এসব ভবনে শোনা যায় ইতিহাসের ফিসফিসানি

স্মৃতি সাহা

শতবর্ষী একটি বাড়ি। পলেস্তারা খসে পড়া দেয়ালগুলোতে আসর জমেছে সবুজ শ্যাওলা। বট, পাকুরের নিরবিচ্ছিন্ন আখ্যানে যেখানে সময়ের পেন্ডুলাম থমকে যায়। দেয়ালের খাজে কিছু কপাটবিহীন দেয়াল আলমারিতে মাকড়সার জাল বোঁনা আছে যত্ন করে। চিলেকোঠার ঘরে চড়ুই পাখির এক বাড়ন্ত সংসার। বেশ কয়েকবার মালিকানা বদল করে একসময় পরিত্যক্তের রাজটিকা কপালে জোটায়। শতাব্দী প্রাচীন বাড়িগুলোর খুব পরিচিত ছবি এটা আমাদের চোখে। “নিউইয়র্ক” নামটা উচ্চারিত হবার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অসংখ্য আকাশচুম্বী অট্টালিকার সুরম্য আসর, কংক্রিটের অনবদ্য কথন, আধুনিকতার নিত্য কাব্য। এমন শহরে শতাব্দী প্রাচীন ভবনগুলোর ছবিটা ঠিক কেমন তা যেন শত চেষ্টাতেও আঁকা যায় না। ‘প্রতি দশ বছরে রিবিল্ড’ থিউরি বেশ জনপ্রিয় থাকার পরেও এএখানে সপ্তদশ শতাব্দীতে নির্মিত ভবনের দেখা পাওয়া সত্যিই চমকে দেয়। এসব বাড়ির ধুলোর আস্তরণে লুকিয়ে আছে ইতিহাসের এক একটি অধ্যায়, রোদের সুজনীতে কালের অনাবিল কলতান। উইকফ্ ফার্মহাউজ মিউজিয়াম নাম এখন। ১৬৫২ সালে পিটার ক্লাসেন উইকফ্ স্ত্রীসহ আলবেনিল্যান্ড থেকে ব্রুকলিনে স্থানান্তরিত হন।

উইকফ্ ফার্মহাউস

সেখানে তাঁরা এক কক্ষের ফার্মহাউস তৈরী করেন। আর এখানেই তাদের ১১ সন্তানের প্রতিপালন করেন। বেশ অনেক সময় পরে এই বাড়িটি মিউজিয়ামে রূপান্তরিত হয়, যেখানে ডাচ কৃষকদের জীবনযাত্রার একটি সুস্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়।

২৭৫ বছরের আরেক পুরনো বাড়ি জ্যান মার্টেনস্ স্ক্যাঞ্চক্ হাউজ। পুরাতন ফ্ল্যাটল্যান্ডের মিল বেসিন সেকশনে অবস্থিত এই প্রাচীন ভবনটি। দীর্ঘসময় স্ক্যাঞ্চক্ পরিবার বংশানুক্রমিক ভাবে ভবনটির মালিকানা ভোগ করলেও ১৯৫২ সালে ভবনটির নকশায় কিছু বদল এনে ব্রুকলিন মিউজিয়াম একে অধিগ্রহণ করে। তবে ২০০৫ সালে এই নতুন নকশা সরিয়ে পুরাতন আদল ফিরিয়ে দেওয়া হয় ভবনটির। টিপিক্যাল ডাচ হাউজের সেই সময়কে ধারণ করে এখনো দণ্ডায়মান শতাব্দী প্রাচীন ভবনটি।
১৭১৯ সালে, জোহান্স লট একটি ফার্ম ক্রয় করে এক কক্ষের একটি ভবন নির্মাণ করেন যা অনেকটাই ‘উইকফ্ হাউজ’ এর আদলে তৈরী। ১৭৭০ সালে জোহান্সের এক উত্তরাধিকারী হ্যান্ড্রিক এই ফার্মহাউজের অংশ বর্ধিত করেন। আর এই বর্ধিত অংশ ছিল প্রায় ২০০ একর জমি। বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত লট্ বংশ এই ফার্ম হাউজের মালিকানা ধরে রাখে, ১৯৮৯ সালে এই লট্ বংশের সর্বশেষ উত্তরাধিকারী মারা যান। এরপর থেকে “সিটি পার্ক ডিপার্টমেন্ট” এই ভবনটি অধিগ্রহণ করেছে।

আব্রাহাম রিকার হাউজ

১৬৫৪ সালে আব্রাহাম রিকার সেই এক কক্ষ বিশিষ্ট ফার্ম হাউজ নির্মাণ করেন নিউইয়র্কের কুইন্সে। আব্রাহাম রিকার নিজ দেশ নেদারল্যান্ডস্ এ ফেরত গেলে ভবনটির মালিকানা পায় মাইকেল, ম্যারিয়ন ডাকওয়ার্থ স্মিথ। এই স্মিথ ফ্যামিলি ১৯৭৫ সাল থেকে খুব যত্নের সঙ্গে এ ভবনের সাবেকীয়ানা অপরিবর্তিত রেখেই মালিকানা ধরে আছে। কলোনিয়াল স্থাপত্যের এক আদর্শ উদাহরণ হলো ঐতিহাসিক “রিচমন্ড টাউন” এর সপ্তদশ, অষ্টাদশ আর উনবিংশ শতাব্দীর ভবনগুলো। যদিও এর অধিকাংশ ভবন সরকারী নির্দেশে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবার পরেও কিছু অবশিষ্ট থেকে গেছে কালের সাক্ষী ধরে রাখতে। তেমনই একটি ভবন ‘ব্রিটন কটেজ’। ফিল্ড ষ্টোন আর কাঠের তৈরী ভবনটি স্থাপিত হয় ১৬৭০ সালে। ১১ই সেপ্টেম্বর ১৭৭৬ সালে যদি কিছু ঘটনা অন্যরকম হতো,তবে আমেরিকার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। সেই দিন বেঞ্জামিন ফ্রেংকলিন, এডওয়ার্ড রুটলেডজ্ এবং জন এডামস্ শান্তি আলোচনায় বসেছিলেন লর্ড রিচার্ড হৌ এর সঙ্গে। যে ভবনে এই শান্তি আলোচনা হয়েছিল সেই ভবনটিও কিন্তু শতাব্দী প্রাচীনের তকমা নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। ১৬৮০ সালে ক্রিস্টোফার বিলপ, একজন জাহাজ ক্যাপ্টেন এই ভবনটি নির্মাণ করেন। সময়ের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এসব ভবনে কান পাতলে শোনা যায় বাতাসে ইতিহাসের ফিসফিসানি, চোখের কার্ণিশ ডিঙিয়ে মনে চলতে শুরু করে সহস্র দিন পুরানো সেই সময়ের চালচিত্র যাতে অভিনয় করতে থাকে খুব সত্যি হয়ে থাকা সেই সময় আর তাকে অতিবাহিত করা পাত্র-পাত্রী।

ছবিঃ গুগল