বনবাসের বৃত্তান্ত

সাগর চৌধুরী, সাংবাদিক

( কলকাতা থেকে): স্কুল ফাইন্যাল পরীক্ষার ফল বেরোনোর পর কলেজে ভর্তি হওয়ার পালা। আমার নিজের ইচ্ছে আইএ, অর্থাৎ ইন্টারমিডিয়েট আর্টস্ পাঠ্যক্রমে যোগ দেওয়া। কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তির ফর্ম পূরণও করলাম, কিন্তু মা-বাবা, মামা-মাসীরা সবাই একই সুরে বলতে শুরু করলেন, ‘না না, আর্টস্ পড়া একটা কাজের কথা হলো! সায়েন্স নিয়েই পড়তে হবে।’ শেষ পর্যন্ত এক রকম বাধ্য হয়েই আইএস্সি-তে ভর্তি হলাম, কলকাতার কলেজের বদলে বোলপুর কলেজে। অবশ্য আমি স্কুল ফাইন্যাল পাশও করেছিলাম বোলপুর হাই স্কুল থেকেই। বোলপুর কলেজে ভর্তি হওয়ার আরেকটা কারণও ছিলো  পরীক্ষায় জেলা স্তরে ফল ভালো হওয়ার সুবাদে কলেজের টিউশন ফী মকুফ হয়ে গেলো, সেইসঙ্গে বিনা খরচে কলেজের ছাত্রাবাসে থাকার সুবিধাও পেয়ে গেলাম। এমনিতে অবশ্য আমার ছাত্রাবাসে থাকার দরকার হওয়ার কথা নয়, কারণ আমি থাকতাম মা আর ছোট ভাইবানের সঙ্গে মাইল দুয়েক দূরে শান্তিনিকেতনের প্রান্তে খোয়াইএ ঘেরা একটা বাড়িতে, স্কুলে যাতায়াত করতাম ছোটমামার কিনে দেওয়া সাইকেল চালিয়ে। তবে ছাত্রাবাস চালু হয়েছে খুব বেশি দিন আগে নয় এবং সেটাকে জনপ্রিয় বা ছাত্রপ্রিয় করে তোলার উদ্দেশ্যে আমার মতো দু-চারজনের জন্য এই বিশেষ ব্যবস্থা। সেখানে থাকা শুরু করার পর বাড়ি যেতে পারতাম কেবল শনি আর রবিবার, কারণ সোম থেকে শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত ছাত্রাবাসে থাকা বাধ্যতামূলক ছিলো, আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে যিনি ওয়ার্ডেনের দায়িত্ব পালন করতেন এই ব্যাপারে তাঁর কড়া নজর থাকতো। তাই শনি-রবিবারের দুই রাত মায়ের সঙ্গে কাটিয়ে সোমবার সকালে সাইকেল চালিয়ে কলেজে ফিরে আসতাম। তবে একটা রবিবারের রাত এই নিয়ম থেকে বাদ পড়তো কারণ প্রতি মাসের শেষ রবিবার রাতে ছাত্রাবাসের আবাসিকদের জন্য বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা হতো, যাকে আমরা বলতাম ‘গ্র্যান্ড ফীস্ট’। এই খাদ্যতালিকায় দৈনন্দিন ভাত-ডাল-তরকারি-মাছের সঙ্গে যুক্ত হতো মাংস এবং দৈ-মিষ্টি। আরো চমৎকার একটা ব্যবস্থা ছিলো, যেটার সদ্ব্যবহার করতে আমাদের কয়েকজন দল বেঁধে তৎপর থাকতাম। ছাত্রদের মধ্যে কেউ যদি মাংস খেতে না চাইতো তার জন্য বরাদ্দ হতো তিন-তিনটে হাঁসের ডিমের কালিয়া! ঐ রবিবার সকালবেলা রান্নাঘরের কর্মীদের বাজারে যাওয়ার সময় হলে আমাদের দলের দু-তিনজন গিয়ে বলতাম রাতে আমরা মাংসের বদলে ডিম খেতে চাই, তারপর খাওয়ার সময়ে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে মাংস আর ডিম দুটোই খেতাম। দারুণ মজার একটা ব্যাপার ছিলো সেটা।
যাই হোক, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা চালানো আমার ধাতে সইছিলো না চেষ্টা করা সত্ত্বেও, কাজেই ফাইন্যাল পরীক্ষার ফল যেমনটা হলে সত্যিই ভালো হতো তেমনটা হলো না। খুব যে খারাপ হলো তা অবশ্য নয়, আর সেটাই হলো সমস্যা। আমার আশা ছিলো এবার হয়তো নিজের পছন্দমতো আর্টস্ নিয়ে বিএ ক্লাসে ভর্তি হতে পারবো। কিন্তু ঐ যে, পরীক্ষার ফল তেমন ভালো না হলেও যথেষ্ট খারাপও হয়নি, তাই অভিভাবকরা বায়না (হ্যাঁ, বায়নাই বলবো) করতে লাগলেন যে এঞ্জিনীয়ারিং কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় বসতে হবে। আমাদের সময়ে আজকের মতো এঞ্জিনীয়ারিং বা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তির জন্য ‘জয়েন্ট এন্ট্র্যান্স’ পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিলো না, বিভিন্ন কলেজের নিজস্ব ভর্তি পরীক্ষা থাকতো। শেষ পর্যন্ত অভিভাবকদের নির্বন্ধাতিশয্যে ওই পরীক্ষায় বসলাম আর নিজেকে অত্যন্ত মর্মাহত করে উত্তীর্ণ হয়েও গেলাম। কিন্তু কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অচিরেই বুঝতে পারলাম যে আইএস্সি পড়ার অভিজ্ঞতারই পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। কয়েক মাসের মধ্যেই আমার মানসিক অবস্থা এতটাই বিপর্যস্ত হয়ে উঠলো যে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই দুম্ করে কলেজ ছেড়ে দিলাম, অভিভাবকদের অনুযোগ বা তিরষ্কার কিছুতেই কর্ণপাত করলাম না। তখন ওই শিক্ষাবর্ষের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হয়েছে মাত্র, কিন্তু অন্য কোথাও ভর্তি হওয়ার সময় আর নেই অথচ সামনের বছর কলেজে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হতে সাত-আট মাসেরও বেশি বাকি। এদিকে বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে বাক্যালাপ প্রায় বন্ধ, বন্ধুবান্ধবরা প্রত্যেকেই কোথাও না কোথাও পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত, একমাত্র আমিই নির্ভেজাল বেকার, সময় আর কাটতেই চায় না। এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেলো। আমার মামাবাড়ি ছিলো আসামে আর মামাদের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন কাঠের ব্যবসায়ী, আমিও তাঁকে মামা বলেই ডাকতাম, তিনিও আমাকে যথেষ্ট স্নেহ করতেন। আসামেরই কোন জঙ্গল ইজারা নেওয়া থাকতো তাঁর, যেখান থেকে গাছ কেটে করাতকলে নিয়ে গিয়ে চেরাই করা হতো। তাঁকেই গিয়ে ধরলাম আমি  ‘মামা, একটা কাজ দাও না, কিচ্ছু না করে কেবল বসে থেকে থেকে পাগল হয়ে যাচ্ছি!’ একটু অবাক স্বরে তিনি বললেন, ‘কাজ করবি! তোর পড়াশোনা?’ আমি বললাম, ‘আগামী বছরের আগে তো কিছুই হবে না, ততদিন কী করবো?’ মিনিট দুয়েক ভেবে তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘কাজ একটা দিতে পারি তোকে এখন থেকে শুরু করে সামনের বর্ষা পর্যন্ত কয়েক মাসের জন্য, যদি তুই করতে পারিস।’ আমি বললাম, ‘কেন পারবো না? তুমি দিয়েই দেখো না।’ মামা বললেন, ‘জঙ্গলের ভেতরে থাকতে হবে কিন্তু, দিনের পর দিন।’ আমি জোর গলায় বললাম, ‘ও আমি ঠিক পারবো, দেখে নিও তুমি।’ মামা বললেন, ‘দাঁড়া, ব্যবস্থা করছি।’
দিন চারেকের মধ্যে ব্যবস্থা হয়ে গেলো আর আমিও সামান্য তল্পিতল্পা বেঁধে কাজের জায়গায় রওনা হয়ে গেলাম। কাছাড় জেলায় খাসিয়া উপজাতি অধ্যুষিত একটা এলাকায় তখন মামার জঙ্গল ইজারা নেওয়া। যে অঞ্চলটা খাসিয়া ভাষায় ‘কা রি কি খাদর দোলই’ অর্থাৎ ‘বারো রাজার দেশ’ নামে পরিচিত, আজকের মেঘালয় রাজ্যের অংশ, তার পাশেই। সবচেয়ে কাছের নিতান্তই অকুলীন শহর থেকে প্রায় বাইশ-চব্বিশ মাইল দূরে জঙ্গলের ভেতর দিকে যেখানে তখন গাছ কাটা হচ্ছে তার আশেপাশে দু-চারটে খাসিয়া বসতি ছাড়া আর কোন লোকালয় নেই, গাছ কাটার কর্মীরা ঐ স্থানীয় খাসিয়ারাই। আমার সঙ্গে তারা কথা বলতো ভাঙা ভাঙা অসমীয়া ভাষা আর ‘নামতি (নিম্ন ) আসাম’ অঞ্চলের দু-একটা উপভাষার কিছু শব্দ নিয়ে তৈরী একটা মিশ্র ভাষায়। সেখানে থাকার জায়গা কাঠের মাচার ওপরে ছোট্ট দুটো ঘর, উঠতে হয় মইএর মতো একটা সিঁড়ি বেয়ে। এই বাসাকে ঘিরে শালগাছের গুঁড়ির বেশ উঁচু আর যথেষ্টই শক্তপোক্ত বেড়া। বেড়ার ভেতরে ঢোকার দরজা খুবই মজবুত, তার গায়ে গাঁথা অনেকগুলো বড় বড় লোহার গজাল যাদের ছুঁচলো ডগা বাইরের দিকে বেশ খানিকটা বার করা। বুনো হাতি এসে যদি মাথা দিয়ে ধাক্কা মেরে দরজা ভাঙার চেষ্টা করে তাদের আটকানোর জন্যই নাকি এই ব্যবস্থা। তেমনটা করতে আসা কোন হাতি অবশ্য আমি কখনো দেখতে পাইনি, যদিও জঙ্গলের অন্যত্র তাদের ঘোরাফেরা করতে দেখেছি খানিক দূর থেকে। তাছাড়া কাটা গাছের গুঁড়ি শুঁড় দিয়ে টেনে এখান-ওখান করার জন্য দু-তিনটে পোষা হাতি তো ছিলোই মাহুতদের তত্বাবধানে। প্রধানত চিতাবাঘের উপদ্রব রোখাই ছিল এই বেড়ার কাজ। জনাদশেক খাসিয়া কর্মীর আর হাতির মাহুতদের সকলেই থাকতো নিজেদের বসতিতে আর সেখান থেকেই রোজ কাজে আসতো। তবে প্রতি রাতেই পালা করে দুজন কর্মী আমার সঙ্গে থেকে যেতো, তাদের ঘুমানোর জায়গা ছিলো মাচার নিচে একটা কাঠের ঘরে।
আমার এই আস্তানার চারপাশে বড় বড় গাছ আর ঝোপঝাড়ে ভরা জঙ্গল ছাড়া আর কিছু নেই। স্থানীয় লোকদের বসতিগুলো একটু দূরে দূরে, চোখের আড়ালে। গাড়ি চলার উপযুক্ত একটা পাথরের নুড়ি বিছানো রাস্তা ধরে প্রতিদিনই একবার বা দুবার ঠিকাদারের লোকরা ট্রাকে চড়ে আসে গাছ কাটার ‘পারমিট্’ বা সরকারী অনুমতিপত্র নিয়ে, সেটা দেখিয়ে যার যেমন বরাদ্দ গাছ কেটে নিয়ে যায়। আমার কাজ ঐ অনুমতিপত্র পরীক্ষা করে কেউ যেন বরাদ্দের বেশি গাছ কেটে না নিয়ে যায় সেদিকে নজর রাখা আর খাতায় হিসাব রাখা। আরো কয়েকটা কাজও ছিলো, যেমন কর্মীদের দু-তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে জঙ্গলের নানা জায়গায় কাটার উপযুক্ত গাছে বনবিভাগের ‘স্ট্যাম্প’ দাগিয়ে দেওয়া, কেটে নিয়ে যাওয়া গাছের খালি জায়গায় নতুন চারা বসানো ইত্যাদি। এসব কাজ আমাকে নিজের হাতে করতে হতো না, খাসিয়া কর্মীরাই করতো, আমি কেবল তাদের সঙ্গে থাকতাম। এছাড়া তাদের সাপ্তাহিক মজুরি বন্টনের দায়িত্বও আমারই ছিলো, সপ্তাহে একবার শহর থেকে কেউ আসতো নগদ টাকা আর আমার জন্য কয়েক দিনের বাসি খবরের কাগজ নিয়ে জীপগাড়িতে চেপে, আর মাসে দু-বার আসতো চাল-ডাল-আলু-পেঁয়াজ-নুন-তেল-মশলা ইত্যাদির যোগান। নিজের রান্না নিজেই করে নিতাম আমি, খাসিয়া কর্মীরা মাঝে মধ্যেই বনমোরগের মাংস বা ডিম আমাকে উপহার দিতো। মাচার নিচে রান্নার জায়গায় রাখা একটা বড় মাটির জালায় ওরাই রোজ ঝরনা থেকে আনা টাটকা জল ভরে দিতো, বাসা থেকে সামান্য দূরের ঐ ঝরনাতেই স্নান করতাম আমি।
সকালবেলা কাজে বেরোনোর তেমন কোন তাড়াহুড়ো থাকতো না, কাজ যে খুব বেশী থাকতো তাও নয়, তিনচার ঘন্টার মধ্যেই সব কাজ শেষ হয়ে যেতো। তারপর প্রায় অফুরন্ত অবসর, বাসি খবরের কাগজের পাঁজা ঘাঁটা আর একাধিকবার পড়ে শেষ করা বই আবার পড়া ছাড়া সময় কাটানোর অন্য কোন উপায় ছিলো না। কাজের ফাঁকে খাওয়ার জন্য শ্রমিকরা সঙ্গে নিতো অদ্ভুত ধরনের খাবার। যেমন, লালচে রঙের গোল গোল মোটা ‘খো-সো’ চাল সারা রাত জলে ভিজিয়ে রাখা হতো। সকালবেলা ফুলে নরম হয়ে যাওয়া ঐ চাল বিশেষ এক জাতের পাতলা ছালের বাঁশের চোঙার মধ্যে ঠেসে ঠেসে ঢোকানো হতো। চোঙার মুখ বাঁশেরই গুঁজি দিয়ে বন্ধ করে সেগুলো সঙ্গে নিয়ে কাজে বেরোতো কর্মীরা। খাওয়ার সময় হলে জঙ্গলের এক জায়গায় কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বেলে চোঙাগুলো তার মধ্যে ফেলে দিতো। খানিক পরে সেগুলো পুড়ে কালচে হয়ে গেলে আগুন থেকে তুলে নিয়ে ছাল ছাড়িয়ে নেওয়ার পর পাওয়া যেতো সুসিদ্ধ লালচে রঙের ভাতের কয়েকটা মোটা কাঠির মতো জিনিষ। এই ভাতের কাঠি ভেঙে ভেঙে খাসিয়ারা খেতো একটা সাংঘাতিক ঝাল মরিচের আচার দিয়ে। এই মরিচটা আমি পরেও আসামে দেখেছি, নাম ‘ভূত জালোকাই’, এটা দিয়ে তৈরী আচার স্থানীয় লোকজনের অনেকেরই প্রিয়, ঝালের চোটে নাকের জল আর চোখের জল একাকার হওয়া সত্ত্বেও। এই মরিচের আচার আমাদের বাড়িতেও আছে, কলকাতা নিবাসী এক অসমীয়া বন্ধুর এনে দেওয়া, ভাত-তরকারির সঙ্গে টাকনা হিসাবে অল্প অল্প করে মাঝে মাঝে খাই আমরা। জঙ্গলের ঝোপঝাড়ের মধ্যে অনেক সময় তিতিরের বা ডাহুকের ডিম পাওয়া যেতো। কাদার লেচির মধ্যে এই ডিম জড়িয়ে খাসিয়ারা গোল গোল বলের মতো বানিয়ে আগুনে পুড়তে দিতো। কাদার বলগুলো পুড়ে ফেটে ফেটে যাওয়ার পর ভেতরের ডিমগুলো সুন্দর সিদ্ধ হয়ে যেতো, বেশ একটা সোঁদা সোঁদা গন্ধ, যাকে বলে ‘ফ্লেভার’, পাওয়া যেতো। জঙ্গলে থাকার সময়ে এই ধরনের খাবার খাওয়া আমারও বেশ অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলো।
তবে সবচেয়ে অদ্ভূত বা আশ্চর্য  একটা খাবার খাওয়া হতো বিশেষ বিশেষ পরব উপলক্ষে, বছরে তিন বা চারবার। এই খাবারের উপকরণ ছিলো পাখির মাংস, গোটা একটা ছাগল বা পাঁঠা আর কয়েক রকম বুনো লতাপাতা। আকারে খুবই ছোট্ট এক জাতের পাখি জঙ্গলে উড়ে বেড়াতো ঝাঁকে ঝাঁকে। হলদে রঙের পালক, লাল ঠোঁট, রঙিন তুলোর বলের মতো এই পাখিকে স্থানীয়রা ডাকতো ‘চিপ্চিপানি’ নামে, এটার আসল নাম জানি না, চিপ্-চিপ্ আওয়াজ করে ডাকতো বলেই সম্ভবত এই নাম। এক-একটা ঝাঁকে হয়তো দু-তিনশো পাখি মাটি থেকে মাত্র সাত-আট ফুট উপর দিয়ে উড়ে বেড়াতো, দেখে মনে হতো যেন রঙচঙে প্রজাপতির ঝাঁক। খাসিয়ারা এই পাখি ধরতো লম্বা লাঠির মাথায় বাঁধা গোল জাল দিয়ে। ধরা খুবই সহজ ছিলো, ঝাঁকের মাঝে জালটা একবার ঘুরিয়ে দিলেই এক সঙ্গে অনেকগুলো পাখি তার মধ্যে আটকে যেতো। এতোই কোমল ছিলো এই পাখির শরীর যে জালে আটকাবার সঙ্গে সঙ্গেই মরে যেতো। এইভাবে বস্তা ভর্তি করে পাখি সংগ্রহ করা হতো। তারপর একটা নধর ছাগল জবাই করে, তার পেটে চিরে নাড়িভূঁড়ি সব পরিষ্কার করে ফেলা হতো। এবারে মরা পাখিগুলো ছাগলের পেটে ঠেসে ঠেসে ভরা হতো, অনেকটা যেন ‘স্টাফিং’ বা পুর দেওয়া খাবার তৈরী করার মতো। সব শেষে ছাগলের পেটে ঢোকানো হতো কিছু লতাপাতা, মশলা হিসাবে। এগুলো কী ধরনের লতাপাতা ছিলো জানি না, একটাকে স্থানীয়রা বলতো ‘দইপাতা’ যেটার কয়েকটা হাতে কচলে জলে মিশিয়ে দিলে কয়েক মিনিটের মধ্যে জলটা জমে যেতো, ঠিক যেন সবুজ রঙের দইয়ের মতো। এসব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর ছাগলের কাটা পেট সেলাই করে আটকে দেওয়া হতো। তারপর সেটাকে নিয়ে যাওয়া হতো একটা উঁচু পাথুরে জায়গায় যেটা একেবারে খট্খটে শুকনো এবং যেখানে সারা দিন ধরে সরাসরি কড়া রোদ পড়ে। পাথর সরিয়ে একটা খোঁদলের মতো করে ছাগলটা তার মধ্যে রেখে পাথরের চাঁই দিয়ে এমনভাবে ঢেকে দেওয়া হতো যাতে কোন শেয়ালকুকুর তার নাগাল না পায়, আর বৃষ্টি হলেও গর্তে এক ফোঁটাও জল ঢুকতে না পারে। দুই-আড়াই মাস, কখনো বা আরো কিছুটা বেশি সময়, ঐভাবেই পাথরের খোঁদলে চাপা দেওয়া থাকতো সব কিছু, তারপর কোন পরব উপলক্ষে পাথরের ঢাকনি সরিয়ে ভেতরের জিনিষ বার করা হতো। স্থানীয়দের কাছে বিশেষভাবে লোভনীয় এই খাদ্যবস্তুটি এতদিনে ভক্ষণের জন্য প্রস্তুত, এটা হয়তো তৈরী করেছে খাসিয়াদের নির্দিষ্ট একটা বসতি গোড়া থেকে শেষ অবধি ধাপে ধাপে, কিন্তু এবার ভোজে আমন্ত্রিত আশপাশের সমস্ত বসতির লোকজন। ওই ভোজে আমিও দাওয়াত পেতাম, তবে স্থানীয় খাদ্যরসিকদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় এই পদ আমি চেষ্টা করেও একবার বা দুবারের বেশি মুখে তুলতে পারিনি।
বিশেষ এই পদটি কীভাবে খাওয়া হতো তা এবার বলছি। ভোজের ব্যবস্থা হতো সন্ধ্যার পর, বসতির মাঝখানের উঠোনে আগুনের কু- জ্বালিয়ে তার চারপাশে সবাই বসতো গোল হয়ে। কয়েকটা মাটির হাঁড়িতে রাখা থাকতো ঐ অঞ্চলের উপজাতিদের অতি প্রিয় পানীয় ‘কিয়াদ’ আর সেটা পান করার জন্য বেশ কয়েকটা মাটির ভাঁড়। সবাই কয়েক পাত্র করে পান করার পর আসল খাদ্য সামনে নিয়ে আসা হতো। মাটিতে বিছানো চাটাইয়ের উপর নামিয়ে রাখা হতো পাথরের গর্ত থেকে বার করে আনা ছাগলটা। বলা বাহুল্য, তার গন্ধে (সুগন্ধ নয় অবশ্যই!) চারদিক ম-ম করতে থাকতো। সমবেত সকলেই বেশ খুঁটিয়ে জিনিষটা যাকে বলে পর্যবেক্ষণ করতো আর নিজের নিজের মত দিতো। তারপর ঐ বসতির মোড়ল কিংবা অন্য কোন প্রবীণ এগিয়ে এসে ছাগলের পেটের সেলাই কাটতো ধারালো ছুরি দিয়ে, চারপাশের বাতাস আরো একটু ভারী হয়ে উঠতো গন্ধে। দু-তিন মাস ধরে শুকনো গর্তে চাপা পড়ে থেকে আর দিনের পর দিন কড়া রোদে গরম হওয়া পাথরের তাপে ঐ ছাগল আর তার পেটের ভেতরের সমস্ত জিনিষ বেশ পরিপক্ক হয়ে গেছে। এবার মোড়ল, কিংবা প্রবীণ ব্যক্তিটি, ছাগলের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা বা দুটো পাখি বার করে এনে সকলের চোখের সামনে তুলে ধরতো। এতদিনে ছাগলের চর্বি আর লতাপাতার রসের সঙ্গে মিশে পাখিগুলোর চেহারা হয়েছে ঠিক যেন আচারের তেলে জারানো টুস্টুসে লেবুর মতো। একটা পাখি মুখের কাছে তুলে হাঁ করে আঙুল দিয়ে সামান্য চাপ দিতেই তার পালকের ভেতরের মাংসের শাঁসটুকু সুড়–ৎ করে মুখের ভেতর চলে যেতো আর মুখের মালিকের অর্ধ-নিমিলীত চোখে ফুটে উঠতো সুখাদ্য ভক্ষণের তৃপ্তির ছাপ। ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত অনুসরণ করায় অন্যরাও আর কালক্ষেপ করতো না, অচিরেই ছাগলের পেটের সমস্ত পাখির স্থান হতো তাদের উদরে, সকলেরই ঠোঁট, চিবুক আর হাত তখন চর্বিতে মাখামাখি। ছাগলের দেহটাও ফেলা যেতো না মোটেই, সেটাকে তুলে এবার আগুনে ঝলসানো হতো বেশ করে, তারপর আরো কয়েক পাত্র কিয়াদ সহযোগে ঐ মাংসেরও সদ্ব্যবহার হতো। দু-তিন মাস বাদে আবার অন্য কোন বসতিতে আয়োজন হতো এই মহাভোজের।
বর্ষাকাল আসার আগের সাত-আট মাস ঐ জঙ্গলে কাটিয়েছিলাম আমি। ঐ অঞ্চলের অত্যন্ত ভারী বর্ষায় জঙ্গলে যাওয়া বা কাজ করা অসম্ভব, তাই ওই সময়ে গাছ কাটার পারমিট্ দেওয়াও বন্ধ থাকে। এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সাধারণ কর্মীরা তখন হয় বেকার কিংবা অন্য কোন কাজ খুঁজে নিতে বাধ্য হয়। ততদিনে অবশ্য আমারও আবার কলেজে ভর্তি হওয়ার সময় এগিয়ে এসেছে, তাই জঙ্গলকে বিদায় জানিয়ে ফিরে এলাম তার তোড়জোড় করার কাজ শুরু করতে। ওই জঙ্গলে আর কোন দিনই যাওয়া হয়নি, তবে ওই জঙ্গলকে ভুলিনি আজও।

ছবি: গুগল