সেই যে সেই দিনগুলি

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

ঘুরেফিরে সেই ছোটবেলার গল্পই বলে যাচ্ছি কারণ এখান থেকে বের হওয়াই আমার জন্য কঠিন হয়ে গেছে।কয়মাস আগে আমার ছেলের বিয়ে হল।যথাসম্ভব আনন্দ উৎসব এর ব্যাবস্থা করার চেষ্টা ছিল, প্রাণপ্রিয় আত্মীয় স্বজন তো ছিলেনই,ছিলেন অনেক তারকা, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিক ভাইয়েরা।তাঁদের সম্মান মাথায় রেখেই যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি বিয়েবাড়ি ঝলমল করে সাজাতে।আমার সাহেব নিজে বাজার করলেন, ঘি আসলো টাংগাইল থেকে,মুরগী আসলো ময়মনসিংহ থেকে,খাসী আসলো গাজীপুর এর গ্রাম থেকে,জলখাবার এর দৈ আসলো বোরহানিরর জন্য,বগুড়া থেকে “সাইলনা ” চাল আসলো, এইভাবে আমরা অতিথি দের আনন্দ দিতে চেষ্টা করেছি যথাসাধ্য। তার কয়েকদিন পরই আরেকটি বিয়ে খেতে গেলাম। সেই বিয়ের আয়োজন, খাওয়ার আয়োজন,সাজানো, বাদ্যবাজনা,সাজসজ্জা সব দেখে হঠাৎ কয়েক সেকেন্ড এর জন্য লজ্জিত হয়ে গেলাম।এমনিতে সব সময়ই আমি একটু সাধারণ থাকতে পছন্দ করি।আমার সামনে, আমার বাসায় বা আমার আশেপাশে এসে যেন কেউ কখনওই আফসোস না করে যে আহা, আমি যদি পারতাম! এমন কেউ আমাকে দেখে ভাবলে আমার ভালো লাগেনা। তাই আমি সচেতন ভাবেই বিলাসিতা এড়িয়ে চলি।সেই ছাপ আমি আমার পুরো জীবন,পুরো চলাচলতিতেই বজায় রাখি।তো সেই বিয়েতে একটু লজ্জিত বোধ করার কারণ ওনারা আমার ছেলের বিয়েতে এসেছিলেন,এসে হয়তো ভেবেছেন একি ছাঁদছিড়ি এই বিয়ের,হয়তো ভাবেননি এমন, এ আমার নিছক লজ্জিত মনের দুর্বল ভাবনা। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে বিশাল খোলা আকাশের নীচে লক্ষ টাকার ঝাড়বাতির নীচে দাঁড়িয়ে অতীব মূল্যবান পোষাক গয়নাদি গায়ে জড়িয়ে মেহমানগন এতো স্মিতহাস্যে খুব নীচু স্বরে ভদ্রতা বজায় রেখে হাসছিলেন,একে অপরের সঙ্গে কথা বলছিলেন আমার মনে হচ্ছিলো এই বাংলাদেশে কোথাও কোন যুদ্ধ নেই,নেই দুঃখ, নেই হানাহানি,আহারের অভাব বলে মানুষ কখনো কোন গল্প শোনেনি।এ যেন চাহিবা মাত্র গেলমানগন সেবায় নিয়োজিত হওয়ার বেহেস্তি শান্তির আবছায়া যুক্ত পরিবেশ। আমি বারবার খাওয়ায় অমনোযোগী হয়ে যাচ্ছিলাম,কন্যা বারবার তাগাদা দিচ্ছিলো আম্মু, একজন তোমাকে সালাম দিয়েছেন, উত্তর দাও! হাহাহাহা। আমি সত্যিই খেই হারিয়ে ফেলছিলাম। ফেরার পথে মনে পড়লো আমার ছোটবেলা দেখা বিয়ের অনুষ্ঠান বা আয়োজন গুলোর কথা। অনেক বিয়ে খেয়েছি তা বলতে পারবো না।তবে আমার লিলি খালাম্মা ও জোসনা খালাম্মার বিয়ে একই দিনে হয়েছিল।সেই গল্প টাই আমার মানসপটে ভেসে ওঠে।মনে মনে আলুর বস্তা চিনি গুড় মশলাদি দিয়ে উঠান ভরে যাচ্ছে।আমরা ছোটরা সেই বস্তাদির মাঝে লুকোচুরি খেলছি।যেন খেলার সুযোগ এটাই শেষ।খালাম্মারা কাঁদছেন লুকিয়ে।আবার তাদের আনন্দ সৌন্দর্য হয়ে ঠিকরে বেরুচ্ছে তাও বোঝা যাচ্ছে।আমার আব্বা লালনীল কাগজের বরাক কাটছেন,রশিতে আঠা দিয়ে লাগাচ্ছেন।আমরা বাচ্চারা সেদ্ধ আলুর খোসা ছাড়াচ্ছি।বর এলে দুই খালাম্মাদের সাজানো হয়েছে গোলাপি ও লাল বেনারসিতে।রাতে মেহমানের ভারে আমাদের বাচ্চাদের শোবার জায়গা হচ্ছে খাটের বা চৌকির তলে।দুই খালাম্মা কেঁদেকেটে পালকীতে চড়ে বসলেন, সব শেষ হয়ে গেলে নানীবুজি আরাম করে পানের বাটা নিয়ে মুখে পান গুঁজে দিয়ে আরাম করে কাঁদতে লাগলেন।আহা! সেই বিয়েবাড়ির প্রান! সেই বিছানো কলাপাতায় জিয়াফত খাওয়া,এগুলোই আসলে স্বর্গীয় উৎসব, আর ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট দিয়ে কোটি টাকা খরচ করা বিয়ের আসরগুলো? ওইদিন এক সেকেন্ড এর জন্য হলেও আমার সেই নিভুনিভু আলোর জাঁদরেল সৌন্দর্যময় বিয়ের আসরকে মনে হয়েছে হাসরের ময়দান। সবাই যেন গা বাঁচিয়ে নিজের জন্য ইয়া নফসী ইয়া নফসী করছে।কেউ বরকনে চেনে না, কেউ কাউকে চেনেনা বা নিজের আমিকেও এক মুহুর্তের জন্য ভুলে গিয়েছিল! কি জানি! কোনটা ঠিক,কোনটা ভুল জানিনা। আমার ভাবনা কবে পরিপক্ব হবে? আদৌ হবে কি ইহজনমে?

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে