বিদায় বেলাল চৌধুরী

‘ঠান্ডা চোখে দেখেছি আমি

নীল কুয়াশায় ঢাকা পড়ছে আমার দেহ।’

কবি বেলাল চৌধুরীর কবিতার একটি লাইন। কবি এভাবেই শান্ত দৃষ্টিতে দেখেন দূরত্বের মৃত্যুকে। হয়তো অপেক্ষা করেন সেই অমোঘ মুহূর্তের। কবি ও সাংবাদিক বেলাল চৌধুরী চলে গেলেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। তারপর আজ বিদায় জানালেন প্রিয় পৃথিবীকে। শান্ত, নিমগ্ন, নিবিষ্ট এক মানুষের প্রস্থান ঘটলো।

আর কোনোদিন দেখা হবে না বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে। পুরানা পল্টনের গলিতে কাঁধে ঝোলা ব্যাগ নিয়ে হাঁটছেন, অথবা জাতীয় প্রেসক্লাবের ক্যান্টিনে নিবিষ্ট হয়ে ভাত খাচ্ছেন।দেখা হলে হাসি আর কুশল বিনিময়ের বেড়া টপকে কত আলোচনা, আড্ডা। তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা তাঁর কাকরাইলের বাড়িতে আশির দশকে। তারও আগে পরিচয় প্রয়াত কবি আবুল হাসানের শেষ কাব্যগ্রন্থের ব্যাক কভারের লেখার মাধ্যমে। লেখাটা বেলাল ভাইয়ের। মনে আছে এক মধ্য দুপুরে হাজির হয়েছিলাম তাঁর বাসায়। কী কাজে গিয়েছিলাম এখন আর মনে নেই।  দরজা খুলে যেতেই দেখা মিলেছিলো হাসিমুখের বেলাল চৌধুরীর।এক সময় চারবেলা নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন।  সেখানে ছাত্র বয়সে কিছুদিন লেখালেখি করেছিলাম। কবিতার পাশাপাশি অসাধারণ সুন্দর গদ্য লিখতেন। সেগুনবাগিচার সেই অফিসে যেতাম প্রবাসী সাংবাদিক সৈয়দ শহীদের সঙ্গে। কত আড্ডায় আমরা হারিয়ে দিয়েছি ঘড়ির কাটাকেও।

কবির বিদায়ে কি অক্ষর বিষন্ন হয়ে থাকে? দুপুরের রোদকে আরো বেশী ঘাতক বলে মনে হয়, রাত্রিগুলো একা হয়ে যায় এই শহরে? না, কিছুই হয় না। কোনো পরিবর্তনেই কবি আর থাকেন না। শুধু থাকে, থেকে যায় তাঁর শূণ্যস্থান।

রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চিকিৎসকরা আজ মঙ্গলবার দুপুরে তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানান কবির বড় ছেলে আব্দুল্লাহ প্রতীক ইউসুফ চৌধুরী।

কিডনি জটিলতা, রক্তশূন্যতা ও থাইরয়েডের সমস্যা নিয়ে গত চার মাস ধরে ওই হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন ৮০ বছর বয়সী বেলাল চৌধুরী। গত ১৯ এপ্রিল রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) নেওয়া হয়। পরদিন তাকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে। সব আশা নিভে যাওয়ায় মঙ্গলবার বেলা ১২টা ১ মিনিটে লাইফ সাপোর্ট খুলে নেন চিকিৎসকরা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, বেলাল চৌধুরী ২০১৪ সালের ৯ মে কলকাতা সাহিত্য আকাদেমির এক অনু্ষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও সাংবাদিক বেলাল চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৮ সালে ১২ নভেম্বর, ফেনীতে। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস চৌধুরী তার ভাই।

ছাত্র অবস্থায় বেলাল জড়িয়ে পড়েন বাম ধারার রাজনীতিতে, ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাগারেও যান।

ষাট ও সত্তরের দশকে কয়েক বছর কলকাতায় বসবাসের সময় সাহিত্য পত্রিকা কৃত্তিবাস সম্পাদনায় যুক্ত হন কবি। পরে পল্লীবার্তা, সচিত্র সন্ধানী ও ভারত বিচিত্রা পত্রিকার সম্পাদনায় যুক্ত হন।

কবিতা, গদ্য, অনুবাদ, সম্পাদনা, শিশুসাহিত্য মিলিয়ে বেলাল চৌধুরীল গ্রন্থ সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। ‘বল্লাল সেন’, ‘ময়ূর বাহন’, ‘সবু্ক্তগীন’ ছদ্মনামেও তিনি লিখেছেন।

তার কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘নিষাদ প্রদেশে’, ‘আত্মপ্রতিকৃতি’, ‘স্থির জীবন ও নিসর্গ’, ‘জলবিষুবের পূর্ণিমা’, ‘সেলাই করা ছায়া’, ‘কবিতার কমলবনে’, ‘বত্রিশ নম্বর’, ‘যে ধ্বনি চৈত্রে শিমুলে’, ‘বিদায়ী চুমুক’ উল্লখযোগ্য।

এছাড়া তার কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ ও গবেষণা গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- ‘স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল’, ‘ডুমুরপাতার আবরণ’, ‘চেতনার রঙ চন্দ্রশিলা’ এবং  ‘লাকসাম দাদা ও অন্যান্য গল্প’।

‘কাগজে কলমে’, ‘মিশ্রচিত্রপট’, ‘নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায়’, ‘জীবনের আশ্চর্য ফাল্গুন’, ‘নবরাগে নব আনন্দে’, ‘সুন্দরবন, সোঁদরবন ও রবীন্দ্রনাথ’, ‘মুহূর্তভাষ্য’ ইত্যাদি তার গদ্যনির্ভর গ্রন্থ।

শিশু-কিশোরদের জন্য বেলাল চৌধুরী লিখে গেছেন, ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’, ‘সপ্তরত্নের কাণ্ডকারখানা’, ‘সবুজ ভাষার ছড়া’।

নিজে লেখার পাশাপাশি হোর্হে লুই বোর্হেস, পাবালো নেরুদা, ডিলান টমাস, অক্তাবিও পাসের মতো কবিদের লেখা তর্জমা করেছেন বেলাল চৌধুরী; সম্পাদনা করেছেন বেশ কিছু স্মারকগ্রন্থ।

তার সম্পাদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘জলের মধ্যে চাঁদ ও অন্যান্য জাপানি গল্প’, ‘বিশ্বনাগরিক গ্যেটে’, ‘পাবলো নেরুদা-শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি’, ‘শামসুর রাহমান সংবর্ধনাগ্রন্থ’, ‘পদাবলী কবিতা সংকলন’ ও ‘কবিতায় বঙ্গবন্ধু’।

বেলাল চৌধুরী কলকাতা থেকে ১৯৭৪ সালে দেশে ফিরে আসেন, যোগ দেন প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। সে সময়ে জাতীয় কবিতা পরিষদ ও পদাবলী কবিতা সংগঠন গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৪ সালে একুশে পদক পান কবি বেলাল চৌধুরী; পেয়েছেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, নীহাররঞ্জন স্বর্ণপদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

ছবিঃ গুগল