জীবন থেকে নেয়া শিক্ষা…

রুমা মোদক

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

কাব্য ও পদ্য বাবা মায়ের সঙ্গে

আমার দু’সন্তানকে আমি কখনোই ক্লাসে প্রথম হবার জন্য চাপ দেই নি। কখনোই নয়। কারণ আমি জানি দিলেও লাভ নেই।

না এদের প্রথম হবার যোগ্যতা নেই, তা নয় মোটেই। বরং অযোগ্যতাটা আমার। ওদের ক্লাসে ফার্স্ট বানানোর জন্য আমাকে আমার লেখক জীবন এবং এদের শৈশব বিসর্জন দিতে আমি রাজি নই।
ওরা এখন শর্টফিল্মের ওয়ার্কশপ করে, ছবি বানায় আবার পুরস্কার পায়। সেই পুরস্কার আনতে পরীক্ষার এক সপ্তাহ আগে ঢাকা যায়। অনেক বড় মঞ্চে শিল্পকলার ডিজির হাত থেকে পুরস্কার আনে। আমার কাছে এগুলোও ফার্স্ট হওয়ার থেকে কম মূল্যবান নয়। এরা এগুলো আনন্দে করে, উৎসাহে করে। শিশুদের এই আনন্দ উৎসাহগুলো আমরা অভিভাবকরা হত্যা করি নিজেদের প্রত্যাশার দুর্বহ চাপ ওদের উপর চাপিয়ে দিয়ে, ওদের মেরুদণ্ডহীন কুঁজো বানিয়ে।
হ্যা আমি একটু বেশি বুঝি। একটু বেশি বুঝে ফেলেছি বোধকরি। এই প্রথম হবার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় ত্রস্ত বাবা-মা দের দৌড়কে আমার করুণা হয়। কষ্ট হয় অসহায় বাচ্চাগুলোর জন্য। দিনমান কী দৌড় এদের! এক কোচিং থেকে আরেক কোচিং, এক টিচার থেকে আরেক টিচার!তাকানো যায় না এদের ধুঁকতে থাকা মুখের দিকে!
ছেলেমেয়েরা ক্লাসে ফার্স্ট হলে,বৃত্তি পেলে বাবা-মা হিসাবে বেশ গর্বে বুকটা ফুলে ওঠে ঠিক। কিন্তু আমাদের বুকটা গর্বে ফুলানোর জন্য এদের উপর কী অমানুষিক বর্বর চাপ দেই আমরা অভিভাবকরা! 
আমার এই দুজন, প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ১ দিন আগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মঞ্চে অভিনয় করে বাড়ি ফিরেছে রাত ১১ টায়। কোন ধরনের কোচিং করে নি। বাসায় একজন গৃ্হশিক্ষক ছিলেন।সেটা আমার স্বার্থে আমি রেখেছি। সারাদিন জীবনের ক্লান্ত দৌড় শেষে একটু জিরিয়ে নেয়ার জন্য।
আর ২০১৭ তে, ভেবেছিলাম আমিও একটু প্রচলিত মা হবো। একটু চাপেই রাখবো বাচ্চা দুজনকে।
কিন্তু নিয়তি অনিবার্য।বছরের প্রথম থেকেই একের পর এক ঝড়। বাবা চলে গেলেন। আমি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। ওদের বাবা বলতে গেলে প্রায় সারা বছর শহরের বাইরে। বাবার বাড়ি আর শশুরের বাড়ি, দু বাড়িতে দু দুটো বিয়ে, নানা জায়গায় নাটকের শো! কী ছিলো না!!
তারপরও দু’জন মুখ রেখেছে। জিপিএ ৫ পেয়ে। এই পাওয়াটা ওদের জন্য যতোটা না, আমার জন্য জরুরি ছিলো খুব। নইলে সব দায় চাপতো আমার নাটক আর সাহিত্যচর্চার উপর।
কাল যখন মেয়েটার বৃত্তি পাবার খবরটা পেলাম,ছেলেটা খুব মন খারাপ করলো।
আমার ছেলে যখন কিণ্ডারগার্টেনে পড়তো, পরীক্ষার সময় প্রিন্সিপাল পরীক্ষার হল ঘুরে এসে আমাকে ফোন দিতো। বলতো দিদি আপনার ছেলে আপনার মতো কবি হবে। আমি যে উত্তরটা জানি, সেটাই সে বলতো। ক্লাসের সব ছেলেমেয়েরা মনোযোগ দিয়ে লিখছে আর আপনার ছেলে বাইরে তাকিয়ে আকাশ দেখছে, গাছ দেখছে…….। তো সেই ছেলে কাল মন খারাপ করেছে। আমার কাছে এটা তার বৃত্তি পাবারও অধিক। আরো ভালো করার উপলব্ধিটা সে নিজেই করেছে।
কী হয় আসলে এসব ফার্স্ট, সেকেণ্ড বৃত্তি ফৃত্তি দিয়ে? যদি এরকম জীবন থেকে শিক্ষা না নেয়?

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে