অতিমাত্রিক

সাব্বিরুল হক

(প্রথম পর্বের পর)
রেষ্ট হাউসে থাকতে আসিনি আসলে। এসেছিলাম রাত কাটাবার প্রয়োজন দেখা দিতে পারে ভেবে। জনবসতিহীন এলাকার রাত কত ভয়াবহ আমার জানা আছে। ঢাকাদক্ষিণের প্রাচীন মন্দিরের পাহাড়ি টিলায় একবার বিপদে পড়েছিলাম। নামার পথ খুঁজতে গিয়ে হয়ে গিয়েছিল গভীর রাত। নিচে নামতে পেরেছিলাম অবশেষে, তবে আহত অবস্থায়। মনে হলে লোম খাড়া হয়ে যায়, কাঁটা দেয় শরীরে। সেসব পাহাড়ে রাতে ঘুরে বেড়ায় হিং¯্র জাতের শুয়োর আর অজগর সাপ। উপস্থিত বুদ্ধি আর সাহসের জোরে হয়ত বেঁচে এসেছিলাম সে যাত্রা। এবারকার বিলুপ্ত সা¤্রাজ্যে এসেই পড়েছি কিন্তু ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে। সমস্যা এখানে অনেকগুলো । বাসায় জানাইনি জৈন্তাপুর অভিযানের ব্যাপারে। আমার পরিবারের কেউই আমার মতো এ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় না। জাগতিক রহস্য-রোমাঞ্চ ভাবায় না, ভারাক্রান্ত করে না তাদেরকে । অতীতে এ ধরনের অভিযান হাসাহাসির পাত্রে পরিণত করেছে আমাকে । পারিবারিক অঙ্গনে আমার রোমাঞ্চপ্রবন মন তো আর কেউ বুঝতে চাইবেনা।

সাপটা লম্বায় ৪/৫ হাত কি তারও বেশি হতে পারে। শুয়ে আছে সটান হয়ে। আমার ইন্দ্রিয় সজাগ হয়ে গেল। আরেকটু হলেই পা দিয়ে মাড়িয়ে দিতাম সাপটাকে। পাহাড়ি সাপ সচরাচর বাইরে আসে কম। তবে জ্বালাতন সহ্য করতে পারেনা। সম্ভবত ভাল খাওয়া-দাওয়া করেছে দিনে। এখন ক্লান্ত হয়ে বিশ্রাম নিচ্ছে সাপটা। অভিজ্ঞতা থেকে জানি ওকে না ঘাঁটালে কিছুই করবে না। কারন সাপেরও রয়েছে জানের ভয়। একবার শনির হাওরে ভয়াল মেছো সাপ দেখে ভয়ে উল্টোদিকে দেঁৗঁড়–তে গিয়ে বুঝতে পেরেছিলাম সাপটাও আমাকে দেখে ভড়কে গিয়ে পালাচেছ বিপরীতে দিকে। তবে বিষাক্ত জাত-সাপের ব্যাপারটা আলাদা। যে গাছের নিচে শুয়ে থাকে সে গাছের পাতা গায়ে পড়লেও ছোবল মারে। পরিস্থিতি ভয়াবহ কিন্তু আমি ভয় পেলামনা। সন্তর্পনে এড়িয়ে গেলাম সাপটাকে। ঢুকে পড়লাম ভগ্নস্তুপের ভেতরে সরু এক বা দু’জন যেতে পারবে এমন একটা পথ দিয়ে। আমার ক্যামেরায় ফ্লাস লাইট টর্চের কাজও করে। তবে বেশিক্ষন সেটা টিকবেনা, চার্জ ফুরিয়ে যাবে সেলের এবং পড়ে যাব বিপদে। ফ্লাসের পাওয়ারে টর্চ জ্বাললাম যথেষ্ট সাবধানে। শব্দ তোলে ছুটে পালাল ইঁদুর, চিকার দল। উপরের দিকে আলো ফেলে ছাদের দেখা পেলাম অনেক উঁচুতে। সামনের দিকটা কোন দিকে, বের করা মুশকিল। অল্পক্ষনেই বুঝে গেলাম এক অলঙ্ঘনীয় চক্রব্যুহে প্রবেশ করে ফেলেছি আমি।


জৈন্তার হঠাৎ বিলুপ্ত রাজ্যপট বিষয়ে কিছুই জানি না তা-না। সিলেট অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস সংক্রান্ত বই পড়েছি পাবলিক লাইব্রেরিতে বেশ অনেক আগে। কার লেখা মনে নেই। প্রাচীন রাজ্যের ইতিবৃত্তের বর্ণনা রয়েছে বই-তে। শত-শত বছর আগেও জৈন্তারাজ্যের অস্তিত্ব ছিল। নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতি ছাড়াও ছিল মুদ্রা আর বিনিময় ব্যবস্থা। হিন্দু শাসকরাই শাসন করেছে জৈন্তায় যুগের পর যুগ। স্বর্ণ-মন্দির আর পাহাড়ি জলপ্রপাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বইটাতে। জৈন্তারাজ্যের ইতিহাসে কঠোর শাসনরীতির প্রয়োগ ছিল এ রাজ্যের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। অবিভক্ত ভারত, আসাম রাজ্য এবং ব্রিটিশ শাসন নিয়ে লেখা আরেকটা ইতিহাস ভিত্তিক বই পড়ে পেয়েছিলাম আরও রহস্যময় কিছু তথ্য। যেগুলো শিহরিত করেছে আমাকে প্রবলভাবে। শেষ জৈন্তারাজ ইন্দ্রসিংহের ব্যাপারে নানা গুজব আর গল্প-কাহিনী প্রচলিত ছিল দীর্ঘদিন। ব্রিটিশদের হাতে বন্দী হয়ে তার মারা যাওয়া পর্যন্ত মোটামুটি বিশ্বাসযোগ্যই মনে হয়েছে আমার। তবে জৈন্তারাজ্যের ইতিহাসে নৃশংসতা আর ব্যাপক বর্বরতার যে সমস্ত লোকগাঁথা শুনেছি, কিছুটা হলেও বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে সে সবেরও। প্রমান করেছে বইগুলোই। গা শিউরে ওঠা আরও গল্প-কাহিনী এবং জনশ্রুতির আলামত রয়ে গেছে প্রাচীণ ধ্বংসাবশেষ ঘিরে।( চলবে)