ওই যে আমাদের বেলাল ভাই…

শামীম আজাদ, লেখক

আজও শেষ রাতে ভাঙা স্বরে সে ডাক দিয়ে গেল। যেন তার স্বরভংগ। যেন সে এক টিন এজার ট্রেন। বয়সের আনন্দেই ডেকে চলে গেল। তার সে স্বর ভেঙে ভেঙে পেরিয়ে যায় উত্তর ক্যারোলিনার শার্লটের রাফায়েল প্লেসের ঘুমন্ত অ্যাপার্টর্মেন্টগুলো আর শাল গাছের মত দাঁড়ানো লাইট পোস্টের নিচের ঝাপসা সবুজ।

আমি কত দিন পর ট্রেনের ডাক শুনলাম। ট্রেনের ডাক জাহাজের ডাক, ডাহুকের ডাক আর ককবির ডাক আমাকে উতলা করে দেয়, আমাকে বিষন্ন করে দেয়, আমাকে স্মৃতি কাতর করে দেয়। আমার শৈশবের রেল গাড়িগুলো ছিলো যেমন তেমন কিন্তু হুংকার এমন দিতো যে ঘুম ভেঙে বিছানা থেকে পড়ে যাবার জোগার হতো। নাকি ছোট ছিলাম বলে অপরিনত এবং কেবল পৃথিবী শুনতে শুরু করেছে এমন কানের কাছে সবই জোরে লাগে জানিনা।

এখন আমি যখন আমার এক কালের সেই ঝুমুর ডাঙা দিদির পরিবর্তে বর্তমানের বর্ষিয়ান এই ভঙ্গর স্বাস্থ্য বুজানের পাশে ঘুমিয়ে থাকি তবু যে সে আমার জননীর প্রতিনিধি ভুলতে পারিনা। সেও আমার মানুষ ষ্টেশন। ট্রেনটা তার টন টন লোহা আর ইষ্পাতে তৈরী দেহটা নিয়ে যখন আমাদের পেরিয়ে গেল তখন অপু ও দূর্গার কথা মনে হলো। ফ্রক পরাকালের বন্ধু মিষ্টি মন্টি, ছটফটে ছোট ভাই শোয়েব কিংবা আপেলের মত লাল খালাতো ভাই রাফেলের কথা মনে এলো। মনে হচ্ছে জীবিত মানবেরা একেকজন একেক ষ্টেশন।

সে সময় সিলেটে গ্রামের বাড়ি যাবার পথে ভোররাতে টেনের বিকট চিৎকারে আখাউড়া ষেটশনে ঘুম ভাঙলেই দেখতাম আব্বা কেবল ছেলেদের কম্পার্ট্মেন্ট থেকে নেমে দ্রুত চা গ্রম চা গ্রম ধ্বনি দেয়া লোকের কাছ থেকে আমাদের ফ্লাস্কে চা ভরে নিচ্ছেন, এ্যাই ডিম এ্যাই ডিমওলার কাছ থেকে ডিম ও লবন, লোফওলার কাছ থেকে ছোট ছোট মিষ্টি রুটি কিনে নিচ্ছেন। আর আম্মা খালামনি সেগুলো বেড়ে দেবার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিতো। আব্বা উধাও হয়ে যেতেন । পরের ষ্টেশনে এবার কোথা থেকে এসে দ্রুত জানালা দিয়ে নিয়ে যেতেন নিজের ভাগ। আর বলতাম ঐ যে আব্বা ঐ যে আব্বা। আব্বা মিলিয়ে গেলে সকাল হত। খড়খড়ি উঠানো জানালায় মাথা দিয়ে আমি আর শোয়েব বেঁকে যাওয়া অজগরের লেজ দেখতে চেষ্টা করতাম। মাথা উঁচিয়ে কয়লার কুন্ডলির হাতীর শূঁড় দেখতাম। ভাইয়া বগির মাথার উপরের খাঁচায় খাকি হোল্ডলের উপর পাতা বিছানা থেকে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে আমাদের বাহাদূরী দেখাত। হয়তোবা ততক্ষনেও আমাদের কামরায় রবীন্দ্রনাথের লেখা ইষ্টার্ণ রেল ওয়ের বিজ্ঞাপনের সেই লাইনগুলোর- মত রয়ে গেছে ‘ কামরায় গাড়িভরা ঘুম’।

আমি শুয়ে আছি আমেরিকান স্থপতির বানানো কামরায়। হাল্কা হিটিং এর শ্ শ্ শব্দে বুজানের নরম নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছি। ব্লাইন্ডের ফাঁকে চিরল চিরল জীবন দেখা যাচ্ছে। আবছা আলো আঁধারে দেখতে পাই ফেলে আসা জীবনের ফালি ফালি ট্রেন ষ্টেশন। কত সরল সুখী মানুষ, কাব্য ও কথকতা। শৈশবের জাম্পেশ জামালপুর থেকে এই পরিনত বয়সের বিদেশ ভুখন্ডের লীলাময় লিভারপুল পর্যন্ত। জামালপুর টু লিভার পুল। বাহ্ এমন একটা লেখাতো লিখতে পারি! এর মধ্যে থাকবে না্রায়নগঞ্জ, কুলাউড়া, ফেনী, শায়েস্তাগঞ্জ বা মৌ্লবি বাজার, চাষাড়া ও বনানী। কিংস ক্রস, ডার্লিংটন, সান্ডারল্যান্ড, নিউক্যাসেল, লিভার পুল।কেবল যাওয়া আসা। কেবল ভালবাসা। নারায়নগঞ্জের ফনী কাক্কার নিতাইগঞ্জের বাসার ফুলকো লুচি তরকারী ও স্মৃতিময়দা’র শেখানো কবিতা আবৃত্তি। বুজানের শ্বশুরবাড়ী কুলাউড়ার নাড়ার আগুনে পোড়ানো বাঁশের চোঙা পিঠা আর হাঁসের মাংস ভুনা। ফেনীর ছোট্ট ষ্টেশনে বসে বন রুটি খেতে খেতে আব্বার অফিসের জিপ গাড়ির অপেক্ষা করা।শায়েস্তাগঞ্জ থেকে মৌলবিবাজারে ব্রিটিশ আমলের ঝক্কর লক্কর বাসে করে মনু নদের কাছে নামা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটিতে প্লাস্টিক ব্যাগ নিয়ে রোকেয়া হল ছেড়ে ভরা কচুরিপনা ডোবা ঘেরা চাষাড়া ষ্টেশনে নামা। চট্টগ্রাম যাবার জন্য আজাদ ও আমাকে ঈশিতার মেহেদী মাখা দাড়ির বিশ্বস্ত ড্রাইভার শাজাহানের বনানীতে নামিয়ে দেয়া।

কত মানুষ এভাবেই আমার শিল্পযাত্রার ট্রেন সঙ্গী হয়ে কবিতা কথকতা করেছে। এই বিলেতের প্রতিটি ষ্টেশনেরও এক একটি আলাদা স্মৃতি আছে। আলাদা মানুষ আছে। কবি আছে। কাব্যকনা আছে। ভিন্ন ও অনন্য সব ঘটনা আছে। কম দিন হল না কবিতা করে বেঁচে আছি!
আজ শার্লটের আলোর অজগরটি আমাকে এক মানুষ-ষ্টেশনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে গেল আর আমি ভেজা চোখ নিয়ে তার কথাই ভাবছি।

আমাকে আমার জীবনট্রেন যতগুলো মানুষ-ষ্টেশনের কাছে গিয়ে থমকে পড়েছে তিনি ছিলেন তার অন্যতম। আমার এই চলমান প্রবহমান যতিবিহীন কাব্যজীবনে স্থিতি দানকারী দুজন মানুষ-ষ্টেশনের একজন ছিলেন রফিক আজাদ আর অন্যজন বেলাল চৌধুরী। রফিক ভাই আমার গুরু। তিনিই আমাকে গল্পের জগত থেকে কবিতায় নিয়ে আসেন। বেলাল ভাই- শক্ত লাবন্যের কবি, বেলাল চৌধুরী লেখা দেখেছেন, আমার বইয়ের ব্লার্ব লিখেছেন, পত্রিকায় আমার কবিতা নিয়ে লিখেছেন এবং চা খেয়ে খেয়ে কখনো ভারত বিচিত্রায়, কখনো বাংলা একাডেমীতে রফিক ভাইর কক্ষে, কখনো পদাবলীর পাদপিঠে, কখনো বিচিত্রায় শাচৌর কক্ষে, কখনো বুলবুলের বিলেতের বাসায়, টয়েনবী হলে বক্তৃতার ফাঁকে আমাকে নিয়ে তাঁর উচ্চাশার কথা বলে বলে আমাকে আমার আলোতে সে যেমনই হোক নিজেকে দেখিয়েছেন। আমার সঙ্গে তাঁর ভালবাসার যৌথ কবিতা গ্রন্থ যুগলবন্দী থেকে প্রকাশ কালে ১৯৮২/৮৩ তেই প্রথম কবিতা নিয়ে প্রগাঢ় আলাপ।
হে সুদুর্শন আপনি কি আর আসবেন না? আপনার সৌরভ ভরা ষ্টেশনে কি আর আমরা চা পান করবো না! পেছন থেকে বলবো না ওইযে বেলাল ভাই…ওই যে আমাদের বেলাল ভাই…ওই যে… ওহ্‌ বেলাল ভাই!

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে।