ধর্ষণ, আমাদের ঘৃণা, আমাদের প্রতিবাদ

মেজর খোশরোজ সামাদ

নীহার বানুর কথা কি মনে আছে? সেই সত্তর দশকের সত্য একটি ঘটনা। নীহার বানু ছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ‘বাবু’ ছিল তার কথিত বন্ধু। বাবু তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। নীহার বানু অসম্মতি জানালে বাবু ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠে। তারপর একদিন কৌশলে নীহার বানুকে তার বাসায় নিয়ে আসে বাবু। সে এবং তার বন্ধুরা নীহার বানুকে উপুর্যপরি ধর্ষণ করে। পরে নীহার বানুকে হত্যা করে মাটিতে পুতে রাখা হয়। কয়েক মাস পরে ঘটনাটি প্রকাশিত হয়ে পড়ে। তৎকালীন বহুল পঠিত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ ঘটনাটি নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী প্রকাশ করে। সেই ধর্ষণের ঘটনার খবর দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে।
এক সময় ধরা পড়ে বাবুর সহযোগীরা। বিচারে মূল ধর্ষক বাবু এবং তার বন্ধুদের কয়েকজনের ফাঁসি এবং অন্যান্যদের জেল জরিমানা হয়। অন্যদের ক্ষেত্রে বিচারের রায় কার্যকর হলেও বাবু দেশ থেকে পালিয়ে যায়। আজও তার কোন সন্ধান পাওয়া যায়নি। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে নীহার বানু‘র ধর্ষণ এবং হত্যার ঘটনাটিই ছিল বহুল আলোচিত। পৃথিবীর প্রায় সব যুদ্ধেই ‘গণ ধর্ষণ’ এর নজির পাওয়া যায়। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে দুই লক্ষ মা বোনের সম্ভ্রমহানি ঘটানো হয়। এদের মধ্যে হাজার হাজার নারীদেরকে যুদ্ধের প্রায় পুরো সময়ই বন্দী করে ‘যৌন দাসী’ করে রাখা হয়।
প্রিয় পাঠক, চলুন ঘুবে আসি ধর্ষণের আদি ইতিহাস থেকে। গ্রীক পৌরণিক কাহিনীতে ধর্ষণের শত শত কাহিনী পাওয়া যায়। খোদ গ্রীক দেবরাজ জিউস-ই ছিল এই অভিযোগে অভিযুক্ত। প্রিয়দর্শিনী ইউরোপা যখন সখী পরিবেষ্টিত হয়ে স্নানে যাচ্ছিলো তখন জিউসের কুদৃষ্টি পড়ে। জিউস ষাঁড়ের বেশে ইউরোপাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় এবং পরে ধর্ষণ করে। এসব তো পৌরাণিক কাহিনীর গল্প। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে শুধু যুদ্ধ নয় নানা সময়েই নারীর সম্ভ্রম বারবার লুণ্ঠিত হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ধর্ষণের ঘটনা আশংকাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিশোরী, যুবতী থেকে শুরু করে শিশুরাও রক্ষা পাচ্ছে না এই ধর্য়কদের হাত থেকে। পড়ার বই, স্কুল, পরিবার তাহলে কি আমাদের কিছুই শেখাতে পারছে না? সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনার ধারা কি শুকিয়ে গেছে? আমরা কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে মানবিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারিনি? উত্তর তো এখন একটাই-না। আর পারিনি বলেই এই একবিংশ শতাব্দীতে ভোগবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মানুষের ভেতরের পশুবৃত্তি দানবের আকার ধারণ করে আমাদের ঘিরে ধরেছে। আমাদের আত্মার ভেতর থেকে উঠে আসছে ক্লেদাক্ত এক অবয়ব যা আমাদের নিজেদেরই চমকে দিচ্ছে।
অবক্ষয়ের দূষিত বাতাস বিশ্বকে উথাল-পাথাল করে দিয়েছে। সম্প্রতি হলিউডের শীর্ষস্থানীয় অনেক অভিনেত্রীই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া যৌন নির্যাতনের ঘটনা ‘হ্যাশ ট্যাগ মি টু’র মাধ্যমে সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের সমাজের অভিজাত নারী থেকে শুরু করে গার্মেন্টস কর্মীরাও তাদের ভয়াল অভিজ্ঞতা সবার সঙ্গে বিনিময় করেছেন। সামগ্রিক বিবেচনায় দেখা যায় ধর্ষণকারীদের বয়স, পেশা, সামাজিক অবস্থান সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তারা ধর্ষণের মহোৎসব চালিয়ে গেছে। প্রতিবেশী ভারতে বছর তিনেক আগে বাসে ‘আমানত‘ কে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। এ বিষয়ে ভারতবাসী ফুঁসে উঠে। অনেকেই ভারতকে রেড ইন্ডিয়া বা ‘রেন্ডিয়া’ বলে সম্মোন্ধন করতে শুরু করেছে। ভারতের পত্রিকাগুলো এখনো নিয়মিত প্রকাশ করছে নারীর সম্ভ্রমহানির ভয়াবহ সব সংবাদ।
ধর্ষণ কাকে বলে? বাংলাদেশের বর্তমান আইন অনুযায়ী ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে ‘যদি কোন পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোলো বৎসরের অধিক কোন নারীর সহিত তাহার অনুমতি ব্যতীরকে বা ভীতি প্রর্দশন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতিতে যৌন সঙ্গম করে অথবা ষোলো বছরের নীচে কোন নারীর সহিত অনুমতি ছাড়া অথবা অনুমতিসহ যৌন সঙ্গম করে তবে তাহাকে ধর্ষণ বলা হয়।

ধর্ষণ ঘটে যাবার পর একজন নারী তাৎক্ষণিক ভাবে বেশ কয়েকটি শারীরিক ক্ষতির মুখোমুখি হয়। তারমধ্যে প্রথমেই আসে ব্যথার প্রসঙ্গ। নারীর পেলভিকে শুরু হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা। সেই নারী আক্রান্ত হয় মলদ্বারের রোগে, মাইগ্রেন ও অন্য ধরণের মাথা ব্যথায়। ধর্ষণ একজন নারীর শরীরের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। নারী আক্রান্ত হতে পারে যৌন রোগে।
শরীরের পাশাপাশি নিপীড়িত নারীর মনও বিপর্যস্ত হয়। দেখা দেয় ভয়, সন্দেহবাতিক এবং বিষন্নতা। এই বিষন্নতা তার মনে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। আর এই বিষন্নতা তাকে ঠেলে দিতে পারে আত্মহত্যার দিকে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত আইন)-এ ৯ ধারা অনুযায়ী ধর্ষণের অপরাধে যে সকল শাস্তির বিধান রয়েছে তা হলো, ধর্ষণের ফলে কোন নারী বা শিশুর মৃত্যু হলে ধর্ষণকারীর জন্য রয়েছে মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড। একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষণের পর যদি তার মৃত্যু ঘটে তবে উক্ত দলের সকলের জন্য এই শাস্তি প্রযোজ্য। ধর্ষণের চেষ্টা করলেও ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ দশ বছর এবং সর্বনিম্ন পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদন্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ধর্ষণের শাস্তি বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম। উত্তর কোরিয়ায় ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করবার নিয়ম আছে। চীনেও মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। সৌদি আরবে দ্রুততম সময়ে ‘কোতল’ করবার প্রথা আছে।
বাংলাদেশসহ প্রায় সবদেশে ধর্ষণের শাস্তির বিধান আছে। কিন্তু আমাদের দেশে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি আমরা দেখতে পাই না। আইনের ফাঁক গলে এই ঘৃণিত মানুষগুলো মুক্তি পেয়ে যাচ্ছে। তারপর আবার এই ঘৃণ্য কর্মকান্ডে জড়িত হচ্ছে। তা হলে কেন ধর্ষণের শাস্তি হচ্ছে না সেই কারণের গভীরে যাওয়া দরকার। ধর্ষক সাধারনত সাক্ষী রেখে ধর্ষণ করে না। তাই, ধর্ষিতার পক্ষ থেকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে ‘ফুল প্রুফ’ প্রয়োজন হয়ে উঠে। সেক্ষেত্রে ‘ডাক্তারী পরীক্ষা’ অপরিহায। ধর্ষণের আলামত সাধারনত ২৪ ঘণ্টার পর আর থাকে না। ডিএনএ টেষ্টের মাধ্যমে ধর্ষকের বীর্যের উপস্থিতি একটি ‘অবিতর্কিত প্রমাণ।’
সাধারনত লোকলজ্জা, ভীতি, ঘটনার ভয়াবহতায় হতভম্ভ হয়ে যাওয়া, ভবিষ্যতে বিয়ে না হওয়ার সম্ভাবনা এমনি ধর্ষিতা নিজের মা-বাবা অথবা নিকটজনের কাছেও মুখ খুলতে চায় না।
কথা সাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের অমর সৃষ্টি ‘দেবদাস’। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র দেবদাস প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে পার্বতীকে আঘাত করে মুখে দাগ করে দেয়। এটি নিছক গল্প হলে ভাল হতো। সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পাই সমাজেও। প্রত্যাখ্যাত রোমিওরা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে আশ্রয় নেয় ধর্ষণের। এদের মধ্যে অনেকেই আবার রাজনীতির ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত হয়। সেই রাজনৈতিক শক্তিই তাদের অপরাধের শাস্তির কবল থেকে আড়াল করে রাখে। তাই ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং এর বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগই এখন মূল বিবেচনার জায়গা হয়ে ওঠা উচিত। আমাদের মনে রাখা উচিত, এই কিছুদিন আগেও সিলেট জেলায় প্রথমে ধর্ষণের শিকার হয় বিউটি নামে একটি মেয়ে। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করতে গেলে থানার পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে বিউটিকে খুন করে একটা মাঠে ফেলে রাখে ধর্ষক। আমাদের মনে রাখা উচিত আমাদের দেশে রক্ষকরা প্রায়ই ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। স্বাধীন বাংলাদেশের এই জমিন আর ধর্ষিতার কান্না বহন করতে পারছে না।

লেখক: উপ অধনিায়ক, র্আমড র্ফোসসে ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরটেরী
ছবিঃ গুগল