হেথা নয় অন্য কোথা অন্য কোন খানে

নীনা হাসেল

ফল গাছ থেকে বেশী দূরে গিয়ে পড়েনা। ছাব্বিশ বছর আগে যখন কম্পিত বক্ষে আমার ছোট ছেলে আর কিশোরী কন্যাকে নিয়ে প্লেনে উঠেছিলাম তখন ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি যে আমি দীর্ঘ কালের জন্য দেশান্তরে পারি দিচ্ছি। ভ্যাঙ্কুভার এয়ারপোর্টে নামলাম এক অদ্যোপান্ত বাঙালী মেয়ে। তখনো আমি শাড়ি পরেছিলাম। বাচ্চারা ক্লান্ত উৎফুল্ল নতুনের আশায় উল্লসিত, খানিকটা উৎকণ্ঠিতও। আমার মনের ভিতরে শঙ্কা, ভয় উত্তেজনা। হঠাৎ করে মনে হল এ আমি কোথায় এলাম এত অন্যরকম।যেন একটা হিম শীতলতা নেমে এলো চেতনায়। মুখে হাসি আর স্ফূর্ত ভাব নিয়ে যথারীতি সবকিছু যন্ত্রচালিতের মতো করে গেলাম।যেখান থেকে এসেছি তার সঙ্গে কোন মিলই নেই। অজানাকে যে এত ভয় লাগে তা আগে বুঝিনি। অজানা নতুন পরিস্থিতিতে মানবের চিরন্তন আদিম ভীতি। বাংলা শুনতে অভ্যস্ত কানে মাইক্রোফোনের ইংরাজি ঘোষণা বুঝতেই পারলাম না যেন জীবনে ইংরাজি এই প্রথম শুনছি। আমিতো বাঙালী ইংরাজিতে অভ্যস্ত। যাই হোক আমাদের লাগেজ ক্যারাউসেল খুঁজে পেলাম। বিদেশের অভিজ্ঞতা আমার আগেও ছিল। তবু সেই মুহূর্তে নিজেকে একটা নিরেট বোকা অশিক্ষিত গবেট মনে হলো। ইমিগ্রেশন পেরিয়ে এয়ার পোর্টের বাইরে এসে চোখ দুটো অবাক বিস্ময়ে দেখে গেল জীবনের চলমানতা। মানুষ, পরিপাটী ঘাস, বাড়িঘর যানবাহন সব যেন পটে আঁকা ছবি। হঠাৎ করে মনে হল এ আমি কোথায় এলাম এত অন্যরকম। একটা অস্বস্তি, কল্পনায় বা ছবিতে দেখা একটি চিত্র আর এখন আমি বাস্তবে এই চিত্রেরই অংশ যেন ফ্রয়েডিয়ান স্বপ্নের মধ্যে ডুব সাঁতার কাটছি। জলের উপরে ভেসে উঠব কতক্ষণে। ওই মুহূর্তে মনে হল কতদিনে ফিরবো।, যত তাড়াতাড়ি পারি ফিরে যাবো। যেখানে সবাই আমাকে জানে, আমি সবাইকে চিনি ও জানি। গাছ, ফুল, ফল, পাখী, গন্ধ, শব্দ সবই আমার পরিচিত যেখানে।
ফিরে যাওয়া হয় না। দিন মাস, বছর পেরুতে থাকে অপরিচত পরিচিত হয়। ক্রমশ অভ্যস্ত হই অথবা বলা যায় মেনে নেই প্রবাসী জীবন। পৃথিবী জাড্য নয়, জীবন ও নয়। আমরা এই পৃথিবীর অক্ষেই আবর্তিত হই। তার মধ্যাকর্ষণ ছিন্ন করে অন্য কোন নক্ষত্রে কিংবা অন্য কোন পৃথিবীতে যেতে পারিনা। এক অমোঘ শ্বাশত বন্ধনে আবদ্ধ। আমাদের অস্তিত্বকে সংহার করে নিরন্তর। টুকরো টুকরো করে ছেড়া হৃদয় থেকে রক্তক্ষরণ হয়। তাই যেখানেই থাকি যত দুরেই যাই আমার চোখে পাতায় লেগেই থাকে সেই ঢেউয়ের মালা গাঁথা অসংখ্য নদীর নাম।অস্ফুত কণ্ঠে উচ্চারন করি নিজের কাছেই শুধু।

ছবি: গুগল