কী বলবো, কোথা থেকে বলবো জানি না

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

কোনও এক অজ্ঞাত কারণে কথা ফুরিয়েছে, শব্দ হারিয়েছে…। ভোঁতা হয়ে গিয়েছে সমস্ত রকম উত্তেজনা, ক্ষয়ে গিয়েছে অনুভূতির তীক্ষ্ণতা…। কলমের ডগায় আলো জ্বলে না আর…।

দিন পেরোয় নিয়মমাফিক ব্যস্ততায়, ‘অ্যাফোর্ড’ করা হয় না রাগ-দুঃখ-কষ্ট-লজ্জা-ভয়-উদ্বেগ-শিহরন…। উদ‌্‌যাপন করা হয় না ব্যক্তিগত সুখ-প্রাপ্তি-আনন্দ…।
সময়ের ঢেউ যতই উত্তাল হয়, আমি ততই পা বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে সরে আসি শুকনোর দিকে…। হেঁটে যাই সমান্তরাল…।

হাঁটা হয়, দূরত্ব পার করা হয় না…।
ভেজা হয়, স্নান করা হয় না…।
কাঁদা হয়, ডুকরে ওঠা হয় না…।

অথচ এ সময় নাকি প্রতিবাদের সময়…। এ সময় গর্জে ওঠার সময়…। এ সময় সমস্ত ক্ষোভ নিংড়ে দেওয়ার সময়…। এ সময় কাউকে ছেড়ে কথা বলার অপশন রাখেনি…। এ সময় বারবার বলছে, ‘মারো, আরও মারো’…। বলছে উদ্ধত হও, উন্মুক্ত হও…। বেপরোয়া হও…।

আমার কিন্তু এ সময় এই নিস্তব্ধতা পালনের কথা নয়, একেবারেই নয়…। এই নির্বিকার, নির্লিপ্ত, নিস্পৃহ চাদরটা এই সময় আমার জড়িয়ে রাখার কথা নয়…। তবু….

তবু আমি পারছি না, আসছে না…. কোথাও একটা বাঁধছে, কিছু একটা পায়ে জড়াচ্ছে…। খুব সূক্ষ্ম হলেও একটা কাঁটা বিঁধে রয়েছে আঙুলের ডগায়…। সে কাঁটা পেরিয়ে সামনে আসতে পারছে না সিঁটিয়ে থাকা, সংখ্যালঘু শব্দেরা…।

কী বলবো, কোথা থেকে বলবো… জানি না…। জানি না কোথাও কাউকে কিছু বুঝিয়ে উঠতে পারবো কি না…। তবু প্রলাপ হিসেবেই না হয় থাক কথাগুলো নিজের দেওয়ালে…। যেমন ওই ডাগর চোখের মেয়েটা ডিপি-র খোপে ঝুলে আছে মিটিমিটি হাসি নিয়ে…। অকারণেই…।

ধর্ষণ… ধর্ষণ কেন, অনিচ্ছেয় কড়ি আঙুলের স্পর্শটুকুও খারাপ…। অন্যায়…। অপরাধ…। প্রতিবাদ করার মতোই…। কিন্তু আমার মনে হয়, প্রতিবাদ করতে গিয়ে যদি সেই অন্যায়টাই কোথাও চর্চিত হতে থাকে, সেই অন্যায়টা যদি অন্য অন্যায়ের ব্যাখ্যাতেও শিখণ্ডী হতে থাকে বারবার, তখন সেটা আরও বড় অন্যায় হয়ে যায় অবচেতনেই, অজান্তেই…। তাই কাঠুয়ার মর্মান্তিক ঘটনায় ধর্ম কেন উঠছে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যখন আমরা মেটিয়াবুরুজ হাতে পাই, তখন আমাদের আর ভাল করে খোঁজই নেওয়া হয় না, মেটিয়াবুরুজে ঠিক কী হয়েছিল। আই রিপিট, ‘ঠিক কী হয়েছিল’। আমরা পুলিশ মানি না, আইন জানি না, শুধু শেয়ার করতে থাকি জ্বলন্ত শব্দরাশি। আমরা যাচাই করি না। আমরা প্রশ্ন তুলি না। এমনকী আমরা আঁতকেও উঠি না। আগে প্রতিবাদ করি…। প্রতিবাদ… জানাই হয় না, প্রেমিকের সঙ্গে একাধিক বার পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারা একটা ঘটনা কী ভাবে অপহরণ আর ধর্ষণ আর আঙুল কেটে দেওয়ার গা-ছমছমে মশলা মাখিয়ে আমাদের মুখে গুঁজে দেওয়া হচ্ছে…।
আমরা সেটা গেলার আগেই প্রতিবাদ উগরে দিচ্ছি…।

আমরা কতটা নীচে নেমে গিয়েছি, এটা প্রমাণ করার দায় নিয়ে আমরা এক্সভিডিওজ়-এর স্ক্রিনশট পোস্ট করতে থাকি হুড়মুড়িয়ে… মানবিকতা পচে গিয়েছে বলে আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলে দিই…। আমরা ওই নামটুকু দিয়েই বুঝে নিই, সারা পৃথিবীর মানুষ কাঠুয়ার ছোট্ট মেয়েটির ‘রেপ-ভিডিও’ ‘সার্চ’ করে করে ‘ট্রেন্ড’ বানিয়েছে…। তার পর শেয়ার করতে থাকি হু হু করে…। অথচ আমাদের জানা হয় না, আসলে ওই একই নামে, ‘ভুট্টো জ়ারদারি’ সারনেম-সহ এক জন জনপ্রিয় পর্নস্টার থাকায়, এবং তাঁর প্রচুর ভিডিও ওই সাইটে আপলোডেড থাকায়, নামটা মাঝেমধ্যেই ট্রেন্ডিংয়ে আসে…।

আর… আর… আর… আর আমরা জাস্ট খেয়ালই করি না, ওই ট্রেন্ডিং লিস্টেই রয়েছে, তেলেগু স্কুল গার্লদের সেক্স ভিডিওর কথা…। যে হেতু খেয়াল করি না, তাই আমাদের আর ওই বিকৃতিটা নিয়ে কথাই বলা হয় না। প্রশ্ন তোলা হয় না, স্কুলের মেয়েরা কেনই বা সেক্স করবে, আর তা কেন দেখার আগ্রহ থাকবে মানুষের…। প্রতিবাদ দূরের কথা। আমরা নির্দিষ্ট একটা প্রতিবাদ-ঠুলি চোখে এঁটে মোমবাতি জ্বালাই নিশ্চিন্ত সন্তুষ্টি নিয়ে…। আঁধার ঘোচে না…

তাই আমরা গড়িয়ার ঘটনার শারীরিক পরীক্ষার রিপোর্টটুকু পুলিশ হাতে পাওয়ার আগেই ‘ধর্ষণ করে ট্রেলার দিয়ে পিষে দেওয়ার’ নৃশংস তত্ত্ব দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিই পর্যাপ্ত শিউরে ওঠা শব্দ-সহকারে…। খোঁজ নেওয়ার চেষ্টাই করি না, ঘটনার সত্যতা…। জানার চেষ্টা করি না, তদন্তে কী বেরুলো…। আমরা প্রতিবাদের একটা চেনা এবং নিরাপদ ভাষা খুঁজে নিই নিজেদের মতো করে…। স্থান-কাল-পাত্র বদলে দিয়ে প্রতিবাদ উপস্থাপনা করি ইস্যুভিত্তিক…। আমার শুধুই ক্লান্ত লাগে, ভীষণ ক্লান্ত…।

আমি আসলে বোকা, স্বার্থপর….। তাই বেশ কয়েক বছর ধরে মার্শাল আর্টস শিখেও আমি আজও কিছুতেই পুরোপুরি খুশি হতে পারি না, কোনও এক মফস্বলের কিশোরীর ইভ টিজারদের মেরে ফাটিয়ে দেওয়ার ঘটনায়…। আমার বাহবা আসে না, খানিক লজ্জাই আসে…। মনে হয়, ওকে সাবাশি দেওয়ার অর্থ হল, নিজেদের পরাজয় মেনে নেওয়া…। কৈশোরকে সুরক্ষিত না করতে পারা আমাদের, বড়দেরই পরাজয় নয় কি…? ‘হয় মরতে হবে নয় মারতে হবে’…. এই তত্ত্ব তো আমাদেরই লজ্জা…! কেন, কেন আমায় বাঁচতে হলে মারতেই হবে…? আর ও না হয় মেরে বাঁচল…। যে কৈশোর যে কোনও কারণেই হোক, মারতে শেখেনি…? তার তবে মরে যাওয়াই জায়েজ বুঝি…?

আমার কানে এখনও বাজে সেই প্রথম দিকে মার্শাল আর্টসের ক্লাসে শেখা শব্দ ক’টা….’নো ফাইট ইজ দ্য বেস্ট ফাইট’…।

আমি তো শিখেছিলাম, মেধা, বুদ্ধি, ধৈর্য্য, মনন, সংবেদনশীলতা দিয়ে কোনও উত্তপ্ত পরিস্থিতিকে শান্তিপূর্ণ ভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাই আসলে মার্শাল আর্টস…। প্রয়োজনে দু’ঘা বসিয়ে দিতে পারার আত্মবিশ্বাসটুকু বুকপকেটে লুকিয়ে রাখার জন্য, সবার আগে খুলে দেওয়ার জন্য নয়…। মার্শাল আর্টস একটা যাপন, যে যাপনে থাকলে কোনও খারাপ পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষা সহজ হয়। আই রিপিট, সহজ হয়, নিশ্চিত হয় না…। আত্মরক্ষার জন্য মার্শাল আর্টস শেখা হয়নি আমার, আমাদের…। মার্শাল আর্টস শেখার জন্য আত্মরক্ষার কনফিডেন্স বেড়েছে… এটুকুই…।

ফলে আমি ভ্যাবলা হয়ে যাই এই পরিস্থিতিতে…। কোণঠাসা হয়ে রই…। আমার চিৎকার করে প্রতিবাদ করা হয় না, আমার মার-মার-কাট-কাট রব তোলা হয় না…। আমার বুঝেই ওঠা হয় না, কখন কোনটা নিয়ে কী বলে চেঁচাবো…। যখন একটু বুঝতে শুরু করি, তখন দেখি ওই বিষয় নিয়ে আর কেউ কথা বলছে না, আমি একা দাঁড়িয়ে আছি বোকার মতো…। আমার নিদেনপক্ষে ডিপি-ও কালো করা হয় না, পৃথিবী থেকে মেয়েদের অস্তিত্ব ঘুচিয়ে দেওয়ার ফরোয়ার্ড মেসেজ পেয়ে…। কারণ সমস্যাটা ‘ধর্ষণ’, সমস্যাটা ‘মেয়ে’ নয়…। আমার ওই ভয়েস রেকর্ডটাও শেয়ার করার ‘দম’ অর্জন করা হয় না, যেখানে ধর্ষণের আশঙ্কায় কন্যাভ্রূণ হত্যা করার কথা বলা হচ্ছে…। তা হলে তো ধর্ষক জন্মানোর আশঙ্কায় পুত্রভ্রূণও হত্যা করার কথা…। আর তৃতীয় লিঙ্গের তো এমনিই জায়গা নেই, তাদেরও হত্যা করার কথা…।
আমরা তো তা হলে একটা ভ্রূণশূন্য শেষের দিকে এগোচ্ছি…!

আমি আবার খুব ভীতুও…। আসলে ও রকম বড়-বড় চোখের নাকবুঁচুনি একটা মেয়ে তো আমিও চাই খুব…। কিন্তু আর পাঁচ জন মায়ের মতোই ভয় পাই, ওকে সুরক্ষিত শৈশব দিতে পারব তো…? ওর কৈশোরকে উড়তে দিতে পারব তো…? উত্তর মেলে, আরও সতর্ক হতে হবে…। আরও সচেতন হতে হবে…। সতর্কতা ভাল, সচেতনতা ভাল…। সতর্কতা আর সচেতনতা দিয়ে যদি ওদের আগলে রাখা যায়, তা আরও ভাল…।
কিন্তু এর পরেও আরও একটা ভয় কাজ করে আমার…। পর্যাপ্ত সচেতনতার পরে আমার খুদেটা যদি আমারই বাবার আদরে আধো আধো উচ্চারণে প্রশ্ন তোলে, “মা, দাদু আমায় খারাপ ভাবে আদর করছে না তো ?” আমার ভাই যদি ওকে কোলে নিয়ে বুকে জাপটে ধরে চুমু খেতে গিয়ে একটু থমকে যায়…? আমি যদি কিছুতেই ওকে খোলা মনে পাশের বাড়ির কাকুর সঙ্গে পার্কে বেড়াতে যেতে দিতে না পারি…? আর ধরে নিই যদি আমার মেয়ে হলো না, একটা ছেলেই হলো…। সে একটু বড় হলেই যদি আমায় নজরদারি করতে হয়, খুড়তুতো বোনের সঙ্গে খেলা করার সময়ে সে কোনও অসঙ্গত আচরণ করছে কি না…!

সবাই হয়তো বলবেন, এটাই স্বাভাবিক…। এটাই বাঞ্ছনীয়…। এটাই সমাধান…। আমি মেনে নিতে পারি না…। আমার এই পরিস্থিতি ভাবলেই দমবন্ধ হয়ে আসে…। এই চরম অবক্ষয়ের সময়টা, এই গা ঘিনঘিনে সময়টা যতটা খারাপ, যতটা যন্ত্রণার…. শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সকলে ভালবাসতে ভুলে যাচ্ছে, স্বতঃস্ফূর্ত আদরে সংযমের আগল পরিয়ে সিঁটিয়ে থাকছে, সে পরিস্থিতিও আমার কাছে কম খারাপ নয়, কম ভয়ের নয়…। খারাপকে রুখতে গিয়ে সমস্ত ভালর চোখে অসহায় সংশয়ের কালো পটি বেঁধে দেওয়া মৃত্যুর সমান…।

যে ডানার উড়ানে নিরুদ্দেশের পালক গাঁথা থাকার কথা, সে ডানায় নজরদারির পাথর বাঁধতে আমার মন সরে না…

এই এত ভয়, সংশয়, দ্বন্দ্ব, ক্লান্তি নিয়ে আমি আর কী বলতে পারি…? কী-ই বা লিখতে পারি আমি…? হতাশার পাহাড়ে আরও এক কোট হতাশা চাপানো ছাড়া আমার আর কিছু করার আছে কি সত্যিই…?

তার চেয়ে এই হিরণ্ময় নিস্তব্ধতাই ভাল নয় কি, বলো…?

ছবি: গুগল