সেই যে কবে ঘর ছেড়েছি

কনকচাঁপা শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

নাতনীর সঙ্গে

জীবনের পয়লা গানের জন্য লম্বা ভ্রমণ আমার লন্ডন শহরে।নব্বইয়ের পয়লা দিকে ছিল সেই ভ্রমণ। প্রায় দুইমাস লম্বা ছিল সে যাত্রার সময়কাল। অতি উৎসাহ নিয়ে ভিসা টিকিট নিজেরাই করেছি।তখন আমাকে তেমন কোন মানুষ চেনেনা।কে আমাদের দুজনের টিকিট দিয়ে নিয়ে যাবে! নিজেরাই নিজেদের ব্যবস্থা করি আর কি।দুটি সন্তানের মা আমি, বাচ্চাদের জন্য অস্থির লাগে ঠিকই, কিন্তু গান শোনানোর জন্য বিদেশ যাত্রা, তার হাতছানিও কম না।

ভিসা টিকিট সব রেডি, শাশুড়িমা সব দায়িত্ব নিয়েছেন, তবুও দায়িত্ব বুঝিয়ে দেয়া শেষ হয়না আমাদের। দিন ঘনিয়ে এসেছে, স্যুটকেস গোছাচ্ছি, ফারিয়া তিন বছরের বাচ্চা, মাশুক ছয়, মাশুকের মনের অবস্থা বোঝা যাচ্ছেনা, কিন্তু ফারিয়া স্যুটকেসে চড়ে বলছে, আমি বিদেশ যাবো বিদেশ যাবো! কি ভয়াবহ অবস্থা! কি এক অচেতন অবচেতন অবস্থায় ফ্লাইট এ চড়ে বসলাম! মনের কষ্টে জ্বর এসে গেলো। হিথ্রো বিমানবন্দর এ নামলাম একশো তিন জ্বর নিয়ে।কয়েকদিন জ্বরের ঘোরে কাটলো, জ্বর কমলে শুরু হল বাচ্চাদের জন্য দুঃচিন্তা।কান্না আর কান্না। তখন ফোন এতো সহজ ছিলনা। লন্ডন এর ভয়াবহ ঠান্ডায় বাসে চড়ে রাস্তার ফোন বুথে গিয়ে বাংলাদেশের ভাড়া বাসার বাড়িওয়ালার বাসায় ফোন করে আপন জনকে ফোনে পাওয়া আর সোনার পাথরবাটি পাওয়া এক কথা।

নাতীর সঙ্গে

আগে ফোনে লাইন পেয়ে বাড়িওয়ালা কে বলা “ডেকে দেবেন কি? তারপর রাজী হলে সময় মত আবার ফোন করা আসলে লটারি জেতার নামান্তর। হয়ত শাশুড়িমা ফোন ধরলেন।কিছু শান্তনা পাওয়া যেতো কিন্তু মাশুক ফোনে কিছুতেই কথা বলতো না, কান্না করতো নাকি লজ্জা পেতো কিছুই বুঝতাম না, ফারিয়া একটু কথা বলতো কিন্তু সেগুলো পুতুল আইনো খেলনা আইনো জাতীয় কথাবার্তা।

এভাবে কথা বলে শান্তি পাওয়ার চেয়ে অশান্তিই বেড়ে যেতো। কেঁদেকেটে একাকার হতাম।স্বামীস্ত্রী দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে শান্তনা পেতাম।দু একবার চিঠিও লিখেছি।মাশুক তার ক্রন্দনরত নিজের ছবি এঁকে আবার লিখেছে ফারিয়া খামচি দেয় খালি।চিঠি পড়ে আমার কান্না আর শেষ হয়না, কিন্তু আমাদের দুই মাসের প্রবাস জীবন ও শেষ হয়না।এভাবে এক সময় কষ্টের ভ্রমন সেবারের মত ফুরালো কিন্তু আমার অনন্ত যাত্রা আসলে শুরু হল।এর পর থেকে আর নিজে টিকিট কাটিনি।আয়োজকগনই টিকিট ভিসা করিয়ে গান গাইতে নিয়ে গেছেন বছরে অন্তত পাঁচ ছ’বার।আমি প্রতিবারই বাচ্চাগুলোকে ফেলে সাতদিন দশ দিন একমাস দুইমাস এর জন্য বাচ্চাকাচ্চা ছেড়ে বিদেশ গিয়ে গান করেছি।ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা, পড়া, বেড়ে ওঠা চলতে থাকলেও ব্যাহত হয়েছে।আমি ধন্য যে অবাধ সুযোগ থাকা সত্বেও তারা কোন অপরাধে জড়ায়নি, হয়তো পড়াশোনা তে পিছিয়েছে কিন্তু পারিবারিক মুল্যবোধের অবমূল্যায়ন করেনি।রোগ জ্বরা ব্যাধিতে তারা ভেংগে পড়া দূরের কথা, মা বিহীন সময়ের কষ্ট তারা প্রকাশ ও করেনি।এই হলো একজন শিল্পীর জীবন এবং এই হলো একজন শিল্পীর পুরা পরিবারের বিসর্জনের ছোট করে বলা বড় গল্প।কি করে তখন সেগুলো সয়ে গেছি জানিনা।শুধু জানি সময় গুলো মোটামুটি পার হয়েছে।কিন্তু যখনি ভেবেছি পার হয়েছে তখনি আবার বুঝতে পেরেছি সেই কষ্টের সময় পার হয়নি বরং কষ্ট আরো ঘনীভূত হয়েছে কারণ আমাদের বয়স হচ্ছে এবং এই সাগরসম দুরত্বের মাঝখানে পিছুটান হয়ে দাড়িয়েছে দু’টি দেবশিশু রুপী নাতিনাতনি। ঠিক এক মুহুর্তে আমি বাংলাদেশের উলটাপিঠে। ভিডিও কল এ নাতি আমমার “দাদায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া ( কপাল! হই নানী ডাকে দাদা) বলে ভ্রু কুচকে যে জোরে ডাক দিলো, আমার সমস্ত কাজ, সমস্ত পেশাদারী মনোভাব দুমড়ে মুচড়ে চুর চুর হয়ে গেল।আজ সারাদিন মনে হচ্ছিল টিকিট বদলে ফেরার দিন এগিয়ে আনি।আমি আসলেই আর এই বিরহ মেনে নিতে পারছিনা।দাদায়ায়ায়ায়ায়া, আমি আসছি দাদা, আর কটা ক্ষন সবুর করো কলিজার টুকরা।আমি আসছি।আমি আর তোমাদের এতো অপেক্ষা করাবো না।

ছবি: লেখক ফেইসবুক থেকে