স্বপ্নজালে আটকে গেল দর্শক!

মাসুদুল হাসান রনি

সিনেমা দেখে হল থেকে বেরিয়ে ভাবছিলাম দর্শক হিসেবে স্বপ্নজাল নিয়ে প্রশংসা ছাড়া কি লেখা যায়? নিজের মুগ্ধতা কাটিয়ে কোন খুঁত খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সেই মুগ্ধতাটাই আগে বলি। একটা সিনেমা যতটা যত্ন নেয়া প্রয়োজন তার সবই সাধ্যমতন করেছেন পরিচালক গিয়াসউদ্দীন সেলিম তার দ্বিতীয় চলচ্চিত্র স্বপ্নজালে। গল্পের গাঁথুনি, শিল্পীদের দূর্দান্ত অভিনয়,পরিমিত সংগীতের ব্যবহার, অসাধারন সিনেমাটোগ্রাফি,পোষাক পরিকল্পনা ও যথাযথ মেকাপ এককথায় মুগ্ধতা ছড়িয়েছে ।এভাবেই তিনি দর্শককে আটকে ফেলেছেন দুইঘন্টা কুড়ি মিনিটের স্বপ্নজালে।

গিয়াসউদ্দিন সেলিম

সিনেমার গল্প নিয়ে কথা বলার আগে শিল্পীদের সম্পর্কে দু’চার কথা বলার লোভ সম্বরন করা মুশকিল হয়ে যাচ্ছে । অভিনয় শিল্পীরা তাদের প্রতিটি চরিত্রে যথার্থ অভিনয় করেছেন বলাটা অত্যুক্তি হবে না। প্রথমে শুভ্রা চরিত্রের কথাই বলি। দর্শক অন্য এক পরীমনিকে আবিস্কার করবে স্বপ্নজালে। মফস্বলের মেয়ের ভুমিকায় তার সারল্যমাখা মুখশ্রী , সাবলীল অভিনয় ,সাদামাঠা মেকাপ , পোষাক নির্বাচন সবকিছুই একেকটি দৃশ্য হতে আগের দৃশ্যের সৌন্দর্য্য ও অভিনয়কে হার মানিয়েছেন । স্বপ্নজাল না দেখলে কেউ বুঝবেই না ঢাকাই চলচ্চিত্রের কোনো নায়িকা এতো সুন্দর, শুভ্র, এতো পরিমিত অভিনয় করতে পারে! স্বপ্নজালের পর পরীমনি আর কোনো সিনেমায় অভিনয় না করলেও দর্শক তাকে অনেক অনেকদিন মনে রাখবে।
আয়নাল গাজীর চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু কি অসাধারন অভিনয় করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না! শংখনাদের কাফনের কাপড় চোর থেকে অজ্ঞাতনামা, গহীন বালুচর ও স্বপ্নজালের আয়নাল গাজীর চরিত্রে ফজলুর রহমান বাবু নিজেকেই ছাড়িয়ে গেছেন । পর্দায় তার প্রতিটি উপস্থিতির পোষাক নির্বাচন, নানান সময়ের শারিরীক অঙ্গভঙ্গি ও সংলাপ প্রক্ষেপনের সঙ্গে অভিনয় ছিল দূর্দান্ত। প্রতিটা দৃশ্যের সামজ্জস্যপূর্ণ তার মেকাপ যথার্থই মনে হয়েছে।
আয়নাল গাজীর সকল অপকর্মের দোসরের চরিত্রে ইরেশ যাকেরকে নির্বাচন করার যৌক্তিকতা তিনি প্রমান করে দিয়েছেন ছোট্ট একটা চরিত্রে অসাধারন অভিনয়ের গুনে। ইরেশ চরিত্রটি শুধু ধারন করেননি , তিনি সাতমাস শেভ না করে দাড়ি বড় করেছিলেন কারেক্টারের গেটআপ পারফেকশনের জন্য। সাধুবাদ তার নিষ্ঠা ও সুঅভিনয়ের জন্য।
আলাদা করে নবাগত ইয়েশ রোহানের কথা বলতে হয়। পরীমনির বিপরীতে অপু চরিত্রে তার সাবলীল অভিনয় কখনোই মনে হয়নি তিনি প্রথম কোন চলচ্চিত্রে অভিনয় করছেন। এছাড়া মিশা সওদাগর, শহীদুল ইসলাম সাচ্চু,শিল্পী সরকার অপু, ফারহানা মিঠু সবাই যার যার চরিত্রে ভাল করেছেন।
স্বপ্নজালের চিত্রগ্রহন করেছেন কামরুল হাসান খসরু। প্রত্যেকটা ফ্রেম মনে থাকবে অনেকদিন। এককথায় চমৎকার সিনেমাটোগ্রাফী ,যা স্বপ্নজালের বড় প্রাপ্তি বলা যায়।
এবার একটু স্বপ্নজালের কাহিনী নিয়ে বলে লেখার ইতি টানতে চাই। পাশাপাশি হিন্দু-মুসলিম দুটো বাড়ির সন্তান শুভ্রা ও অপুর প্রেমের গল্প স্বপ্নজাল। পরিচালক দেখিয়েছেন দুই ধর্মের দু’জন তরুণ-তরুণীর প্রেমে কি প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের সমাজ ও ধর্ম! তারপরও সবকিছুকে পাশ কাটিয়ে ভালোবাসাতে চায় অপু-শুভ্রা। শেষ পরিনতি কি হয়েছিল ?
এতোটুকু পড়ে পাঠক ও দর্শক ‘স্বপ্নজাল’কে শুধু প্রেমকাহিনী ভেবে নিলে ভুল করবেন। টানাপোড়ন, হতাশা, লোভ, বিশ্বাসঘাতকতা, পৈচাশিকতা ও লালসার সঙ্গে মায়া, নিখাদ দায়িত্ববোধ আর রূঢ় বাস্তবতার সংমিশ্রন ঘটেছে স্বপ্নজালে। আছে অন্যায় ,অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের গল্প।
ধন্যবাদ বেংগল ক্রিয়েশন এবং গিয়াসউদ্দিন সেলিমকে মনপুরার পর আর একটি পরিচ্ছন্ন বাংলা সিনেমা উপহার দেওয়ার জন্য।

ছবি: গুগল