অতিমাত্রিক

সাব্বিরুল হক

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

অচেনা কোথাও গেলে দিক নির্ণয়ের জন্য কম্পাস কিনেছিলাম একটা। পল্টনের এক ঘড়ির দোকান থেকে। প্যান্টের পকেট থেকে বের করে দেখে নিলাম। সামনে এগোবার দিক আন্দাজ করতে পারলাম কিছু। ঠিক তখনই মাথার চুলে সজোরে ঝাপ্টা মারল বাদুড়। আরেকটু হলে ক্যামেরা ছিটকে যেত পড়ে। সামলে নিয়ে মাথায় হাত দিয়ে বুঝতে পারলাম ঠোকর দিয়েছে জোরেই। বড় সাইজের বাদুড় অন্ধকারে শত্রু চিনতে ভুল করেনি। আরেকটু সতর্ক করে দিলো আমাকে। ইন্দ্রিয়কে করে দিলো আরও টান-টান। পা বাড়ালাম সামনে। আমার ধারনা মূল রাজভবনের ভগ্ন কাঠামো ৩০ থেকে ৪০ হাজার বর্গফুট হবে আকারে। পেরিয়ে যেতে কতক্ষন লাগবে অনুমানে বলা সম্ভব না। তবে চলতে পারলে পেরুনো যাবে। যেহেতু দিক নির্দেশনা কিছুটা হলেও পেয়ে গেছি ইতিমধ্যে।
কাদার গর্তে পা পড়ল হঠাৎ।
দেবে গেল ডান পা ফুট খানেক । পায়ে শক্ত সোলের জুতো পরি সবসময়। বাম পায়ে ভর রেখে তুলে নিলাম কাদায় দেবে যাওয়া পা। কলেজে স্কাউটিংয়ে শেখা কসরতগুলো মাঝে মধ্যে এভাবেই কাজে দেয় আমার। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে সামনে বাড়লাম আবার। দেখেই ছাড়তে হবে অভিশপ্ত রাজ্যপাট। একই সঙ্গে কিছু অজানা তথ্য মনে করার চেষ্টাও চালালাম আবার।

অন্ধকার চিরে মাটি ফুঁড়ে দাঁড়ানো বিশাল ছায়াকৃতির অবয়ব দেখে চমকে উঠতেও ভুলে গেলাম। ব্যপারটা ঘটে গেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই। ছায়াময় এক দেহাবয়ব ছুটে গেল একপাশে । তার নড়াচড়ার শব্দে কেঁপে উঠল পুরাকীর্তি ভবনের পুরো রাজ্যপাট। মনে হল ভূ-কম্পনই হয়ে গেল রিখটার স্কেলে ৫-৬ মাত্রার। মাথার উপরে ভগ্ন ছাদের কাঁপা-কাঁপি টের পেলাম। একই সঙ্গে পায়ের নিচের মাটিও। ছায়াদানবের চাক্ষুষ মূর্তির ছুটে যাওয়ার সময় তাক লেগে যাওয়ায় ব্যর্থ হলাম ক্যামেরা শুট করতে। তবে মনস্থির করে নিতে দেরি হল না। ধাক্কাটাকে করে নিলাম ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য। পা বাড়ালাম সামনে, মনেহল ঠিক পথে এগোচ্ছি। রোমাঞ্চ ভাবনা হাতছানি দিয়ে ডাকল নতুন করে। ভয়ার্ত হলাম না বরং বহুগুনে বেড়ে যাওয়া কৌতুহলের সঙ্গে যোগ করে নিলাম অদম্য সাহস।

জলের শব্দ শুনতে পেলাম। ধারনা সঠিক। এদিকটায় প্রচুর জলধারা থাকার কথা শুনেছি। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাও রয়েছে। জৈন্তিয়া পাহাড় থেকে বেরিয়ে বড় হাওর হয়ে হাকালুকি পর্যন্ত নেমে গেছে জল-প্রনালী । হাটু পর্যন্ত লেগে গেল জলের ছোঁয়া। দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। জলটা নেমে যাওয়ার আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যে। এমন সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো চোখ ধাঁধিয়ে দিল দূরে গজিয়ে উঠা বিশাল লম্বা ছায়াদেহ মূর্তি। প্রাণপনে ক্লিক করলাম ক্যামেরায়।

হাতঘড়ি দেখে হতভম্ব হতে হল। রাত ১২ টা। কিভাবে সম্ভব! ভাবতে গিয়ে অবশ হয়ে গেল চিন্তাভাবনা। তাহলে কয় ঘন্টা ধরে আছি এই ধ্বংসাবশেষের ভেতর ? মনেহচ্ছে অনন্তকাল ঘুরপাক খাচ্ছি হারিয়ে যাওয়া সা¤্রাজ্যের অদেখা জগতে। আমার গা শিউরে উঠতে শুরু করল। রাজ্যভবন পেরিয়ে এলাম কি-না বুঝতে পারছি না। এখন আবার উপদ্রপ শুরু হয়েছে মশার কামড়ের। হাত, পা নাড়াতে হচ্ছে ক্রমাগত। স্থির হলেই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ছে দলে-দলে মশা। হাত দিয়ে ঘাড়ে চাপড় মেরে হাতটা টর্চের আলোয় তোলে ধরতেই আঁতকে ওঠার অবস্থা। রক্তে লাল। তার মানে বেশিক্ষণ থাকা লাগবে না। রক্ত খেয়ে সব সাফ করে দেবে মশার পাল। যে সে আকার নাকি, আকারে একেকটা যেন ঘাসফড়িং !
পা টেনে লম্বা করে চললাম সামনে।

অভিশাপে ভরা এই ধ্বংসরাজ্যে আমার অভিযাত্রা আসলে ঐতিহাসিক। মনেহয় না এর আগে কারো এমন মরনপণ ইচ্ছে জেগেছে এমন অভিযাত্রায়। নিজের ছায়াকে খুঁজে পাচ্ছি না এখন আর। এভাবে বেশি সময় চলা সম্ভব হবে না আমি নিশ্চিত। উপরে তাকিয়ে কোনোভাবে আকাশের দেখাটুকু পাওয়া যায় নাকি ভাবছি। এমন সময় কানে এলো ভয়ানক আর্তচিৎকার। ভগ্ন ইট-সুরকির দেয়ালে প্রতিধ্বনি উঠল সেই করুণ প্রানঘাতি চিৎকারের। মুন্ডুহীন একটা শরীর ঠিক তখনই চোখে পড়ল আমার। (চলবে)

অলঙ্করণ : গুগল