আমার পয়লা বৈশাখ

অদিতি বসু রায়

( কলকাতা থেকে) : দিব্যি সেলের বাজার, বছরের গোড়ায় পান্তা ভাত-শুঁটকি মাছের লাঞ্চের প্ল্যান- তার মাঝে এসে পড়ল আসিফা। আর্লি সামারের নাইটমেয়ার। আমরা হেলমেটহীন বাইক চালাতে চালাতে গুগল করে জেনে নিলাম গোটা ব্যাপারটা। গাড়িওয়ালারা সিটবেল্ট বাঁধতে ভুলে যায় বটে কিন্তু হোয়াটসঅ্যাপ দেখতে ভোলে না। বিয়ার খেয়ে রাজারহাটে গাড়ি ছোটাতে ছোটাতে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা চললো। দিল্লিতে রেপিস্টদের সমর্থনে মিছিল বের হয়ে গেল। আমাদের মতো কোটি কোটি গাধার বাচ্চাদের সামনে ‘ধর্ম’ নামের মূলো ঝুলিয়ে দিল রাজনীতি। হিন্দু মন্দিরে ধর্ষণ করেছে মুসলিম শিশুকন্যাকে – চল হিন্দুগুলোকে পেটাই। ওদিকে মুসলমানরা জ্যান্ত পুড়িয়েছে মহল্লা – হিন্দুপাড়ায় আগুন দেওয়া অবশ্য কর্তব্য। কেন? কেন? কেন সমস্ত অপরাধকে এভাবে ধর্মের মোড়ক দেওয়া হচ্ছে বুঝতে পারছি না আমরা? বোঝাবুঝির বখেরার আজকাল আর কে যায় ভাই? আমাদের বোধ নেই, বীর্য আছে।
আট বছরের শিশুকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অভুক্ত রেখে ইলেকট্রিক শক দিয়ে লাগাতার গণধর্ষণ করে যারা খুন করে পাথরে থেঁতলে, তারা দুনিয়ার কোনও ‘ধর্মের’ আওতায় পড়তে পারে না। তাদের জন্য কোনও শাস্তিই যথেষ্ট নয়। আর এই সব শিশ্ন-সর্বস্ব প্রাণীদের সমর্থনে যারা রাস্তায় নামে তাদের গুলি করে প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে দেওয়া উচিত। আমরা এসব কেবল দেখি, বুঝি না , রাজনীতি সেটা জানে। তাই সে আরো পথ গুলিয়ে দিতে এসে হাজির হয়। দিল্লির দরবারে যে সব মানুষের মতো চেহারার জনপ্রতিনিধিরা আছে তারা খুব ভাল জানে , আমরা আদতে বোধহীন ভারতবাসী। তাই তারা মন্দিরের সামনে বোমা রাখে। মসজিদে বুলেট নিয়ে লোক ঢুকিয়ে দেয়। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে দেখে, খেলাটা জমে গেছে। আমরা আবার এদের ভোট দি। ধর্মের আফিম খাই স্বেচ্ছায়। গেরুয়া রঙের চাদর গায়ে দিয়ে নিঃস্বতর হতে থাকি। অন্তর্যামী মসনদ জানে , আমরা ভুলে যাই সব। আমরা ক্ষমা করে দি নোটবন্দীর কালের শত গরীব মানুষের রাস্ট্রীয় হত্যাকে। ভুলে যাই, মাংস বিক্রেতার খুনের কথা। ভুলে যাই, একটা গোটা ট্রেনভর্তি লোককে পুড়িয়ে মারার কথা। ওরা জানে, আমরা আসিফার কথাও ভুলে যাব। পয়লা বৈশাখে হাজার টাকা খরচ করে ইলিশ খাব। টিভি ক্যামেরার সামনে দাঁত কেলিয়ে বলবো, ” বাংলা ইয়ারটা জাস্ট ভুলে গেছি। বাই দি ওয়ে, ফার্স্ট বৈশাখে কিন্তু আমাদের সৃজিতের মুভি দেখা মাস্ট।ড্যাড, মম , ওয়াইফ-সব্বাইকে নিয়ে যাই। আর আপনাকেও হ্যাপি ফার্স্ট বৈশাখ জানিয়ে রাখলাম ইন আডভ্যান্স।”

ছবি : গুগল