আমার বাবা…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

বাবা মায়ের সঙ্গে।

মা যতটা, বাবা ততটা নয়…। অনেকটাই নয়…। একটুও নয়…।
আবার বাবা যতটুকু, মা অথবা পৃথিবীর আর কেউই ততটুকু নয়…।
ছোটবেলা থেকে তুমুল রকম ভাবে ‘মাদার্স চাইল্ড’ মেয়েটার বাপের সঙ্গে তেমন সহাবস্থান হয়নি কোনও কালেই…।

বরাবরই আমি যা চেয়েছি, যেমন চেয়েছি, বাবা ঠিক তার উল্টো দিকে আঙুল দেখিয়েছে…। আর মা মাঝখানে দাঁড়িয়ে দু’জনকে টেনে হিঁচড়ে মাঝামাঝি পথ বার করেছে…। আমি যত বড় হয়েছি, ওই মাঝের পথটা তত আমার দিকে ঘেঁষে এসেছে…। বাবাও আসতে বাধ্য হয়েছে…।

ছোটবেলা থেকেই শুনি, মেয়েরা নাকি সব বাবার রাজকুমারী হয়…! বাবারা নাকি সব মেয়ের প্রথম পুরুষ হয়…!
আমার কোনওটাই হয়নি…। চিরকাল আতুপুতু না করতে পারা বাপ আমার ভুলে থেকেছে, আমি কোন ক্লাসে পড়ি…। আর বাপের বেশির ভাগ কাজেকর্মেই গা জ্বলে গিয়েছে আমার…। তবে এই জ্বলার প্রতি একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করার মানসিকতা কাজ করে…। অন্য কেউ একটিও কথা বললে তাকে গপ করে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়…।

আজ অনেকটা, মানে অনেকটাই বড় হওয়ার পরে যেটা বুঝতে পারি, আমায় সব সময় বাবার অন্য পথে ঠেলতে চাওয়াটা আসলে আমার চাওয়ার ওপর জোর খাটানো ছিল না…। ছিল না নিজের চাওয়াকে আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেও…।
যেটা ছিল, তা হল…. আমার মধ্যে লুকিয়ে থাকা সবটুকু ক্ষমতা, দক্ষতা আর সম্ভাবনার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটানোর একটা চেষ্টা…। এই পৃথিবীর সব চেয়ে অনেস্ট আর আন্তরিক চেষ্টা…।

আজ যখন আমার সামনে আমার লেখার হাজারটা ভুল ধরে আমায় তিতিবিরক্ত করে তোলা বাবাই আমার আড়ালে অন্য কাওকে বলে, “আমি যদি তিয়াষের মতো লিখতে পারতাম…!”… তখন আফশোস হয় একটু…। মনে হয়, আরও আগে থেকে লোকটার সঙ্গে আর একটু বন্ধুত্ব করলে মন্দ হতো না…।

গত বছরে, আমি এক বার দু’দিনের জন্য পালিয়েছিলাম বাড়ি থেকে। কাউকে কিছু না বলে উধাও…!
ফেরার পরে রাত্রিবেলা কিংশুক এসেছে বাড়িতে…। প্রচুর প্রশ্ন, রাগারাগি, বকাবকি…। বাবা মন দিয়ে কাগজ পড়ছে…।
খানিক পরে আমার নিস্পৃহতায় অতিষ্ঠ হয়ে খুব গম্ভীর আর রাগী ভাবে কিংশুক বলে উঠলো আমার বাবাকে, “আপনি কিছু বলবেন না ওকে…! কোথায় গেল, কী করলো…জানতে চাইবেন না…!!”
বাবা অতি নিরুৎসাহে এবং নিরুত্তাপে কাগজ থেকে মুখ তুলে বলল, “ঠিক আছে, কত জায়গায় তো যায় বলে কয়ে…। এক বার না হয় না বলে একটু ঘুরে এসেছে, এত চেঁচামেচির কী আছে তাতে…!”
আমার না, জড়িয়ে ধরে চকাম করে লোকটার গালে একটা হামি খেতে ইচ্ছে করছিল…। কোনও দিন করিনি বলে খাওয়া হল না…!

তো এই হচ্ছে আমার সঙ্গে ঠিকঠাক বোঝাপড়া না হওয়া আমার বাবা…।

তবুও, আজও, আমায় সবটুকু বোঝার পরেও আমার মায়ের কাছে আমার ভাল থাকা মানে একটা সুন্দর সম্পর্ক, সুখীসুখী দাম্পত্য, গোছানো সংসার, হয়তো সন্তানও…। যদি তা কোনও বিসর্জনের বিনিময়ে হয়, তবু ভাল…।
কিন্তু আমার বাবার কাছে, আমার ভাল থাকা মানে আমারই ভাল থাকা…। শব্দে, সৃষ্টিতে, স্বপ্নে…।

আজ সেই বাবার জন্মদিনে, তার ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হতে পারা ছন্নছাড়া মেয়েটার তরফে এই শব্দ ক’টাই রইল কেবল…।

সরাসরি বলার বা ট্যাগ করার উপায় নেই, কারণ সে আমায় এবং আমার বন্ধুদের প্রতিদিন সুপ্রভাত আর শুভরাত্রি মেসেজ ফরোয়ার্ড করে বলে, তাকে আমি ব্লক করে রেখেছি…😬

স্মৃতির বাইরে চলে যাওয়া ছোটবেলার পরে এই প্রথম, বিয়ের সময় আমায় চুমু খেয়েছে বাবা…।
সেই ছবির ঋণ: Aboyob…❤

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে