বসন্ত-পুরাণ

স্মৃতি সাহা

আমি একটি কৃষ্ণচূড়ার সকাল, জারুলময় দুপুর আর গন্ধরাজের সন্ধ্যে চাই। দিনের প্রথম আলোয় নাইতে দেখেছো কৃষ্ণচূড়াকে, কি নম্রতা জড়ানো রঙে হেসে উঠে আলোকিত করে চারদিক ! বা বৃষ্টিজলের গহনায় সাজানো জারুলকে!? বিন্দু বিন্দু জলে যেন অপরূপ নিসর্গের সাতকাহন! আর শেষ আলো যখন দিনের সব হিসেব মিটিয়ে বিদায় নেয় ঠিক তখন গন্ধরাজকে দেখেছো কখনো!? আবছা আলোয় তার শুভ্রতা দেখেছো!? যেন পৃথিবীর সকল শুভ্রতায় নিজেকে সাজিয়ে হারিয়ে দিবে রাতের কালোকে! মাঝেমাঝে কিছু অদ্ভুত চাওয়া এসে ভিড় করে মনের মধ্যে। এক একটি সময় অপরিবর্তনীয় ছবি হয়ে মনের দেয়ালে ফ্রেম হয়ে বাঁধা পড়ে। ঠিক যেভাবে কোনো সকালে চোখ পড়েছিলো কৃষ্ণচূড়ায় বা বৃষ্টিজলে জারুলে তা কি আবার একইভাবে ধরা দেয় বা দিবে কখনো? বা এমন হতে পারে প্রথম সকালে সেই আলো, কৃষ্ণচূড়া, জারুল, গন্ধরাজ, বৃষ্টিজল সব একই আছে কিন্তু হারিয়ে ফেলেছি দেখার সে চোখ! যাহোক, মনের দেয়ালে এই ছবিগুলো এমনই রেখে দিই বরং, মন খারাপের প্রস্থবেধহীন দিনগুলোতে না হয় ঝাঁপি খুলে করতলে নিয়ে সঞ্জীবিত হবো নতুন করে সেই সঞ্জীবনীর পরশে! এখন বরং বর্তমানে ফিরি।

দিনপঞ্জিকার হিসেব মতে বসন্ত তার স্বর্ণরথ নিয়ে হাজির হয়েছে আমার দূয়ারে। “বসন্ত” শব্দটিতেই যেন জড়িয়ে আছে কনকচূড়ার আলো, বাতাসে আমের বোলের গন্ধ, কিংশুকের কলরব, গেরুয়া পলাশের ফিসফিসানি আর নব প্রাণের নিনাদ। তবে আমার এখানে বসন্তের আবার রকমফের আছে। আর্লি বা শুরুর বসন্ত; যা কে রূক্ষ্ম শীত থেকে তফাৎ করা যায় শুধুই ক্যালেন্ডারে! এরপর মধ্য বসন্ত; এ সময় প্রকৃতি শীতঘুম থেকে জেগে উঠতে শুরু করে, চেরি, ম্যাগ্নোলিয়াদের হৈ হৈ রৈ রৈ। এরপর শেষ বসন্ত; তখন প্রকৃতি নিজেকে সাজিয়ে তোলে সব আভরণে, এই সময়ের প্রকৃতির লাস্যতা দেবী আফ্রোদিতিকেও লজ্জায় ফেলে দেয়। শীতঘুমে থাকা প্রকৃতিতে প্রথম চোখ মেলেছে ড্যাফোডিল। সবুজ পাতায় হলুদ এই ফুলের কলকলানি কেবলই পদ্য হতে যাবে ঠিক তখন বেরসিক তুষারঝড়ের সদর্প আগমন। সারাদিন ধরে হয়ে চলেছে তুষারকাব্য। কখনো ঝিরিঝিরি আবার কখনো পেঁজা তুলোর মতো হাওয়ায় উড়ছে অদ্ভুতভাবে দিকভ্রান্ত না হয়ে! একটু একটু করে জড়িয়ে যাচ্ছে আভরণহীন গাছগুলোতে। আর সেই শুভ্রতার মণিমাণিক্যে কি যে দ্যুতিময় হয়ে উঠেছে চারপাশ, প্রকৃতি! তুষারপাতের সময় প্রকৃতি এক স্নিগ্ধ আলোয় ভরে যায়। আর তার সঙ্গে শুভ্রতার সন্ধি যেন রাতের কালোকেও পরাভূত করে ফেলে! আমি দেখি, মুগ্ধ হয়ে দেখি আমার জানালা ঘেঁষা ম্যাপল গাছের শুভ্রবসনে মোহিনীরূপ! পথের বাতির আলোয় যেন আরোও ঠিকরে ওঠে সে রূপ! আমি দেখি,অপলক দেখি। আমার বসন্তপুরাণ নিংড়ে নিতে থাকে প্রকৃতি থেকে গল্প!!