এইভাবেই আমরা তছনছ হবার হাত থেকে বেঁচে যাই

জয়দীপ রায়

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

গুজরাট থেকে বেরিয়ে সাড়ে তিনশো কিলোমিটার পেরিয়ে যখন আবু রোড পার হচ্ছি, রাত সাড়ে দশটা। আবু রোডে রায় থাকে। রয়সাব। এমনি কোনও যোগাযোগ থাকেনা। যখন আমার দরকার পড়ে, তখন খোঁজ করি।যেরকমটা আমি সবার সঙ্গেই করি। 
একবার দিদিমাকে নিয়ে আজমীর থেকে ট্রেনে করে সোমনাথ যাচ্ছি। আবু রোডের উপর দিয়ে যাবে ট্রেন। ফোন করলাম রায়দাকে। ও জানতো আমার পেটের সমস্যা। বাইরের খাবার তখন একেবারেই খেতে পারতাম না। বললো, আমি ষ্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকবো। আবু রোড ঢুকলে দেখি রায়দা একটা থলে হাতে আমাকে খুঁজছে। বাড়ি থেকে বানিয়ে নিয়ে এসেছে। সেদ্ধ ডাল, আলুভাতে, কেঁকড়ির সব্জি আর গরমভাত। ও ট্রেনের মধ্যে ঢুকে দিদিমাকে প্রণাম করে নেমে যাওয়া অব্দি ড্রাইভার হুইশল বাজায়নি। আমি রায়কে প্রণাম করার মন নিয়ে জড়িয়ে ধরলাম।
পরশু রাতে রায় বললো, বাড়ি চলে আসুন। দুটো খেয়ে আবু রোডেই থেকে যান। উদয়পুরের রাস্তাটা ফোর লেন হবার পরেও সেফ নয়। আবু রোড থেকে সেকেন্ড টোলগেট ছাড়ার পরের বাইশ কিমি রাস্তা খুব খতরনক। আদিবাসীরা গাড়িতে ঢিল মারে। আপনি স্লো করলেই আপনাকে ঘিরে ফেলবে। আপনার কাছে যা আছে সব দিয়ে দিলেও হবে না। প্রথমেই আপনাকে মারবে। তারপর লুঠতরাজ। আমার গাড়িতেও একবার মেরেছিল। উইন্ডস্ক্রীণে দড়াম করে কি একটা এসে লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমি অ্যাকসিলারেটর প্যাডেলে ফুল চাপ দিয়ে দিলাম। ডানে বাঁয়ে তাকাই নি। তারপর থেকে আমার মা কসম খাইয়েছে সন্ধ্যের পর কখনও যেন না ফিরি উদয়পুর থেকে। আজকেও ফিরলাম ওই রাস্তা দিয়ে। তবে সন্ধ্যের আগে আগেই ওই স্ট্রেচটা পেরিয়ে চলে এসছি।
এইসব হতে হতে কালুভাইয়ার গাড়ি আবু ছেড়ে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার চলে এসেছে। এতক্ষণ আমার আর রায়ের কথা শুনছিলো মন দিয়ে। ফোন ছাড়লেই বললো, আরে, গাড়ির চাকায় ফলা মারে। হাওয়া বের হতে থাকে। রুখনে কে সাথ সাথ ঘের লেতা হ্যায়। পিটতা হ্যায় বহোত। আমার পরিচিত এক গাড়ির সঙ্গে হয়েছিল একবার।
এতটা চলে আসলাম আবু রোড ছেড়ে, কিন্তু কোনও ছোট গাড়ি দেখতে পেলাম না। না আসতে। না যেতে। শুধু লম্বা লম্বা ট্রেলার চলছে আরাবল্লীর এই ফোর লেন জুড়ে। আমরা মার খাবার হাত থেকে বাঁচতে থেমে গেলাম। একটা মোটেলের আকাশবিহীন বদ্ধ সুদৃশ্য ঘরে।

সকালে রেডি হয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি মোটেলের সামনে রাস্তা পেরিয়ে এক’শো আশি ডিগ্রি ভর্তি আরাবল্লী পর্বতমালা। গুরুশিখরের মাথার মন্দিরটা অব্দি দেখা যাচ্ছে। মুডটা ফ্রেশ হয়ে গেল। গভীর রাত অব্দি জেগে থাকার এনার্জি নিয়ে মোটেল ছাড়লাম। কালু ভাইয়ার স্পিডোমিটার নিমেষে এক’শো ধরে নেয়।
ছবিটা সেই আদিবাসী অধ্যুষিত বাইশ কিলোমিটারের কোনও এক জায়গা। গোগুন্দার আশপাশ হবে বোধহয়। একটু উপরে বাঁদিক ঘেঁসে একটা পায়েচলা রাস্তা সাপের মত এগিয়ে গেছে। ওই রাস্তা দিয়েই কি ছুটে এসে একটা মানুষ আর একটা মানুষকে মারে! এতো রাগ কেন ওদের সভ্যতার উপর, যে ছিনিয়ে নেবার আগে মারে। পরেও নিশ্চয়ই মারে। আমি অজান্তেই নিজের পিঠে হাত বোলাতে লাগলাম।
শকুন্তলা বললো, ওরা ভীল। এই ভীলদের উপরেই নির্ভর করতো রাজপুতদের কোন গোষ্ঠী ক্ষমতায় আসবে। সেনাবাহিনীতে প্রচুর ভীল উপজাতি ছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে এই রাণারাই ভীলদের হাত থেকে সব অধিকার নিয়ে নিতে থাকে। অরণ্যে শিকার করার অধিকার এদের হাত থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। সারা ভারতের আদিবাসীদের জঙ্গল থেকে আমরা সভ্য মানুষরা প্রয়োজনমত টেন্ডার ডেকে গাছ কেটে নিয়ে আসি, তাদেরই পাহাড় থেকে লৌহ আকরিক বের করে আনি, মাইনসে মাইনসে বড় বড় ক্রেন ডাম্পার পাঠিয়ে কেটে নিয়ে আসি মহার্ঘ মার্বেল ব্লক। ওরা আদিবাসীই থেকে যায়। সভ্য জনজীবনে টেনে নিইনা আমরা ওদের।

তাইই বোধহয় রাগে রাগে ছিনতাই করার আগে মেরে নেয়। লুঠতরাজ হবার পরেও মারতে থাকে। আর আমরা, সভ্যতার প্রতিনিধিরা, সন্ধ্যে নামার পরপরই রাস্তার ধারের কোনও অন্ধ আস্তানায় গুঁজে দিই নিজেদেরকে। বন্ধ হতে যাওয়া সরাইখানায় খাবারের অর্ডার দিয়ে পানশালায় ঢুকে যাই সেই কত জন্ম ধরে!
এইভাবেই আমরা তছনছ হবার হাত থেকে বেঁচে যাই ক্ষয়জাত আরাবল্লীর কোনও ভুবনভোলানো বাঁকের মুখে। বারে বারে, রাতের অন্ধকারে।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে