বেনারসী শাড়ির প্রতি আমার আজন্ম দুর্বলতা

রিনি বিশ্বাস

(কলকাতা থেকে): ছেলের ইতিহাস ভালোলাগার জন্যই আমাদের ছোট্ট সফর এবার বেনারস আর লক্ষ্ণৌ-এ। বেশ কিছুদিন আগে থেকেই ব্যস্ততা; টিকিট, বুকিং ইত্যাদি প্রভৃতি; তারপর টুক করে বেরিয়ে পড়া।

বেনারসে একটা গোটা দিন কাটলো দিব্য; কাশী বিশ্বনাথ দর্শন সেরে অলিগলি ঘোরা আর গঙ্গার ঘাটে আরতি দেখার প্ল্যান তো ছিলই; আর ছিল আমার বেনারসী কেনার হুজুগ। হোটেলে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে যা বুঝলাম তা হল বড় দোকানে দামও হবে বেশ বড়সড়; গলির অন্দরে সেঁধিয়ে থাকা দোকানে হয়তো বা তেমন হবেনা; তা বেশ। রামনগর ফোর্ট যাবার মনোবাঞ্ছা নিয়ে বেরোনো হল সকাল সকাল। বড় রাস্তা অবধি যেতে গলিতে যে ক’টা দোকান চোখে পড়ছে, জানতে চাইছি ‘বেনারসী?’ সবাই মোটামুটি না-সূচক ঘাড় নাড়ছেন দেখে মনেমনে বেশ মুষড়েই পড়ছি, ও, তাহলে এই গলিতে তেমন পাবোনা! হঠাৎ বাঁদিকে হাত দেখিয়ে এক চাচা বললেন ‘উধার মিলতা হ্যায়’.. বাহ্ বাহ্। বেশ বেশ; পৌঁছলাম সেখানে; বর, ছেলের মুখে স্পষ্টতই বিরক্তি! আমি সেসব দেখেও দেখিনা! গটগট করে হেঁটে ঢুকে পড়লাম সেই অজস্র শাড়ির মধ্যে; জনান্তিকে বলে রাখি বেনারসী শাড়ির প্রতি আমার আজন্ম দুর্বলতা! কেন তা জানতে চাইলে অবশ্য ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবো!

আলাপ হল কামরানের সঙ্গে; আমার অসম্ভব ভালো হিন্দী শুনে এবং তা বুঝে সে ততক্ষণে শাড়ি দেখাতে ব্যস্ত! ছেলে কানে ইয়ারফোন গুঁজে গানে মগ্ন; বর অপেক্ষা করে আছে এ পর্ব কতক্ষণে শেষ হবে! ক’টা শাড়ি কিনলাম, সেসব বলবোনা মোটেও! যখন পরবো, তখন জানা যাবে সেসব; যা বলতে এত গৌরচন্দ্রিকা, এবার সেটা বলি; শাড়িটাড়ি বাছাই করে রেখে আমরা বেরোবো রামনগর ফোর্ট দেখতে; কামরানকে জিগ্যেস করা হলো কিভাবে যাবো; সে তক্ষুণি তার এক ভাইকে পাঠিয়ে দিল যেন সে অটো ঠিক করে দিতে পারে! কথাপ্রসঙ্গে ততক্ষণে আমাদের ‘নন ভেজ’ প্রীতির কথা আমরা বলে ফেলেছি; জানতে চেয়েছি কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া যায়; কামরান( একেবারে বাচ্চা ছেলে) বোদ্ধার মত বলেছে ‘শাম কো বাতায়েঙ্গে’..

রামনগর ফোর্ট , বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি ঘুরে, দুপুরের পেটপুজো সেরে বৈকালিক নৌভ্রমণ(নৌকার ভাড়া নিয়ে কতটা দরাদরি করতে হবে, সেটাও কামরানই বলে দিয়েছে!!) সারার মধ্যেই এসেছে কামরানের ফোন। বলেছে ওদের ওখানে চলে যেতে গঙ্গারতি শেষ হলে;

আফরা, পিনাকী, পাবলো, কামরান, রহমান, আব্দুল্লাজী, আব্দুর রহমানজী

এরপরেই আসল ঘটনা! পৌঁছনোর পর আমরা টের পেলাম, আমরা সেদিন ওদের অতিথি! আমাদের সেভাবে না জানিয়ে ওরা মস্ত বন্দোবস্ত করে ফেলেছেন; মাংসের রকমারি পদ, বেনারস স্পেশাল রুটি, বিরিয়ানি সবশেষে অপূর্ব মিহিদানা! পেটভরার চেয়েও বেশি ভরে গেল মন! খেয়ে উঠতে না উঠতেই কামরানের চাচা-আব্দুর রহমানজী নিজে হাতে সেজে খাওয়ালেন খাঁটি বেনারসী পান.. সব দেখেশুনে আমরা যাকে বলে কেমন ভেবলে থাকলাম বেশ খানিকক্ষণ। বারবার শুধু ভালোলাগা আর কৃতজ্ঞতা জানাতে পারলাম .. আর অবশ্য কিছু পারতামও কি?! ভাগ্যিস তখন কলকাতায় ছিলাম না, ভাগ্যিস বাংলা খবরের কাগজ পড়িনি, তাই জানতে পারিনি কলকাতার কাছেই আসানসোলে তখন কী উত্তাল পরিস্থিতি!ভাবতে অবাক লাগে, যেদেশে একদিনের আলাপে এমন আপন করে নিতে পারেন মানুষ, সে দেশেই অমন ছবিও দেখা যায়! সত্যি মানতে বড় কষ্ট হয়! বারবার মনে হয় ওই সন্ধ্যের মত হোক আমাদের সবার সব সকাল-সন্ধ্যে; বাকি সব মিথ্যে হোক, মিথ্যে হোক…

ছবি: লেখক