মনে পড়ে পচা ডিমের কথা

ইরাজ আহমেদ

এক সময় এই নগরীতে পচা ডিমের কদর ছিলো।আমার শৈশবের পাড়ার পাশেই শান্তিনগর বাজার। পরিচিত ডিমওয়ালার দোকানে দুটো আলাদা ঝুড়িতে রাখা থাকতো ভালো আর মন্দ ডিম। তখনও এই নগরের মানুষ ফার্মের ডিমের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ওঠেনি। তখন ডিম নষ্ট হতো। আর ওই নষ্ট ডিম বাজারে বিক্রিও হতো। কোথায় যেতো ওই ডিম? পচা ডিমের মূল ক্রেতা ছিলো রুটি বিস্কুটের বেকারী। আরেকটা কাজে এই ডিম ব্যবহৃত হতো। রাজনৈতিক সভা পন্ড করতে প্রায়শই পচা ডিম ছোঁড়ার গল্প তখনো এই শহরের হাওয়ায় ভাসতো। জানতাম ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারীতে পচা ডিম নিক্ষেপের ঘটনা। দুর্গন্ধযুক্ত এই ডিম অনেক সময় নিঃশব্দে উড়ে যেতো পাড়ার কোনো ফাংশন পণ্ড করতে।
পচা ডিম ছোঁড়ার ইতিহাস কিন্তু বেশ পুরনো। বহু আগে থেকেই জনসভায় ডিম নিক্ষেপ করে সেটা পণ্ড করে দেয়ার কাহিনী আমাদের জানা ছিলো। তখন হ্যান্ড গ্রেনেডের চেয়ে ডিম ছিলো উৎকৃষ্ট অস্ত্র। আমার জীবনে প্রথম এই ডিম ছোঁড়ার অভিজ্ঞতা আসে সত্তরের দশকের শেষপ্রান্তে। পাশের বাড়িতে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান। বাড়ির ছোট মেয়ের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। বিকেলবেলা হঠাৎই পাড়ার এক বড় ভাই এসে হাজির। তার সঙ্গে বাজারে যেতে হবে আমাকে, উদ্দেশ্য পচা ডিম কেনা। জানতে পারলাম পাশের বাড়ির সেই কন্যার সঙ্গে বড় ভাইয়ের প্রণয় ছিলো। তার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যাচ্ছে দেখে সেই অসহায় প্রেমিক বিয়ের মন্ডপে পচা ডিম নিক্ষেপ করতে চায়। সেই সময়ে বেশীরভাগ বাড়ির বিয়ে অনুষ্ঠিত হতো যার যার বাড়িতেই। সকাল থেকে দেখা যেতো বাড়ির ছাদ অথবা সংলগ্ন উঠানে শুরু হয়েছে ত্রিপল টানানোর কাজ।দু’দিন আগে থেকে ডেকোরেটার্সের লোক এসে গেট তৈরীর কাজ করতো। আমাদের সেই পাশের বাড়ির প্রশস্ত উঠানে কয়েক দিন ধরে চলছিলো প্যান্ডেল বাঁধার কাজ।
বিকেলবেলা আমরা দুজন শান্তিনগর বাজারে গিয়ে কয়েক হালি ডিম কিনে আমাদের দোতলা বাড়ির ছাদে লুকিয়ে রেখেছিলাম।মনে আছে তখন বাজারে পচা ডিম ভালো ডিমের অর্ধেক মূল্যে কেনা যেতো। ডিমের দোকানী একগাল হেসে আমাদের ডিমের পোটলা বাঁধতে বাঁধতে বলেছিলো-সাবধানে রাইখেন, একটা ফাটলে কিন্তু গন্ধে বাড়িঘরে থাকতে পারবেন না। আমরা ডিমগুলো যত্নে ছাদের পানির ট্যাংকের তলায় লুকিয়ে রেখে অপেক্ষা করতে থাকলাম সঠিক সময়ের। সেই বড় ভাই জানিয়েছিলো, ঠিক বর আসার মুহূর্তে আমরা ছাদ থেকে অনুষ্ঠানের ভেতরে ডিম ছুঁড়বো।কথা মতো সন্ধ্যাবেলা ওই বাড়িতে বরযাত্রী প্রবেশ করতেই সন্ধ্যার অন্ধকারে গা ঢাকা দিয়ে আমরা দুজন ডিম ছুঁড়তে শুরু করি। মুহূর্তেই বিয়ে বাড়ির কোলাহল থেমে যায়। তারপর শুরু হয় হৈচৈ। সেদিন সেই পচা ডিম ছুঁড়ে বিয়ে আটকানো যায়নি। তবে সেই বড় ভাইয়ের হৃদয়ের জ্বালার হতো খানিকটা উপশম হয়েছিলো।
আশির দশকে ঢাকা স্টেডিয়ামের গ্যালারীতে বসে যারা ফুটবল খেলা দেখতেন তাদের এই পচা ডিমের উপদ্রবের কথা ভালোই জানা আছে। তখন স্টেডিয়ামের গ্যালারী পূর্ব ও পশ্চিমে ভাগ করা ছিলো। পূব গ্যালারীতে বসতো মোহামেডানের সমর্থকরা। অন্যদিকে পশ্চিম দখলে থাকতো আবাহনী সমর্থকদের।এই দুই গ্যালারীর মধ্যে ইট পাটকেল বিনিময় হতো প্রায়ই। আর সেইসঙ্গে পচা ডিম। ডিম-বৃষ্টি থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য অনেক সময় আমাদের আশ্রয় নিতে হতো কারো ছাতার তলায়।
তরুণ বয়সে আরেকবার পচা ডিমের আক্রমণ দেখেছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি‘র অডিটরিয়ামে। একটি গানের অনুষ্ঠান চলছিলো সেখানে। একদল ক্ষিপ্ত যুবক মূল মঞ্চে সেদিন পচা ডিম মেরেছিলো। তবে কারণটা আমার কাছে আজো অজ্ঞাত।
ঢাকা শহরে পচা ডিমের সরবরাহ যেতো রুটি-বিস্কুট তৈরীর কারখানায়। বাজার থেকে অল্প দামে এসব ডিম কিনে নিয়ে যেতো বেকারীর মালিকরা। আর তা দিয়েই তৈরী হতো কেক, বিস্কুট আর পাউরুটি। পচা ডিমের এই ব্যবহারের বিরুদ্ধে একদা ঢাকার বন্ধ হয়ে যাওয়া খবরের কাগজ দৈনিক বাংলায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপা হয়।
ফার্মের ডিম সেই পচা ডিমকে বিতাড়িত করেছে। নিঃসন্দেহে একটি মহৎ প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই পচা ডিমের সঙ্গে বহু ঘটনার স্মৃতি জমে রইলো মনে। সেই ঘটনাগুলো মাঝে মাঝে বিমল আনন্দও দেয়। মনে পড়ে পচা ডিমের কথাও।

ছবিঃ গুগল