাস লিখে গোটা দুনিয়ায় হৈচৈ ফেলে দিয়েছিলেন। মানব চরিত্রের চিরকালের যন্ত্রণার সঙ্গে বিজ্ঞানকে জড়িয়ে এক আশ্চর্য উপন্যাস রচনা করেছিলেন
তিনি।
জুলভার্ণ আর এইচ জি ওয়েলসের পাশাপাশি আইজ্যাক আজিমভের নাম চলে আসে। রুশ দেশে জন্ম নেয়া এই লেখক বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করেছেন আমেরিকায়। তাকে বলা হয়ে থাকে আধুনিক সায়েন্স ফিকশনের প্রধান পুরুষদের অন্যতম। বলা হয় তার সময়েই কল্পবিজ্ঞান নতুন পথে বাঁক বদল করে। তবে কবি পার্সি শেলীর স্ত্রী মেরী শেলী কিন্তু ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাস লিখে এক মারাত্নক প্রশ্নের মুখোমুখি করেন পাঠকদের।সায়েন্স ফিকশন কাহিনীর পাঠকরা ভাবতে শুরু করেন, বিজ্ঞানের জয়যাত্রা মানুষকে কোন স্তরে উপনীত করতে যাচ্ছে। মানুষ কি এক সময় ঈশ্বরের মতো প্রাণ সৃষ্টি করবে? যদি সফল হয় তাতে তখনকার পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে? মেরী শেল যখন এই বই প্রকাশ করেন ১৮১৮ সালে তখন সায়েন্স ফিকশন ঘরানার প্রচলন ঘটেনি। ১৯২৯ সালে হিউগো গার্নসব্যাক নামে এক ভদ্রলোক একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন ‘সায়েন্স ওয়ান্ডার স্টোরিজ’ নামে। তার পত্রিকা দ্রুত পাঠকপ্রিয়তা লাভ করে। সেখানে প্রকাশিত গল্পগুলোকেই তখন সায়েন্স ফিকশন গল্প নামে পরিচিতি দেয়া হয়েছিলো। আর সেইসঙ্গে পাশ্চাত্যে সায়েন্স ফিকশন কথাটির ব্যাপক প্রচলন ঘটে।
বাংলা ভাষায় শিশু ও কিশোরদের জন্য প্রথম বিজ্ঞান ভিত্তিক গল্প লিখতে শুরু করেন সত্যজিৎ রায়। তৈরী হয় প্রফেসর শঙ্কুর চরিত্র।তবে এখন অনেকেই বলেন, প্রফেসর শঙ্কুর গল্পে পুরোপুরি বিজ্ঞানের আশ্রয় নেয়া হয়নি। অথবা নিতেও চান নি হয়তো সত্যজিৎ রায়। শঙ্কুর গল্পগুলো বেশ অনেকটাই ইচ্ছাপূরণের কাহিনী। বেশ সুখপাঠ্যও। সত্যজিৎ রায় এর সঙ্গে মিশিয়ে নিয়েছেন কিঞ্চিৎ গোয়েন্দা ফ্লেভারও। বাংলা ভাষায় সায়েন্স ফিকশন গল্পকে শিশু কিশোরদের মাঝে ভীষণভাবে জনপ্রিয় করে তুলেছেন বাংলাদেশের প্রয়াত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ ও তাঁরই সহদোর জাফর ইকবাল। পশ্চিম বাংলায় সত্তর এবং আশির দশকে আরেকজন লেখক সায়েন্স ফিকশন কাহিনী লেখার ধারাকে ধরে রাখেন অদ্রীশ বর্ধন। তিনি একদা ‘ফ্যান্টাস্টিক’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করতেন।
ওই যে বলছিলাম, মানুষ এক সময় নিজের স্বপ্নের সীমানাও টপকাতে চায়। টিভি অথবা সিনেমার পর্দায় যখন স্টার ট্রেক সিনেমার সেই স্পেসশিপের ছবিটা দেখা যায় মানুষ হয়তো সেই নভোযানে চড়ে জয় করে ফেলতে চায় অচেনা মহাকাশ। মুখোমুখি দাঁড়াতে চায় একবিংশ শতাব্দীর নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আর তাই সায়েন্স ফিকশন লেখকরা লিখে চলেন সেই স্বপ্নের গল্প। লেখেন আগামী পৃথিবীর কাহিনী।

সাইফুল আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল