আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…

আঁধার নেমেছে চারপাশে। আলোহীন এক সময়ে মানুষের পশুপ্রবৃত্তি তার ভেতর থেকে বের হয়ে এসে নিধন করছে তার নিজেরই আত্নপরিচয়। এই সমাজে নারী নিরাপদ নয়। ভাইয়ের কাছে বোন নিরাপদ নয়, পিতার সামনে কন্যা নিরাপদ নয়, বন্ধুর কাছে নারী বন্ধুটি নিরপদ নয়। পুরুষের কামনা অ্যাসিডের মতো উপচে উঠে ঝলসে দিচ্ছে গোটা সমাজকে। ধর্ষক বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিচ্ছে নারীর প্রতি, তার উত্থিত অস্ত্র, তার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা লোভের লালা, তার হাতে লেগে থাকা ধর্ষণের ইতিহাস ফিরে এসে নারীকে জানান দিচ্ছে সভ্যতার বুলি কপচানো এই সমাজটা মিথ্যে, ঠুনকো আর ভঙ্গুর।

কিন্তু তাতে কি আলোর পথে নারীর এই দীর্ঘ ব্রতযাত্রা থেমে যাবে? জন্মের আলো, প্রাণের আলো জ্বালে যে নারী তার কাছে তো এখানেই সব শেষ নয়। সে উঠে দাঁড়াবে, প্রতিরোধ করবে। এই আঁধারের কালে নারী বলবে-আমার মুক্তি আলোয় আলোয়।

এই সংখ্যা প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো একটানা ঘটে চলা ধর্ষণের ঘটনা আর ধর্ষকদের আষ্ফালন নিয়ে সমাজের বিভিন্ন অংশের সচেতন কয়েকজন মানুষের কথা, তাদের প্রতিক্রিয়া।

 

মনু ইসলাম, সাংবাদকি

আমি ঘৃণা করি ধর্ষণ, সর্বোচ্চ শাস্তি চাই ধর্ষকের

জীবনের যে ক্ষণ থেকে শব্দটি শুনতে পেয়েছি, সেদিন থেকে আজ অবধি ‘ধর্ষক’ শব্দের কোন প্রতিশব্দ এখনও খুঁজে বের করতে পারি নি।

এক্ষণে বিশ্বাস, ‘ধর্ষক’ শব্দটি এতটাই ভয়ানক ও বীভৎস, কোন কিছু দিয়ে এর ব্যাপকতা বোঝানো যায়-এমন কোন শব্দ বোধহয় নেইও।

এক সময় শুনতাম ডাকাত-দস্যুরা ধর্ষণ করে। মুক্তিযুদ্ধকালে শুনেছি বর্বর পাকিস্তানী সেনারা আমার মা- বোনকে ধর্ষণ করেছে। কৈশোর পেরুনো বয়সে শুনেছি মাতাল ষন্ডারা ধর্ষণ করে। এখন এই অভিযোগ বয়স, পেশা, অর্থনৈতিক অবস্থান, দুর্বল কিংবা সবল, ধর্মীয় নেতা কিংবা অর্ধার্মিক বা নাস্তিক- কোন বিশেষ শ্রেনী বা পেশা আছে- ধর্ষণের অভিযোগ শোনা যায় না?

ছোটকালে শোনা গুন্ডা নয়, এখন সুবেশধারী সন্মানজনক পেশায় নিয়োজিত কারো কাছেই যেন নারীরা নিরাপদ নন। পাশে পাশে থাকে, নরম নরম কথা কয়। কিন্তু সুযোগ পেলেই হাত বাড়ায়, হামলে পড়ে। দীর্ঘ দিনের বিশ্বাস, আস্থা, আত্মীয়ের বন্ধন, বয়সের ব্যবধান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক সব কিছুই অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে লিপ্সার কাছে।

দীর্ঘদিন যে বন্ধুটির সঙ্গে মন খুলে কথা বলেছে, কথায় মজে অনুরক্ত হয়ে উঠছে, যার সঙ্গে ক্লাশ বা ঘর থেকে একা বের হয়ে যেতে একটুও দ্বিধা জাগেনি- সেই মানুষটিই হঠাৎ ‘মানুষ’ থেকে নিছক ‘পুরুষ’ হয়ে যায়। অচেনা হয়ে যায়। হায়, লিপ্সার কাছে কত সহজেই নতজানু হয় পুরুষত্ব!

তাই আমি ঘৃণা করি ধর্ষণ এবং সর্বোচ্চ শাস্তি চাই ধর্ষকের। আমি চাই, প্রমাণিত হবার পর ওই ধর্ষককে তার জিঘাংসার অঙ্গটি কেটে ফেলে, সারাদেহ দীর্ঘ বস্ত্রখন্ডে মুড়িয়ে তাকে বছরের পর বছর চৌ-রাস্তার মোড়ে দাঁড় করিয়ে পাশে ‘আমি ধর্ষক। আমার মা-বোন নেই। আমি মানুষ নামের কলংক’ সাইন বোর্ড ঝুলিয়ে দেয়া হোক। দিনে রাস্তায় রেখে, রাতে তাকে জঙ্গলে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখার শাস্তি চাই আমি।

অবস্থাটা এমন ভয়াবহ অবস্থায় এসে গেছে যে, প্রয়োজনে আইয়ামে জাহিলিয়াত যুগের বিধান অনুযায়ী ‘কতল’ করাকে আজ সমর্থন দেয়ার সময়ও বোধ হয় এসে গেছে।

কী দেখছি আমরা? ধর্ষক সন্তানকে বাঁচাতে পিতা-মাতা, আত্মীয়-পরিজন ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কখনও কখনও স্ত্রী, পুত্র-সন্তানদের সমর্থনও পেয়ে যাচ্ছে ধর্ষকরা। ধর্ষক নিস্তার পাচ্ছে স্বপেশার মানুষের কাছে। নিস্তার পেয়ে যাচ্ছে আইন-কানুনের কাছেও।

আমি মনে করি, বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে ধর্ষণের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা আছে, তা অপরাধের তুলনায় খুবই নগণ্য। দন্ডবিধির ৩৭৬ ধারায় এর শাস্তির বিধান বর্ণিত আছে।

এই আইনের বিধান অনুযায়ী স্ত্রী না চাইলে কিংবা সম্মত না হলে তার ইচ্ছার বাইরে স্বামীর সহবাস বা যৌনমিলন একটি ধর্তব্য অপরাধ।

আইনের বিধান অনুযায়ী, ১২ বছরের কম বয়সী নারী, সে যদি বিবাহিত স্ত্রীও হন, তবে তার সঙ্গে যৌন মিলনও অপরাধ। এর শাস্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। কোন ভাবেই তা জামিনযোগ্য নয়।

স্ত্রীর বয়স ১২ বছরের বেশি বা যে কোন বয়সের হলেও তার ইচ্ছার বাইরে জোরপুর্বক যৌন মিলন করলে স্বামীর ২ বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড কিংবা এসব শাস্তির পাশাপাশি অর্থদণ্ড দেয়া যেতে পারে।

স্ত্রীর বাইরে কারো সঙ্গে জোর পুর্বক সহবাস বা যৌন মিলন করলে বিনা ওয়ারেন্টে তাকে গ্রেফতার করা যাবে। এই অপরাধ জামিনযোগ্য এবং কোন ভাবেই বিচার বহির্ভুত আপোষযোগ্য নয়।

যতটা জানি, অন্য সব ধরনের শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করার পরও কন্যাটির যৌনাঙ্গে পুরুষাঙ্গ প্রবেশ না করানো হলে-এই আইনে শাস্তি প্রদান সম্ভব নয়। তাহলে কি ‘ধর্ষণ’ অপরাধকে আমরা খন্ডিত করে ফেলছি না!

তাই এই আইনটিও যুগোপযোগী নয়- মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। এক সময় হয়তো ১২ বছরকে ‘সাবালক’ বিবেচনায় এই বয়স সীমা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু এখনতো ১৮ বছরের নীচে সবাই শিশু এবং এ সময়কালে বিবাহ দেয়া বেআইনি। তাই আইনটিকে আরো সংশোধন দরকার।

এতো গেল আইনের কথা। কিন্তু আমি চাই, আইন-কানুনে যা-ই থাক, আমাদের বন্ধুটি, বোন, মা, যে কারো স্ত্রী, বৃদ্ধা-কিশোরী যে কোন পুরুষ সদস্যের সঙ্গে ঘর থেকে বের হতে, ঘুরতে-ফিরতে, অফিসে-ক্লাশে নিরাপদ বোধ করুক। এক সময় আমরা আড্ডা দিয়ে ছেলে-মেয়ে যে ভাবে অবাধে ঘুরে বেড়াতাম- আবার ফিরে আসুক সেই সময়।

কাশফিয়া ফিরোজ, নারী উন্নয়ন কর্মী

ধর্ষণ বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষকেই

আজ হঠাৎ করে মনে পড়ছে ছোট্ট পরাজিতার (ছদ্মনাম) কথা। ওর সঙ্গে আমার পরিচয় গত বছর। সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের বিছানায় ওড়না পেঁচিয়ে শুয়ে ছিলো অপরাজিতা। হাসপাতালে আমরা পৌঁছেছিলাম দুপুর সাড়ে ১২টায়।ওয়ার্ডের দরজা থেকে হাত তুলে সিস্টার দেখিয়ে দিলেন ওয়েল ক্লথের উপর শোয়া ছোট্ট মেয়েটিকে । আমাদের দেখে ধড়ফড় করে উঠে বসে। আমরা জানতে কেমন আছো? খুব মলিন ভাবে উত্তর দেয় , ভালো? ওর চোখের দিকে তাকিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এতো রূপ, এতো সুন্দর চোখ আমি কোন দিনও দেখিনি। ওর দাদীকে জিজ্ঞেস করলাম, ওর বয়স কতো? উত্তর আসে, ৮।ওঠাৎ আমাদের চমকে দিয়ে অপরাজিতা আমাকে প্রশ্ন করে , এখন আমার কি হবে আন্টি? কোন উত্তর ছিলনা, শুধু শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছিলাম। দালিত পরিবারের মেয়ে অপরাজিতা। এনজিও পরিচালিত স্কুলের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। রাতের খাবার শেষে বাবা-মা আর দাদী যায় পাশের গলিতে টিভি দেখতে। অপরাজিতা যেন খাট থেকে গড়িয়ে না পড়ে তাই মা খাটের ধারে কোল বালিশ দিয়ে ভালো করে মশারী গুঁজে দিয়েছিলো। দাদা পাহারা দেয়ার জন্য শুয়ে ছিলো দরজার চৌকাঠ ঘেঁষেই । সে এসেছিলো দাদাকে টপকে , মশারী তুলে কোলবালিশ সরিয়ে কোলে তুলে বের করে নিয়ে গিয়েছিলো ওকে। অপরাজিতা ঘুমের মধ্যে প্রশ্ন করেছিলো,  কে? কোন উত্তর ছিলোনা। ঘুটঘুটে অন্ধকারে ধান ক্ষেতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো বালিকাটিকে। ওর চিৎকার মানুষের কানে পৌছেনি তবে ছুটে এসেছিলো এলাকার কুকুরগুলো। ওই কুকুররাই সেই রাতে বাঁচায় অপরাজিতাকে। পরের দিন ধরা পড়েছিলো ধর্ষকটি। তবে ধর্ষক এবং তার পরিবারের দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো খুব সহজেই বের হয়ে আসতে পারবে সে।কারণ ? কারণ , গত ১৫ বছরে শুধু ধর্ষণের মামলাই হয়েছে ৫৫০২টি (মামলা হয়নি এমন ঘটনা নিশ্চয়ই দ্বিগুণ-তিনগুণেরও বেশি। আর নারীদের উপর অন্যান্য নির্যাতনের কথা ছেড়েই দিলাম)। এর মধ্যে সাজা হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশের (সূত্র: প্রথম আলো)। আর ৫ হাজার ধর্ষকের মধ্যে সাজা হয়েছে মাত্র ১৬৫ জনের। আর ৫ হাজার ৩৩৭ জন কোনো সাজা ছাড়াই পার পেয়ে গেছে। চিন্তা করা যায়? ধর্ষণ পরবর্তী সময়ে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তিটিকে নিয়ে , তার চলাচল, আচার-আচরণ, এবং পোশাক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ একদিকে যেমন মানসিক ক্ষত বাড়ায় তেমনি ব্যক্তিগত ও সামাজিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে অনেকে মুখ বুজে সয়ে যায়। বিচার কার্যের দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতার ফায়দা নিচ্ছে স্বার্থান্বেষী মহল। যার ফল ভোগ করতে হচ্ছে বিশাল এক জনগোষ্টীকে।প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের ধর্ষণ এখন নিত্তনৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আশংকাজনক হারে বেড়েছে শিশু ধর্ষণের সংখ্যা। জামালপুরে এক লোক তার পঞ্চম শ্রেণীতে পড়া শিশু কন্যাকে ধর্ষণ করে গর্ভবতী বানিয়ে ফেলেছে। তাহিরপুরে আইস্ক্রিমের লোভ দেখিয়ে ৫ বছর বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়েছে, রংপুরে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণ । বাবা করছে সন্তানকে ধর্ষণ। ধর্ষণ, ধর্ষণ, ধর্ষণ।এ যেন এমন এক মহামারি যার প্রতিষেধক  আবিষ্কার হয়নি এখনও। তারপরও মনে আশা, হয়তো কোন একদিন বন্ধ হবে ধর্ষণ। কিভাবে? ১. পুরুষেরা যেদিন মেয়েদের সম-মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শিখবে, সেদিন বন্ধ হবে ধর্ষণ। ২. যৌনতার ইচ্ছে, নির্যাতনের ইচ্ছে, অবদমনের ইচ্ছে, পেশীর জোর দেখাবার ইচ্ছাকে সামাল দিয়ে পুরুষ যখন নারীর ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা জানাবে, তখন বন্ধ হবে ধর্ষণ। ৩. আইন দীর্ঘসূত্রিতা বন্ধ হবে যেদিন , আস্থা ফিরবে সেদিন। নারীর প্রতি অবমাননাকে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে নিয়ে দ্রুত বিচার আদালতে বিচার হবে যেদিন , ধর্ষণ বন্ধ হবে সেদিন। ধর্ষণ কোনও দিন মেয়েরা বন্ধ করতে পারবে না, মাথা থেকে পা পর্যন্ত বোরখায় ঢেকে চলাফেরা করেও না। ধর্ষণ বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে পুরুষকেই।

লুৎফুল হোসেন, কবি, লেখক

যদি মুছে ফেলা যেতো এমন কদর্য শব্দ আমার অভিধান থেকে

এক বিদেশী একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, তোমাদের দেশের মানুষ এতো ধার্মিক, তাহলে খুন, ধর্ষণের মতো অপরাধ কেন হয়? রাঙ্গামাটির এক বন্ধুর কল্যাণে জেনেছিলাম, আদিবাসীদের ভাষায় ধর্ষণ শব্দটির অস্তিত্বই ছিল না। কারণ, বিষয়টা তাদের সমাজে ঘটতো না। যদিও মানব সভ্যতায় ‘ধর্ষণ’ কোনো দুর্বোধ্য আগন্তুক শব্দ নয়। সুদূর অতীতে এর অস্তিত্ব আগ্রাসন, দখলদার, যুদ্ধজয়ী এসব শব্দ ও ঘটনার সঙ্গে জোট বেঁধে বিরাজমান ছিল। এর ভয়াবহ চেহারা দেখা গেছে দাঙ্গায়, দেশ দখলে। আমাদের সামনে এ শব্দের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর অবস্থান ছিল মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে। পাকিস্তানী হানাদারেরা তাদের হঠকারী হায়েনা নেতৃত্বের কাছ থেকে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট ভাবে জঘন্য রকম কু-প্ররোচনা পেয়েছিল। যুদ্ধ বিগ্রহে হাজার বছর ধরে হত্যা ধর্ষণ লুট এসব শব্দ জড়িয়ে থাকলেও শান্তিপূর্ণ সময়ে এটাকে দুর্ঘটনা হিসেবে ঘটতে দেখাটাই স্বাভাবিক বিবেচনা বলে গ্রাহ্য হতে পারে। দুর্ঘটনা নিয়মিত ভাবে প্রতি দিন ঘটে যাওয়া নিশ্চয়ই স্বাভাবিক এবং গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যটি এই যে, নিকট অতীত ও সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টা ভয়াবহ মাত্রায় ঘটছে। বয়সসীমা নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধা সবাই এর শিকার হচ্ছে। কথায় কথায় বলা হয়, আধুনিকতার নামে, ক্ষমতায়নের ছুতায়, নারীকে ঘরের বাইরে আনার ফলে এবং নারীর পোষাকে-আচারে পরিবর্তনই যৌন নিপীড়নকে হাতছানি দিয়ে ডেকে আনছে। সেরকম মতবাদকে প্রতিষ্ঠা করতে পহেলা বৈশাখ বা থার্টি ফার্স্ট উদযাপনের গায়ে ধর্ষণের সীলমোহর মারতেও অতি তৎপর একটি দল। অবাক ব্যাপার হচ্ছে এই যে, এইসব ধর্ষকদের পূর্বপুরুষের আমলে ব্লাউজ বিহীন ও এক প্যাঁচে শাড়ি পড়া নানী-দাদী, মা-খালা-ফুপু-চাচী এদের দেখে যে ধর্ষণ শব্দ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি। সেই ধর্ষণ শব্দের কাছেই নতজানু তাদের উত্তরাধিকার। আমি বলি শাড়ী খুব উত্তেজক পোষাক। শ্যালোয়ার-কামিজ শাড়ীর চেয়ে অনেক শালীন। পুরোটা শরীর অনেক ভালো ঢেকে থাকে শাড়ীর চেয়ে। ধরুন শার্ট-প্যান্ট এর কথাই। শাড়ীর চেয়ে ঢের ভালো ঢাকে নারীর শরীর। শাড়ীতে যদি শরীরের বিশ থেকে পঁয়ত্রিশ শতাংশ দৃষ্টিগোচরতায় উদার থাকে। শার্টে কিন্তু পাঁচ ভাগও উন্মুক্ততায় উদার থাকে না। তবু বলবেন শার্টের কোথায় কয়টা প্লিট-স্লিট, প্যান্ট কি পরিমান আঁটোসাটো! শালীনতাকে আপনি কিছুতেই তর্কের ছুরির নিচ থেকে সরতে দেবেন না। তর্ক চলতেই থাকবে!আসল কথাটা তাহলে কি? যে কথায় এসে থামতে পারে এই তর্ক-বিতর্ক! পোষাকই যদি কারণ হবে তো ন্যুডবিচে সারাক্ষণ ধর্ষণ লেগেই থাকতো। তাহলে!এই সবের সম্পূর্ণ অসুরটুকু আসলে কেবলি মানুষের মনে, দৃষ্টিভঙ্গীতে। কু-চিন্তা এবং কু-দৃষ্টিতে। কদাকার ধর্ষকগুলো মঙ্গল গ্রহ থেকে আসেনি। আমাদের ভিতরেই তাদের অবস্থান। মানি আর না মানি, তারা সবাই আমাদের পরিবার বা সমাজেরই অংশ। এ সত্যের পাশাপাশি অন্য যে প্রসঙ্গটি সবচেয়ে উৎকট ও প্রকট, তা হলো ধর্ষকদের প্রতি বাড়িয়ে দেয়া আশ্রয়-প্রশ্রয়। ধর্ষক যেই হোক, তাকে যদি বুক ফুলিয়ে হাঁটতে দিই, বিচার চাইলো বলে ধর্ষিতাকে পুনরায় ধর্ষণ ও হত্যার সুযোগ দিই। অনায়াসে বিচারবিহীন পার পেয়ে যেতে দিই। তবে তো প্রত্যক্ষ ভাবেই ধর্ষককে আমরা প্রণোদনা দিচ্ছি, উৎসাহিত করছি। সেক্ষেত্রে এর নিরাময় বা প্রতিরোধ তো অলৌকিক ভাবে আকাশ থেকে নেমে আসা ছাড়া আর কোনো সম্ভাব্য পথ থাকে না। কোনো অপরাধই দমন সম্ভব নয় যদি অপরাধীকে বিঘ্ন পোহাতে না হয়, বিচারের মুখোমুখি হতে, সাজা পেতে না হয়। এ দায়িত্বটি সম্পূর্ণভাবে প্রশাসনের, রাষ্ট্রযন্ত্রের। সেই বিচারটা অনিবার্য ও অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠবে তখনই, যখন সমাজ ব্যবস্থা এ নৈতিক দায় থেকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সরবার সুযোগ দেবে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আশ্চর্য এক মরফিনে বোধবুদ্ধিহীন অস্তিত্বের এক সমাজে আমাদের বসবার বেশ কিছুকাল ধরে। সেই সুযোগে পাক হানাদারদের মতোন ঘৃণ্য নৃসংশতায় ধর্ষণের নখর কেবলি বৃদ্ধি পেয়েছে।  অতি সম্প্রতি ধর্ষণের বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর সোচ্চার হয়ে উঠছে। সময় এখনই, অপকে টুঁটি চেপে ধরে, ধর্ষকের ভয়াবহ শাস্তির বিধান করার। জঘন্য অপরাধটি ঘটবার পথ রুদ্ধ করবার। জায়া, জননী, আত্মজাকে, উত্তরাধিকারকে সুস্থ্যতর ও বাসযোগ্য সময়ের সীমানায় পৌঁছে দেবার প্রক্রিয়াটিকে শক্তিমান ও গতিশীল করবার। আপন ভাষা, কৃষ্টি ও ঐতিহ্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এদেশের মানুষের পক্ষে অসম্ভব নয় অভিধান থেকে এ জঘন্য শব্দটি মুছে ফেলবার মতো ভবিষ্যতে পৌঁছে যাওয়া। সেই লক্ষ্যে কঠোর ও অনিবার্য হোক প্রতিটি ধর্ষকের সাজা। প্রতিটি মানুষে জাগ্রত হোক একে প্রতিরোধের বোধ।

শামীমা জামান
লেখক

লিঙ্গ কর্তন-ই হোক ধর্ষকের  শাস্তি

এই অভাগী দেশটা এমন ধর্ষণ বান্ধব হয়ে উঠলো কি করে ? একটার পর একটা লাগাতার নৃশংস সব ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি আমরা। আমাদের চোখ আর শিউরে ওঠেনা বিউটি আক্তার কে শুকনো হাওড়ে চিত হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে। শায়েস্তাগঞ্জের সবুজ ঘাসের জমিনে লাল জামা পরা রক্তাক্ত ১৬ বছরের কিশোরী। ৪৭ বছরের বাংলাদেশ!

 আমি নিজেও ছবিটি খেয়াল করেছি দু এক দফা ইগ্নোর করার পর।ভেবেছি স্বাধীনতা দিবসে কেউ এডিট করে শিল্পকর্ম করতে চেস্টা করেছে। তনু কে নিয়ে কোন লেখা দেখলে তনুর পরের শব্দটাও আর না পড়ে পালিয়ে যাই আমরা।তার চেয়ে বরং অনলাইন শপিং জগতের সুন্দরী আপুদের লাইভ পোশাক প্রদর্শনী দেখা যাক। কার না কার কে মরেছে আমাদের কি? তনু ,পুজা এসব তো পুরোনো প্যাঁচাল ।এখন তো প্রতিদিন-ই নতুন নতুন সাসপেন্স।দুদিন এর বেশি তিনদিন ও টেকে না কোন গুরুতর বিষয়ও। তারচেয়ে বরং কয়েকদিন ধরে ত্যানা প্যাঁচানো যায় মোশাররফ করিম বা নাস্তিক ভার্সেস আস্তিক ক্যাচাল।আরো একটু বেশি সময় নিয়ে লেবু কচলানো যায় লেখক যশপ্রার্থীনীদের স্ক্রিনশট বিষয়ক রগরগে আলাপে।গাজী রাকায়েত কি আসলে পাজি রাকায়েত? এইসব ফালতু বিষয়কে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় করে তুলতে আমাদের নারীবাদীদের জুড়ি নেই।

    মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক)এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ,গত তিন মাসে সারাদেশে ১৮৭ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।এরমধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৯জন কে,আর আত্মহত্যা করেছেন ২জন। ধর্ষণের চেস্টা চালানো হয়েছে ২১ নারীর ওপর।যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ২৭ জন নারী।প্রতিবেদনে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশুদের হত্যা এবং নির্যাতনের সংখ্যা আশংকাজনক বলে দাবী করা হয়েছে। গত ৩মাসে ৪২২জন শিশু বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়েছে। তবে বাস্তবতা পরিসংখ্যান এর চেয়ে কয়েকগুন বেশি ,এ কথা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

 ইভটিজিং শব্দটা আমাদের কাছে খুব তুচ্ছ আর স্টাইলিশ একটা শব্দ। যেন যুবক ছেলে ছোকরারা ওসব একটু করতেই পারে সুন্দরী মেয়ে দেখলে! বরং এক্ষেত্রে মেয়েদের দিকেই দোষারোপের তর্জনী তোলা হয়। মেয়েটি নিশ্চই ঠিকঠাক কাপড়চোপড় পরতোনা। বিউটি আক্তার ও ঠিকঠাক ওড়না পরতো কিনা জানিনা তবে প্রতিবেশি বাবুল মিয়া (এই বদমায়েশের নাকি বউ আর দুই বাচ্চা ও আছে) তাকে নিয়মিত উত্যক্ত করত বলে বিচার চেয়েছিল বিউটির বাবা।তারই প্রতিক্রিয়ায় সে অপহৃত হয়। এক মাস আটকে রেখে ধর্ষণ করে ইউপি সদস্য কলমচান-এর পুত্র নরপিশাচ বাবুল। ১২ ফেব্রুয়ারি বিউটির বাবা সায়েদ আলী বাদী হয়ে হবিগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে অপহরণ ও ধর্ষণ মামলা করলে তাকে হুমকি দেয় প্রভাবশালীমহল। ১৩ মার্চ মেয়েকে নানাবাড়ি লাখাইয়ে লুকিয়ে রাখলে সেখান থেকেই ১৬ মার্চ ফের অপহরণ  ও ধর্ষণ শেষে বিউটির লাশ ফেলে রাখা হয় শুকনো হাওরে। একই সময়ে চট্রগ্রামে ১ বছর ১০ মাস বয়সী শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ৮ বছরের শিশুকন্যা নুসরাত এর ফ্রিজ হয়ে থাকা বাকানো উরু, বিকৃত ভয়ংকর মুখ চোখ দেখে ও আমরা তৃপ্তি সহকারে প্রাতরাশ সারি।আমাদের দায়িত্বে থাকা নেতারা বুলি আওড়ান ‘’ধর্ষণ বা খুন বেড়ে গেছে এটা বোধ হয় সত্য নয়’’। তাদের ভাষ্যমতে ‘সমাজে কিছু ঘৃণিত ব্যক্তির এ ধরনের অপকর্ম আগেও ছিল! গ্রাম্য সালিশি বা অন্যভাবে ধামাচাপা দেওয়ার চেস্টা হতো।ফলে এটি ফলাও ভাবে প্রচার হতো না। কিন্তু বর্তমান সরকার এর বিরুদ্ধে কঠোর হয়ে অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার কারনে এটি সামনে চলে আসছে,এমন বক্তব্য ই দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান। হা হা ,শুনুন মহামান্য নেতা ! ফেসবুক নামক একটা দুনিয়া আছে।আর তার ই সামান্য কেরামতিতেই প্রশাসন এর কাজ অনেক সহজ হয়ে যায় আজকাল। বিউটির হত্যাকারী ফুফুর বাড়ীতে বিয়ানীবাজার এ আত্মগোপনে থাকা বাবুল গ্রেপ্তার হয়েছে। দুদিন আগেও দৃশ্যত মাসুম চেহারার নরপিশাচ রুবেল নুসরাত কে ধর্ষণ ও হত্যার পরে পালিয়ে ছিল। সাধারন মানুষের কিছু ফেসবুক শেয়ারেই সেও ধরা পড়ে। তবে বিচার কি হবে সে তো রাষ্ট্রই জানে।

ধর্ষণ এর বিচার নিয়ে আজ নতুন করে ভাববার সময় এসেছে। আমেরিকা ধর্ষিতার বয়স ও ধর্ষণের মাত্রা দেখে ৩০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দিয়ে থাকে। রাশিয়া ২০ বছর। চীন একধাপ এগিয়ে।কোন ট্রায়াল ছাড়াই মেডিকেল পরীক্ষার পর মৃত্যুদণ্ড। আফগানস্থান ৪দিনের ভেতর গুলি করে হত্যা নিশ্চিত করে। মালয়েশিয়া মৃত্যুদণ্ড, আরব দুনিয়া ফাঁসি ,যৌনাঙ্গ কেটে অতি দ্রুততার সাথে মৃত্যুদণ্ড দেয়। আমাদের দেশে কারাদণ্ড মানে মুক্তি। আজ আমার দল ক্ষমতায় না থাকলেও কাল ক্ষমতায় এলে আমার মুক্তি মিলবেই ।মেলেও। ক্ষমতা আর প্রভাব সব অপরাধ ক্ষমা করে দেয় ।অপরাধীকে করে তোলে আরো বেশি বেপরোয়া  অপরাধী।

একটা সময় এসিড সন্ত্রাস এমনই মহামারী রূপ ধারণ করেছিল। মৃত্যুদণ্ডে কিছু অপরাধী ঝোলার পরই এর ব্যপকতা কমে যায়। তাই ধর্ষণকারীর প্রতি কোন মানবিকতা দেখানোর সুযোগ নেই। লিঙ্গ কর্তন এর পর মৃত্যুদণ্ড ই হোক এর সাজা। আর কোন শিশু যেন পৃথিবীকে দেখার আগেই নরক দেখে না ফেলে।

লাজ্বাতুল কাওনাইন (শিক্ষক)

আগে দরকার পারিবারিক শিক্ষা

ধর্ষণ বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে বলতে আমরা প্রচন্ডভাবে ক্লান্ত। কারণ অক্লান্ত ভাবে এই বিকৃত অসামাজিক কর্মটি ঘটেই যাচ্ছে। বিচার আবার কি! যে ধর্ষিত হচ্ছে সে আর তার পরিবার লজ্জিত,নির্বাসিত এবং লাঞ্ছিত!  আর যারা করছে তারা বীর! এটা আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপট।  হ্যাঁ, থানা পুলিশ কোর্ট কাছারি ইচ্ছা করলেই করা যায়। তাতে লাভ কি? বড়জোর জেল,জরিমানা। আর সেটাও সঠিকভাবে ঘটে না। বিচারাধীন অবস্থায় বীরেরা থাকেন জামিনে আর ধর্ষিতা থাকেন জমিন নামক জেলে। আরো হয়রানি বাড়তেই থাকে।
প্রতিকার থেকে আসলে কোনো কোনো রোগের জন্য প্রতিরোধ বেশি দরকার পড়ে। সচেতনতা কোনো কাজই করে না অনেক ক্ষেত্রে। তবু আগে দরকার পারিবারিক শিক্ষা সেটা হোক ছেলে বা মেয়ে উভয়েরই। পারিবারিক মূল্যবোধের উপর কোনো ওষুধ আজো আবিষ্কার হয়নি এই ব্যাপারে। আমি অনেকেই বলতে শুনি শালীন কাপড় বা পর্দা এক মাত্র উপায় “ধর্ষণ” ঠেকানোর। আমরা পর্দার আড়ালে থাকা মেয়েদেরও ধর্ষিতা এবং লাশ হতে দেখেছি। শুধু ইসলাম ধর্মেই বলা আছে মেয়েদের পর্দার আগে ছেলেদের চোখের পর্দা করতে। একটা নির্দিষ্ট ধর্মের ছকে ফেলে এটা আপনি কিভাবে বন্ধ করবেন! অন্য ধর্মাবলম্বীরাও তো বসবাস করেন সমাজে।  যারা হয়তো পর্দা বা হিজাব ব্যবহার করছেন না তারা সবাই কি তাহলে ধর্ষণের হবার উপকরণ হয়ে যাবেন! এটা কি কাম্য হতে পারে?

শালীনতা আচরণ বা পোশাকে সে ব্যাপারে আমি একমত পোষণ করি কিন্তু তারও আগে দরকার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। একটাই ব্যাপার, ধর্ষণ প্রমাণিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে দিন। সে যতো বড় মহান ব্যক্তির আত্মীয় হোন বা না হোন। অথবা রাস্তায় পড়ে থাকা মানুষই হোক! এমন কয়েকটা হলেই টনক নড়বে এই অসুস্থ প্রাণীদের।

ছবি: গুগল