বিষয় বাসনা

লালন ফকির গান বেঁধেছিলেন, ‘আমার মনের বাসনা, আশা পূর্ণ হলো না’।কী সেই আশা, কী সেই বাসনা? লালনের গান অমর হয়ে আছে। কিন্তু সেই আশা আর বাসনার অতলে কি মানুষ যথাযথ আলো ফেলে দেখতে পেয়েছে প্রকৃত অবয়ব? মানুষের মনের বাসনা কি কখনো পূর্ণ হয়?অতৃপ্তি দানব সেজে তাকে শুধু তাড়া করে ফিরেছে কাল থেকে কালে, যুগ থেকে যুগে। সব মানুষের গল্প একই।
গ্রীক পৌরাণিক চরিত্র ইকারুস ডানা মেলে আকাশে উড়তে চেয়েছিলো। সে ওড়ার স্বপ্ন তার সফল হয়নি। ইকারুস উড়তে উড়তে এক সময় সূর্যের কাছে যেতে চেয়েছিলো। সূর্যকে জয় করার বাসনা তৈরী হয়েছিলো তার মনে। কিন্তু মোম দিয়ে তৈরী ইকারুসের সেই ডানা গলে গিয়েছিলো সূর্যের উত্তাপে, পতন ঘটেছিলো ইকারুসের। বাসনা, আকাঙ্ক্ষার তীব্র আগুন মনুষ্য জনমকে এভাবেই জ্বালিয়ে মারে, তাড়া করে। মানুষ ছুঁতে চায় তার বাসনার ফিনিশিং টেপ। কিন্তু পারে কি?প্রেম, কামনা, যৌনতা, ক্ষমতা আর বিত্ত মানুষের মনের ভেতরে যে বাসনার আগুন জ্বালিয়ে দেয়, আকাঙ্ক্ষাকে উসকে দেয় তার নির্বাণ ঘটে না। আর নির্বাণ ঘটে না বলেই বাসনা মানুষকে ঠেলে দেয় ইকারুসের পতনের মতো বিপত্তির দিকে
বাসনা বা আকাঙ্ক্ষার তৃপ্তির পরিমাপ করা খুব কঠিন কাজ। লোভই বলি আর বাসনাই বলি ব্যারোমিটারের পারদ কেবল উপরেই উঠতে থাকে। কখনো মানুষ নিজেও তা বুঝতে পারে না।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনের বিষয়, বাসনা। মানুষের মনের খুব গোপন অঞ্চলে তৃপ্তি, অতৃপ্তির ওপর খানিকটা আলো ফেলে দেখা।
উইলিয়াম শেক্সপীয়ার মানুষের মনের বাসনাকে এক ধরণের উন্মাদনা বলে চিহ্নিত করেছেন।দার্শনিক শোপেনহাওয়ার আরো এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, মানব চরিত্রকে শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে বাসনা।শেক্সপীয়ারের কথায় আবার ফিরে এলে কি এভাবে বলা যায়, বাসনার মতো এক ধরণের উন্মাদনা মানুষের চরিত্রের নিয়ন্ত্রণ দখল করে আছে? প্রশ্নটা করা যতো সহজ উত্তরটা ততো সহজ নয়। ইতিহাসের দিকে ঘুরে তাকালে দেখতে পাই রোমান সাম্রাজ্যে ক্ষমতার লড়াই। সে লড়াই তো ক্ষমতা ভোগের বাসনা ছাড়া আর কিছু নয়।তবে সেই ক্ষমতা দখলের বাসনাকে পেছন থেকে কখনো কখনো নিয়ন্ত্রণ করেছিলো নারী এবং যৌন সম্ভোগের পিপাসা। হোমারের ইলিয়াড মহাকাব্যের কাহিনীতে সেই বিখ্যাত যুদ্ধ তো শুরুই হয়েছিলো নারীকে দখল করার, তার ভালোবাসা পেতে চাওয়ার বাসনাকে কেন্দ্র করে। যুবরাজ প্যারিস অপহরণ করেছিলো ট্রয় রাজ্যের অনিন্দ্য সুন্দরী হেলেনকে। আর সেই প্রণয় বাসনার আগুনে শেষ পর্যন্ত পুড়ে ছাই হয়েছিলো ট্রয় নগরী। এমন বাসনার গল্প বলে ইতিহাস। মিশরের রাণী ক্লিওপেট্রাকে ভালোবেসে রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসন হারিয়েছিলেন মার্ক অ্যান্টনি।
তবে বাসনার সঙ্গে যৌন সম্ভগের পিপাসার গভীর যোগসূত্র আছে। অন্তত গবেষকরা তাই বলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ব্ল্যাকবার্ন বাসনাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, এ হচ্ছে মানব মনের এক তীব্র চাওয়া যা শরীরকে ঠেলে দেয় যৌনতার দিকে। এই তীব্র চাওয়াকেই আমরা নাম দিয়েছি কামনা। কিন্তু কামনা থেকেই কি কাম চরিতার্থ করতে উদ্যত হয় মানুষ? বাংলাদেশে ভয়ঙ্কর ভাবে ধর্ষণ বেড়ে যাবার একটি অন্যতম কারণও বোধ হয় এই বাসনা। নিজের ভেতরে লুকিয়ে রাখা উদগ্র শারীরিক চাহিদা সমস্ত নীতি-নৈতিকতাকে ভেঙ্গে বের হয়ে আসে। আক্রমণ করে নারীকে। নারীকে শারীরিক শক্তিতে পুরুষের নিজের দখলে আনার বাসনাটি অনেক প্রাচীন। তাই হয়তো বাসনার কথা উঠলেই তার সঙ্গে জড়িয়ে যায় যৌনতা। কিন্তু বাসনাতো কেবল যৌনসম্ভোগ নয়। বিত্ত বাসনাও মানব চরিত্রের আরেকটি দিক। পৃথিবীতে সম্পদ আহরণের জন্য মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে। আজো সেই মরিয়া অবস্থার মৃত্যু ঘটেনি। আর তাই আমরা দেখতে পাই দেশে দেশে যুদ্ধ, রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগ। ভারতবর্ষকে দুই‘শ বছর শাসন করেছিলো বৃটিশরা। এই অবৈধ কর্মের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ক্ষমতা আর সম্পদের লুন্ঠন। সম্পদের লোভ অথবা বিত্ত বাসনার বিষয়টাকে যদি ব্যক্তিগত পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায় তাহলেও দেখা যায় মানুষের লোভ সবসময়ই তাকে ঠেলে দিয়েছে সংঘাত আর বিপর্যয়ের দিকে। মানুষের বিত্তবাসনার শেষ অধ্যায়টা কখনোই সহজ অক্ষরে লেখা যায় না।
অনেকে অবশ্য প্রেম আর বাসনাকে এক পাল্লায় তুলে বিষয়টা ঘোলাটে করে তোলে। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শরীর বাসনা আর প্রেমের মাঝে ফারাক আছে। শুধুই শরীর যখন জেগে ওঠে তখন একজন মানুষের মস্তিষ্ক কোকেনে আসক্ত মানুষের মতো হয়ে ওঠে। তবে প্রেমকে মনোবিজ্ঞানীরা বাসনা থেকে একেবারে আলাদা করে দেন না। কারণ প্রেমের মধ্যে প্রেমিক অথবা প্রেমিকাকে পাবার একটা আকাঙ্ক্ষা তো থেকেই যায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাসনার ভেতরে পাওয়ার তীব্র এক বোধ কাজ করে। আর বোধের এই তীব্রতা মানুষের মনে অপরাধমূলক ভাবনাকে সম্প্রসারিত করে একজন নির্দিষ্ট মানুষ অথবা বস্তুকে লাভ করার জন্য।তবে ইংরেজিতে ইনফ্যাচুয়েশন শব্দটির সঙ্গে বাসনা শব্দটির অনেক মিল খুঁজে পান তারা। হঠাৎ এক ধরণের ভালোলাগাই মানুষের মনে তৈরী করে বাসনা।
ইকারুসের বাবা দেদালাস ছিলেন শিল্পী। পৌরাণিক কাহিনীতে আছে, রাজার দ্বীপান্তর নির্বাসনের শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য আকাশপথই বাছাই করেছিলেন। কারণ জলপথ ও স্থলপথে রাজার সৈন্য সামন্ত প্রহরায় ছিল। মোমের তৈরি সেই পাখা মেলে ওড়ার আগে বাবা দেদালাস ছেলে ইকারুসকে সতর্ক করেছিলেন যেন সে এত ওপরে না ওঠে, যার কারণে সূর্যের কাছে চলে যায় আবার সাগরের কাছেও যেন চলে না যায়; যার কারণে পাখায় পানি জমে পাখা ভারী হয়ে যায়। তাকে অনুসরণ করার আদেশ দিয়ে আকাশে উড়ছিলেন বাবা-ছেলে। কিন্তু নতুন পাওয়া পাখা এবং ওড়ার ক্ষমতা দিয়ে সে যেন ওপরের দিকেই উড়তে ছিল। এটা এক অপূর্ব স্বাধীনতা! মানুষ দেখল সে দেবতার মতো, ঈশ্বরের মতো, স্বর্গদূতের মতো আকাশে উড়ছে।ইকারুস যেন মানুষের দুর্দমনীয় জানার আকাঙ্ক্ষা, অর্জন, দেখা ও জয় করার আকাঙ্ক্ষার সার্থক প্রতিমূর্তি। সেই ইকারুস ঠিকই সেই আকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে একসময় সূর্যের কাছাকাছি চলে যায়। কিন্তু মোমের পাখা গলে যেতে থাকে ইকারুসের। একসময় দেখে সে শুধু হাত দিয়েই ঝাপটাচ্ছে কিন্তু আর উড়তে পারছে না। শেষে আকাশ থেকে একটি সাগরে পরে সলিলসমাধি ঘটে তার।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল