স্কুল থেকে পালিয়ে…

ইরাজ আহমেদ

আমার স্কুল পালানোর দিনগুলোতে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি আসতো।কখনো রৌদ্রে উজ্জ্বলও থাকতো। এখন এতোগুলো বছর পার হয়ে এসে মনে হচ্ছে, স্কুল থেকে পলাতক হওয়ার সেই ইচ্ছেটা ছিলো নেশার মতো। একবার চেপে বসলে আর রক্ষা নেই।আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এখন কি কেউ স্কুল পালায়?দুপুরের রৌদ্রে অজানা, অচেনা পথে বইখাতা হাতে খামোখাই ঘুরে বেড়ায়? দাঁড়িয়ে থাকে কোনো বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে কাউকে একবার দেখার জন্য? নাকি সে বৃষ্টির দিনে নিজের মনের কাছে রেইনি ডে‘র ছুটির দরখাস্ত ফেলে দিয়ে ভিজতে ভিজতে চলে যায় কোনো বন্ধুর বাড়ি? কোথায় হারালো সেইসব স্কুল পালানো দিন?

যতদূর মনে পড়ে আমি প্রথম স্কুল পালিয়েছিলাম অষ্টম শ্রেণীতে পড়তে। ছোটবেলা থেকেই স্কুলে যেতে চাইতাম না। টানা দুবছর কেটেছে গভীর কান্নাকাটির মধ্যে দিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো স্কুলবিমূখ সেই বালক আজো আমার মধ্যে রয়ে গেছে। সবকিছু থেকে পালাই পালাই একটা ভাব মনকে অস্থির করে মারে। সে যাক, ক্লাস এইটে স্কুল পালিয়ে কোথায় গিয়েছিলাম? গিয়েছিলাম স্কুলের পাশে এক মাঠে এক বন্ধুর ওষুধের শিশি ভর্তি করে আনা মদ্য চেখে দেখতে। কোনো অজ্ঞাত স্থান থেকে সামান্য একটু তরল চুরি করে নিয়ে এসেছিলো সে। কী খেয়েছিলাম, কেমন খেয়েছিলাম তা আজ আর মনে নেই। তবে সেই অবৈধ স্বাদ নেয়ার জন্যই আমার প্রথম স্কুল পালানো।

আমার স্কুল ছিলো ইউনিভর্সিটি ল্যাবরেটরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই স্কুল ভবন। তখন এই নগরে এতো মানুষের বসবাস ছিলো না। স্কুল পালানোতে ভয়ও ছিল। সহজেই চোখে পড়ে যেত স্কুলের পোশাক। আর অভিবাবকদের বেশীরভাগেরই পরিচিত ছিল বিভিন্ন স্কুলের ইউনিফর্ম।তবুও স্কুল পালানো বন্ধ হয়নি আমার। এক অদ্ভূত রোমাঞ্চ আর উত্তেজনায় ভরা সেই এক সময়। বাড়ি থেকে বের হয়ে স্কুলে যাবার নাম করে সারাদিন বাউন্ডুলেপনা করে ঘুরে বেড়ানো। সিগারেট খেতে শেখা, লুকিয়ে সিনেমা হলে ঢুকে পড়া, দলবেঁধে মারামারি করা, কোনো রেস্তোরাঁয় বসে খাওয়া। এসবের মাঝেই ছিলো অপার আনন্দ।

স্কুল পালানোর সময় বইখাতা অথবা স্কুলব্যাগ রাখার জন্য তখন সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিলো স্কুলের দেয়ালের পাশে শহীদের চায়ের দোকান। মাঝে মাঝে শহীদের ছোট্ট দোকানে আরো অনেক স্কুল পালানো বন্ধুদের এতো ব্যাগপত্র জমা হতো যে সে নিজেও আমাদের ওপর মহা খাপ্পা হয়ে যেতো। কারণ দোকানের ভেতরে তার নড়াচড়ার সামান্য জায়গাটাও দখল করে রাখতো আমাদের ব্যাগগুলো। মনের মধ্যে তখন শুধু বড় হয়ে ওঠার, অভিজ্ঞতা জড়ো করার প্রবল ইচ্ছা খেলে বেড়াতো। স্কুল পালিয়ে এক আকাশ স্বাধীনতাকে মনে হতো বিদ্রোহের ফলাফল। সত্যি কথা বলতে কী, ওই সময়ে স্কুল পালানোর খেলাটা আমার মনের বয়স বেশ অনেকটাই বাড়িয়ে দিয়েছিলো।

স্কুল থেকে পালানোর পর আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা ছিলো তখনকার বিৃটিশ কাউন্সিল এলাকা। ফুলার রোডের নির্জনতায় ফুটে থাকা বৃটিশ কাউন্সিল।সামনের রাস্তাটা ছিলো ভীষণ নির্জন।বহুসময় ওই নির্জন রাস্তার ফুটপাতে বসেও কেটেছে।  আমাদের বহু বন্ধুদের বাড়িও তখন ছিলো ওই ফুলার রোডে শিক্ষকদের কোয়ার্টারে। পালিয়ে গিয়ে আমরা দলবেঁধে আড্ডা দিতাম ওই এলাকায়। কোয়ার্টারের ভেতরের মাঠে ফুটবল খেলতাম। আরেকটু বড় হয়ে স্কুল পালিয়ে যেতাম আরেক বন্ধুর বাসায়। আমরা একই স্কুলে পড়তাম। স্কুলের পাশের পাড়া এলিফেন্ট রোডে সেই বন্ধুর বাড়ি ছিলো অভিবাবকহীন। ওর বাবা মা দুজনেই পিৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলেন ওর ছোটবেলায়। বন্ধুটি একাই থাকতো ছোটবেলা থেকেই। ওই বাড়িটা আমার মতো স্কুল পলাতাক আরো কয়েকজন কিশোরের জন্য ছিলো অভয়ারণ্য।তবে এলিফেন্ট রোডে আমাদের আরেক বন্ধুর বাসায়ও ছিলো আমার অবাধ যাতায়াত। ওই বাড়িতে অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয় জীবন পর্যন্ত আমি আড্ডা দিয়েছি। ওর ঘরটা ছিলো আমাদের ক্লাব।অনেক সময় এমন হতো সেই বন্ধু স্কুলে গেছে আর আমি পালিয়ে চলে গেছি ওর বাসায়।

সেই পলাতক কিশোরদের ছায়া এই শহরের গলিতে, রাজপথে এখন আমার খুব একটা চোখে পড়ে না।হয়তো বুঝতে পারি না কারা পলাতক আর কারা নয়।আর স্কুল পালানোর মতো ওসব অ্যাডভেঞ্চার বোধ হয় এখনকার প্রজন্মের কাছে অতোটা প্রিয় হয়েও উঠতে পারে নি। তাদের সব অ্যাডভেঞ্চার তো এখন সীমাবদ্ধ হাতের মোবাইল ফোনে। সেই অবৈধ আনন্দের স্বাদ খামোখাই মনের মধ্যে ঘুরপাক খাবে কেন?