শুভ জন্মদিন ম্যাক্সিম গোর্কি

অল্প বয়সে তাঁকে রেখে তাঁর বাবা মারা যান। বাবা মৃত্যুর পর মায়ের সঙ্গে তিনি আশ্রয় আশ্রয় নিলেন মামার বাড়ি নিজনি নভোগরোদ শহরে। কিছুদিন পর স্থানীয় স্কুলে ভর্তি। ইতিমধ্যে মা ভার্ভারা তার চেয়ে দশ বছরের ছোট এক অপদার্থকে বিয়ে করে বসেন। তবে সেই বিাহিত জীবন তাঁর মায়ের জন্য সুখের হয়নি। কিছুদনি পরেই তিনি যক্ষা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হঠাৎ করে মায়ের প্রস্থানে তাঁর দেখাশোনার ভার এসে পড়ে দাদামশাইয়ের ওপর। দাদামশাই আর দায়িত্বভার নিতে চাইলেন না। মায়ের শেষকৃত্যের কয়েকদিন পরেই তাঁকে ডেকে বললেন, ‘‘তোমাকে এভাবে গলায় মেডেলের মতো ঝুলিয়ে রাখব তা তো চলতে পারে না। এখানে আর তোমার জায়গা হবে না। এবার তোমার দুনিয়ার পথে বেরুনোর সময় হয়েছে।’’

সেই থেকে শুরু হলো তাঁর সংগ্রামমুখর এক জীবন। আর এই মানুষটির নাম ম্যাক্সিম গোর্কি, বিশ্ব সাহিত্যের এক অসাধারণ কলমপেষা মজুর। যার পুরো নাম ছিলো অ্যালেক্সেই ম্যাক্সিমোভিচ পেশকভ। তিনি নিজেই তাঁর সাহিত্যিক নাম ‘গোর্কি’ বেছে নেন, যার অর্থ ‘তেতো’। আজ তার একশ পঞ্চাশতম জন্মদিনে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে এই মহান সাহিত্যিকের স্মৃতির উদ্দেশ্যে রইলো শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তিনি ১৮৬৮ সালের ২৮ মার্চ রাশিয়ার নিঝি নভোগোরোদে জন্ম গ্রহণ করেন।

শোনা যায় ম্যাক্সিম গোর্কিকে একবার এক পত্রিকা সম্পাদক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন আত্নজীবনী লেখার জন্য। গোর্কি সম্পাদকের অনুরোধ রক্ষা করে কয়েকটি লাইন লিখে পাঠিয়েছিলেন:‘১৮৬৮ – জন্ম, নিঝনি নোভোগোরোদ-এ। ১৮৭৮ – জনৈক মুচির সহকারী। ১৮৭৯ – এক শিল্পীর কাছে অ্যাপ্রেন্টিস। সেখানে দেবদেবীর ছবি আঁকত। ১৮৮০ – ভোলগা নদীর স্টিমারের কেবিন-বয় (স্টিমারের রাঁধুনির কাছে পড়তে শেখে)। ১৮৮৩ – একটা বিস্কুট ফ্যাক্টরির কর্মী। ১৮৮৪ – মুটের কাজ। ১৮৮৫ – আত্মহত্যার চেষ্টা। ১৮৮৯ – রেলকর্মী। ১৮৯০ – অ্যাডভোকেটের ক্লার্ক (এখানে লিখতে শিখেছে)। ১৮৯১ – লবণ-কলের মেশিন-চালক; শেষের দিকে ভ্যাগাবন্ড। ১৮৯২ – প্রথম গল্প রচনা: মকর চুদ্রা (Makar Chudra) এবং খ্যাতি ও বিত্ত।’ সেই সম্পাদক কবে কখন তাঁকে আত্মজীবনী লিখতে অনুরোধ করেছিলেন, সে সম্পর্কে তেমন কোনো বিশদ তথ্য না পাওয়া গেলেও ১৯১৩ সালে শুরু করে পরের দশ বছরে গোর্কি তাঁর তিন খণ্ডের আত্মজীবনী রচনা সম্পূর্ণ করেন সে তথ্য সবারই জানা। আর তাই নিয়ে তিন পর্বের একটি অসামান্য ছবি নির্মাণ করেছিলেন বিখ্যাত রুশ চলচ্চিত্রকার মার্ক দনস্কয়— ‘চাইল্ডহুড অব গোর্কি’ (১৯৩৮), ‘মাই অ্যাপ্রেন্টিসশিপ’ (১৯৩৯) এবং ‘মাই ইউনিভার্সিটিজ’ (১৯৪০)।

বৈচিত্রে ভরপুর তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্ম। জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে এক পেশা থেকে আরেক পেশায় ঘুরতে ঘুরতে বড় হয়ে উঠতে থাকেন গোর্কি। তবে এতো ঝড়ের মধ্যে দিয়ে পথ চলার মাঝে বই পড়ার নেশা কিন্তু তার পিছু ছাড়েনি। সব ধরণের বই পড়তেন তিনি। একদিন হাতে এল মহান রুশ কবি পুশকিনের একটি কবিতার বই। একনষ্ঠিভাবে পড়লেন। পড়তে পড়তে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে গেলেন।

জীবনে বেঁচে থাকার লড়াইকে বন্ধুর মতো নিত্যসঙ্গী হিসেবে ভাবতেন গোর্কি। তাঁর এই সময়কার জীবনে অভিজ্ঞতার কাহিনী অবলম্বনে পরবর্তীকালে লিখেছিলেন বিখ্যাত গল্প ‘ ছাবিবশজন লোক আর একটি রুটি’।হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে করতে মনের সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। হতাশা থেকেই ১৮৮৭ সালে নিজে একটি পিস্তল ১৪ ডিসেম্বর নদীর তীরে গিয়ে নিজের বুকে গুলি করলেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তাররা জীবনের আশা ত্যাগ করলেও অদম্য প্রাণশক্তির জোরে বেঁচে যান তিনি।

তিফলিস শহর থেকে প্রকাশিত ‘কাফকাজ’ (অর্থাৎ ককেশাস) দৈনিক সংবাদপত্রে ১৮৯২-এর ১২ই সেপ্টেম্বর একটি গল্প ছাপা হয়, মাকার্ চুদ্রা। লেখকের নাম ম. গোর্কি। এরপর অনেক পত্রিকায় ক্রমে ক্রমে লেখা ছাপা হতে থাকে – যেমন ভোলগা সংবাদপত্র, দৈনিক সামারা, ওদেসা সংবাদ, নিঝেগরোদ পত্র ইত্যাদি। ১৯১৫ সালে তিনি নিজেই লিয়েতপিস (কড়চা) পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ১৯২১ থেকে তাঁর সম্পাদনায় বেরুনো শুরু হয়।মা উপন্যাস লিখে গোর্কি বিশ্ব সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন।

ব্যক্তি মানুষ হিসেবেও চমকপ্রদ ছিলেন তিনি। জারের শাসনকালে অভিনেত্রী-বান্ধবীকে নিয়ে বিদেশে আশ্রয় নেন। ১৯১৭ সালে হিংসার মাধ্যমে ক্ষমতা দখল পছন্দ করেননি, পরে মানিয়ে নিয়েছিলেন। পার্টি-সদস্য না হয়েও আজীবন বলশেভিকদের সমর্থন এবং অর্থসাহায্য করে গিয়েছেন। সোভিয়েট কর্মকর্তাদের খবরদারি এড়াতে আবারও স্বেচ্ছা-নির্বাসনে ইতালি চলে যাওয়া। লেনিনের সঙ্গে প্রচণ্ড মতানৈক্য, লেনিনের সম্পর্কে যা-নয়-তাই সমালোচনা। কয়েক বার নাম উঠলেও নোবেল পুরস্কার পান নি। সাহিত্যস্রষ্টা হিসেবে প্রশংসিত এবং সমালোচিতও। সোভিয়েট রাজত্বে একের পর এক শ্রেষ্ঠ সম্মানে সম্মানিত। স্তালিনের ডাকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তার বছর কয়েক পরেই মৃত্যু — কারণ এখনও রহস্যাবৃত। কিন্তু ‘ঝড়ের পাখি’ হিসেবে স্বদেশে-বিদেশে আজও সমাদৃত, আজও প্রাসঙ্গিক তিনি।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট

ছবিঃ গুগল