চারশো বছর আগের একখানা পুস্তক

চারশো বছর আগের একখানা পুস্তক। কেউ সেই বইকে বলছেন ছদ্ম এপিক আবার কেউ বলেন প্রথম উপন্যাস। সে উপন্যাসের নায়ক এক উন্মাদ। সে লড়াই করে হাওয়াকলের বিরুদ্ধে, শত্রু ভাবে হোটেল বাড়িকে। কিন্তু তবুও সেই উপন্যাস আর উপন্যাসের এহেন নায়ককে নিয়ে কাফকা থেকে বর্হেস, পিকাসো থেকে দালি সবাই মুগ্ধ।

স্পেনীয় লেখক মিগুয়েল দ্য সেরভান্তেস লিখেছিলেন এই উপন্যাস…‘দ্য ইনজেনিয়াস নোবেল ম্যান স্যার কিহোতে অফ লা মানচা’। পৃথিবীর বুকে প্রায় চারশো বছর ধরে ১৯৫টা দেশের মানুষ এই উপন্যাস নিয়ে চালিয়েছেন নানা জল্পনা। ইংরেজিতে দন কিহোতে একদা ডন কুইকজোট হয়ে উঠলেও প্রকৃত নাম দন কিহোতে। দনের অলীক সব ব্যাপারস্যাপার যুগ যুগ ধরে উসকে দিয়েছে অস্তিত্বের গভীর গোপন অভিসন্ধি, খুঁচিয়ে দিয়েছে লুকনো অন্তর্ঘাতী চেতনা, খুঁড়ে বার করেছে চাপা-পড়া পালটে দেওয়ার স্বপ্ন, ঠেলে দিয়েছে লড়াকু অভিযানে, ভাবনায় ঘটিয়েছে বিপ্লবী বিস্ফোরণ, বা গোঁয়ার্তুমির বিরোধাভাস।সেরভান্তেসের উপন্যাস দু’ভাগে বিন্যস্ত। প্রথমটি প্রকাশিত হয় ১৬০৫ সালে এবং দ্বিতীয়টি ১৬১৫-তে। সেই প্রকাশকাল থেকে আজ পর্যন্ত এই উপন্যাস ঘিরে নানা পাঠ ও নানা বিশ্লেষণ চলেছে। দনকে ঘিরে যে রহস্যের উদ্ভব হয়েছে, ৪০০ বছর ধরে ঘনীভূত হওয়ার পরেও তার কোনও একমুখী কিনারা করা যায়নি।হয়তো যাবেও না। কারণ মহৎ শিল্পের এটাই অন্যতম শর্ত।

হ্যারল্ড ব্লুম-এর মতো সাহিত্যতাত্ত্বিক কী বলেছেন দন কিহোতেকে নিয়ে? তিনি বলেছেন, ‘দন কিহোতে’ এমন এক বৈপ্লবিক উপন্যাস যা ধ্বংসতত্ত্ব এবং নৈরাজ্যবাদকে উসকে দেয় এবং এটি হল প্রথম আধুনিক ‘নভেল’। খুব সংক্ষেপে যদি বলা যায়, গল্পটা এক জন কল্পনাপ্রবণ সাধারণ গ্রাম্য মানুষকে নিয়ে যার নাম আলন্সো কিহানা। দিনের পর দিন মধ্যযুগীয় নাইটদের বীরত্বের কাহিনি পড়তে পড়তে একদিন ভাবতে শুরু করে দিলেন যে তিনি নিজেই এক জন নাইট, অর্থাৎ ন্যায়রক্ষাকারী যোদ্ধা। তারপর সেই ভাবনার মেঘে শরীর ভাসিয়ে দিয়ে এক দিন বেরিয়েও পড়লেন ঘোড়া নিয়ে। নিজেই নিজের নাম দিলেন— দন কিহোতে। তার বাহন হলো বাতরোগে ভোগাএক ঘোড়া, যার নামকরণ হলো রসিনান্তে। শুধু ঘোড়াতেই থেমে থাকলেন না দন। আসল নাইটদের মতো জোগাড় করে নিলেন এক জন পার্শ্বচর বা সহকারীকেও। এক জন সাধারণ গৃহস্থ এবং অশিক্ষিত মানুষ। সেও বিশেষ কিছু না বুঝেই পথে নেমে পড়লো দনের সঙ্গে। পড়ল। তার নতুন নাম হল সানচো পানসা।

শুরু হয়ে গেল তাদের কাল্পনিক আর খামখেয়ালী অভিযান। সত্যিকারের জগতের কোনও কিছুই তাদের আর সত্যি বলে মনে হচ্ছে না। যা কিছু বর্তমান, ঘটমান, সব কিছুই বদলে যাচ্ছে এক কল্পজগতে, এক মনগড়া অবাস্তবে। দনের চোখে সরাইখানা হয়ে যাচ্ছে দুর্গ, সাধারণ এক পরিচারিকা আলদনসা তার কল্পনায় বদলে হয়ে যাচ্ছে মহীয়সী আরাধ্যা প্রেয়সী দুলসেনিয়া। সে যেন সুকুমার রায়ের ছড়ার ভীষণ এক কল্পনার জগত, যতো ‘ননসেন্স’ কাজকারবার। আর এসব কল্পনার ধারাবাহিকতায় পরে দনের কাছে হাওয়াকলও হয়ে ওঠে এক ভয়ংকর দৈত্য? তার পর সেই হাওয়া কলের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে নাস্তানাবুদ অবস্থা।

শেষে তার ভাইঝি, স্থানীয় পাদ্রি এবং নাপিত সবাই মিলে হস্তক্ষেপ করে তার পাগলামিতে। তাকে ধরেবেঁধে বাড়ি নিয়ে আসে। বাড়ি ফিরে তারা জানতে পারে সব নষ্টের মূলে হল লাইব্রেরির সব রূপকথার ছাইপাঁশ বই আর শৌর্য-বীর্যের আজগুবি উপাখ্যান। তখন তারা সেই বই পোড়াতে শুরু করে। নৈতিকতা, যৌক্তিকতার ধারক ও বাহক পাদ্রিমহাশয় হলেন এই অগ্নিযজ্ঞের প্রধান হোতা। বইয়ের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় এভাবে পরাবাস্তবতা অথবা যাদু বাস্তবতার ছোঁয়া দিয়ে লেখক সেরভেন্তেস এক ‘বীভৎস মজার’ আলেখ্য রচনা করেছেন। বই পোড়ানোর প্রসঙ্গে মনে পড়ে গত শতাব্দীর সেই সব নারকীয় অধ্যায়, যখন স্বাধীন চিন্তাকে ধ্বংস করতে বই পোড়াতে হয় বা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হয়। জানতে ইচ্ছে হয়, ফ্যাসিবাদীরাও কি এই উপন্যাস থেকে পাঠ নিয়েছিলো?

‘দন কিহোতে’ উপন্যাসে এই উন্মাদ নায়কের উদ্ভট কর্মকান্ডের ছদ্মাবরণে গেঁথে দেয়া হয়েছে ব্যাঙ্গের তীব্র আয়োজন। শ্লেষ তরবারির মতো ধারালো হয়ে উঠেছে। কিন্তু পাশাপাশি রয়ে গেছে বিষাদের চোরাটান। গ্যালিলিও পরবর্র্তী সভ্যতা সব কিছুর পিছনে তখন যুক্তি খুঁজছে। ঈশ্বর এসে দাঁড়িয়েছে এক জটিল প্রশ্নের সামনে। মানুষ তখন তার চারপাশের পৃথিবীকে ব্যাখ্যা করতে পারছে না, চিনতে পারছে না নিজেকেও। সেরভান্তেস সেই অনিশ্চিত, অনির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই তাঁর নায়ক করছেন, যে নায়ক সময়ের এই বিশেষ লগ্নে বুঝতে পেরেছে, তার জীবনে আর ধ্রুব বলে কিছু নেই। আছে অবাধ স্বাধীনতা। তাই দন বেরিয়ে পড়েছে অভিযানে, সব কিছু যেখানে সম্ভব। দন কিহোতে যেন গোটা পৃথিবীর বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ ঘোষণা করছে। কল্পনাই তার অস্ত্র।

পরবর্তী কালের নাটক, সাহিত্য, চিত্রকলা, সংগীত, চলচ্চিত্র থেকে দর্শন, উত্তর-আধুনিক চিন্তা, সাহিত্যতত্ত্ব, বৈপ্লবিক দর্শন— সব কিছুর ওপর এই উপন্যাস প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে।   কার নাম বাদ যাবে তালিকা থেকে? কিয়ের্কেগার্ড, ফ্লব্যের, দস্তয়ভস্কি, গ্রাহাম গ্রিন, টেনেসি উইলিয়ামস, বর্হেস, কাফকা, রুশদি, ফুকো, স্ট্রাউস, মেন্ডেলসন, পিকাসো, দালি, অরসন ওয়েলস— এঁরা সবাই সরাসরি দনকে নিয়ে কাজ করেছেন, শোপেনআওয়ারের মতো দার্শনিকও এই বইকে পৃথিবীর সেরা চার উপন্যাসের তালিকায় রেখেছিলেন। সবাই সেই নায়ককে বলছেন পাগল, কিন্তু সেই উন্মাদনার জয়গান গাইছেন, খ্যাপামিকে দিচ্ছেন পরম মান্যতা। এই পাগলামো থেকেই জন্ম নিয়েছে যত বিরোধী ভাষ্য, রুখে দেওয়া চিন্তন, লড়াকু ছবি, দিনবদলের কবিতা। আর এই উল্টো দেখার ভঙ্গীই হয়তো মানুষের ভাবনার জগতে বপন করে দিয়েছে অন্তর্ঘাতের গূঢ় সঙ্কেত।

কল্পনা, সাহিত্য, সংবাদ, স্বপ্ন, সবই এই উপন্যাসের দৌলতে একাকার। চে গুয়েভারা তাঁর বাবা-মা’কে লিখেছিলেন, ‘আবার আমার গোড়ালিতে রসিনান্তের (কিহোতের ঘোড়ার নাম) পাঁজরের অস্তিত্ব টের পাচ্ছি। আবার এক বার, আমি রাস্তায় নেমেছি, আমার হাতে ধরা ঢাল।’ এই বলে বলিভিয়ার জঙ্গলে চলে গিয়েছিলেন বিপ্লব করতে। সেইখানেই চে ধরা পড়েন এবং তাঁকে হত্যা করা হয়। দন কিহোতে যেমন সাধারণ মানুষকে দিয়েছে গোপন কল্পনার উড়ান, তেমনই বিপ্লবীকে দিয়েছে অনুপ্রেরণার ভাষা। তাই চে বলতে পারেন, ‘…যুদ্ধে জেতা বা হারা বড় কথা নয়— লড়াই করেছি… শত্রুর বিরুদ্ধে।’ পাশাপাশি চারু মজুমদার ‘নকশালবাড়ির শিক্ষা’-য় লিখছেন, ‘যে নিজে স্বপ্ন দেখে না এবং অন্যকে স্বপ্ন দেখাতে পারে না, সে বিপ্লবী হতে পারবে না।’ তাই চারশো বছর পরেও দন এত জ্যান্ত, এত প্রাসঙ্গিক। মিলান কুন্দেরার কথার সঙ্গে মিলিয়ে তাই বলতে হয়, ‘উপন্যাসটি আমাদের শিখিয়েছে কী ভাবে এই পৃথিবীকে বুঝতে হয় প্রশ্ন দিয়ে।’

নিয়াজ আহমেদ

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা

ছবিঃ গুগল