অতিমাত্রিক

সাব্বিরুল হক

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

ধড় আলাদা করা জীবন্ত শরীর ছুটে আসছে এদিকে। এবার কেঁপে উঠল অন্তরাত্মা । একে তো অন্ধকারের আলোয় আবছা, তার ওপর তীব্র আর্তনাদের রেশ শেষ হয়ে যায়নি। এই অবস্থায় কি করব ঠিক করার আগে বিশাল খিলান আর ধ্বংসে পড়া ইট সুরকির দেয়াল ভেদ করে চলে আসে মুন্ডুহীনটা । কোথা থেকে ডেকে ওঠে একটা তক্ষক তীক্ষ্ম স্বরে । ভূ-কম্পনটা আবারও অনুভব করতে থাকলাম পায়ের নিচে। কাঁপা হাতে ক্যামেরা তাক করে ছবি তোলার ফাঁকে-ফাঁকে দৌঁড়ুতে শুরু করলাম দিকবিদিক। কোনদিকে ছুটছি আমি জানিনা। মুন্ডুহীন ধড়টাও লক্ষ্য করলাম ছুটে চলেছে। উর্ধশ্বাসে একটানা দৌঁড়ুতে গিয়ে হাঁপ ধরে গেল আমার। আর্তনাদের শব্দ কানে এল আবারও। বাতাস বন্ধ হয়ে গেছে একেবারেই। আমি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি এরই মাঝে। অনুভূতি লোপ পেয়ে গেছে আমার। এবার ফ্লাশ লাইট জ্বেলে সামনে বাড়িয়ে দিয়ে অবাক হয়ে নিজেকে আবিস্কার করলাম প্রাচীন এক বধ্যভূমিতে। গভীর কূপ, একটা বেদী আর ফাঁসির মঞ্চ পেতে রাখা হয়েছে। কূপের পাশের বেদীতে কি হত ? বেদীর পাশেই ধারাল তলোয়ার আর খঞ্জরের সারি দেখে হাত পা জমে ঠান্ডা হয়ে এল আমার।

মনে পড়ল রেষ্ট হাউসের সেই ম্যানেজারের হুসিয়ারী।রাজবাড়ির বেদীতে নরবলি দেয়া হতো প্রায়ই। আনুষ্ঠানিকভাবে। কোপ দিয়ে মাথা আলাদা করে ফেলে দেয়া হত কূপের ভেতরেই । আর সহ্য হলোনা আমার। সর্বশক্তিতে ছুটে চললাম সামনে । হোঁচট খেয়ে দৌঁড়ে যেতেই পা হড়কালাম। হুমড়ি খেয়ে তাল সামলে দ্বিতীয় চেষ্টায় শরীর সোজা রেখে হান্ড্রেড মিটার হার্ডলস দৌঁড় দিলাম। ভেজা পিচ্ছিল মাটিতে আছাড় খাওয়ার আগেই দেখতে পেলাম জৈন্তা রেষ্ট হাউসের উঁচু সিঁড়িঘর, মিটমিট করে জ্বলতে থাকা আলোর বাতি।

এগারো
ম্যানেজার আমাকে দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল কাজে। টেবিল ভর্তি কাগজপত্র, খাতা আর বাঁধানো মলাটের কতগুলো বই ছুড়ে ফেলতে লাগল মেঝের উপরে। মেঝের নিচের দিকটা মনে হলো ফাঁকাই। আর বই খাতা-পত্রের ওজন মনে হলো  ভারী। মেঝেতে পড়ে আওয়াজ করলো অদ্ভুত ধরনের। কাঁচের একটা জগ সরাতে গিয়ে ফেলে দিল নিচে। অবাক হয়ে দেখলাম ভাঙ্গল না জগ। আমি বললাম, ‘ম্যানেজার সাহেব আমি এসেছি।’
‘তা তো দেখতেই পাচ্ছি।’
ব্যস্ততা কমল না। কিংবা কমাতে চাইল না ম্যানেজার। বিরক্তি অথবা অবহেলার কারণ বুঝতে পারলাম না তার।
‘আমার ব্যাগ ছিল একটা। দিয়ে গেছিলাম আপনার কাছে।’
‘তাই নাকি । কবে ?’
‘আপনি কি ভুলে গেলেন গত কালকের কথা ?’
‘গতকাল ?’ অবাক হল যেন সে,‘ গতকাল কি দিয়ে খেয়েছি, আজকে কি সেটা স্মরণ করার বিষয় ?’
‘না, গবেষণার বিষয়।’ রাগ লাগে আমার। লোকটা কি জৈন্তারাজ নাকি? গালি দিতে ইচ্ছে হয়। অসভ্যতা হয়ে যায় তাই দেই না। ঠিক করি পরে দেব। প্রয়োজনে লাথিও দিতে পারব ওর পেছন দিকে ঠিকই।
‘ভাইজান আপনি কোথা থেকে এসেছিলেন ? অনেকটা সময় পরে জানতে চায় সে,‘ গিয়েছিলেন কোথায় ? রাজবাড়ি দেখতে ?’
‘না ভাইজান, বিয়ে খেতে।’ ভেংচি কেটে দিলাম ব্যাটাকে। পরিবর্তন দেখলাম না তাতে।
‘আরে ক্যামেরা আছে দেখছি! তা কিছু ছবি-টবি কি তুলেছেন ক্যামেরা দিয়ে ? দেখিতো ভাইজান, দেন ক্যামেরাটা।’
‘আগে ব্যাগ ফেরত দেন।’
‘দেবো তো ভাইজান। ক্যামেরা দেখি। ছবি তুলতে পেরেছেন ?’
‘কিসের ছবি তুলতে পেরেছি ?’
‘দেহাতীতের ছবি, জৈন্তারাজের ছবি….।’ কি সব বকতে লাগল লোকটা ।
‘হ্যাঁ, তুলেছি ছবি।’
উত্তর শোনে এক মূহুর্ত অপেক্ষা করলনা। ক্যামেরা ছিনিয়ে নিল আমার কাছ থেকে। আটকাতে পারলাম না। দ্রুত দক্ষহাতে ক্যামেরা চালু করে রিভিউ দেখতে শুরু করল সে আমার তোলা ছবির।
‘কই, নাই তো কিছুই’, জানাল সে,‘ কতগুলো ভাঙ্গাচোরা ধ্বংসস্তুপের ছবি আর মেগালিথিক পাথর….
ক্যামেরা ফিরিয়ে দিল সে। আশ্বস্ত দেখাল তাকে। আমি কথা না বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম ক্যামেরা হাতে। দেরাজ খুলে আমার হ্যাভারসেক ব্যাগ বের করে দিল সে,‘আমার নাম মনে আছে ভাইজানের ? জানতে চাইল লোকটা। চোখের দৃষ্টি তীব্র হয়ে উঠেছে ওর।

ক্যামেরার ছবিগুলো দেখতে লেগে গেছি ইতোমধ্যে। এক এক করে প্রতিটা। একবার স্লাইড শো দিলাম। জুম করে ফুল-স্ক্রীন ইমেজে দেখে চললাম রাজবাড়ির বিধ্বস্ত ভবনের সেই সময়টুকুর ছবি। যখন ঘুরপাক খাচ্ছিলাম পুরাকীর্তির ভেতরে। আর বারবার ম্যানেজারের নামটা মনে করার চেষ্টা করেছি অথচ মনে আসেনি একবারও।
‘আমার নাম কালি সিংহ। জৈন্তারাজ ইন্দ্র সিংহের বংশের লোক। এবার মনে পড়েছে ভাইজান… ?’
হতবাক হয়ে দেখলাম আমার তোলা ছবিগুলোর একটাতেও দেহাতীত কোনোকিছু নেই। নেই অশরীরী মূর্তির ছায়া, না কোনো নরমুন্ডুহীন দেহ ! অপার্থিব কিছুই নেই ছবিতে, যেন ছিলই না কোনোকালে।

বারো
অতীন্দ্রিয় অভিযান শেষ হয়নি। প্রথম অভিযাত্রার দ্বিতীয় শুরু এটা। এ এক রুদ্ধশ্বাস, দেহাতীত, অপার্থিব আর অজাগতিক অভিযাত্রা। অতীন্দ্রিয় অভিযাত্রা শত বছরের পুরোনো জরাজীর্ণ ভবনের প্রেতচ্ছায়ায়। প্রাচীন বটবৃক্ষের পাতায় ঝুলে থাকা কালো বাদুড় দেখায়। সাগরদীঘির কিম্ভূত প্রাণী কিংবা পাহাড়ি সমতলে ঘুরে বেড়ানো অশরীরীর ব্যাখ্যায়। বা হয়ত হাজার বছরের পুরাকীর্তির অভ্যন্তরে লেগে থাকা শাপ-শাপান্তের সত্যতা নিরূপনে। এ আমার রোমাঞ্চের নেশা। রহস্য উদঘাটনের অভিপ্রায় । আর এ্যাডভেঞ্চারের অভিলাষ। বেরিয়ে পড়ার তাড়া আবারও ডাকবে আমাকে হাতছানি দিয়ে । কেনো না ছুটে চলার শুরুটাই শেষ হয়নি আমার এখনও। শেষ