তখন গল্পের তরে …

ছোট গল্প অথবা অণু গল্প, লেখকের ভাবনা প্রকাশের জন্য খুব সংক্ষিপ্ত একটু জায়গা। এবার প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে লেখকদের কাছে দু’টি লাইন দিয়ে গল্প লেখার আহ্বান জানানো হয়েছিলো। লাইন দু’টো ছিলো-মেয়েটি প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেও রাস্তা ধরে ছুটছিলো অথবা লোকটা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো…।   সাড়া দিয়েছেন অনেকেই। লিখে পাঠিয়েছেন তাদের মনের সেইসব খন্ডিত অথচ র্পূণাঙ্গ ভাবনা। এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো গল্পের আয়োজন।

রুদ্রাক্ষ রহমান

চলুন…

দুপুর বেলা। আচমকা পুরো আকাশ ভীষণ কালো রঙ পেলো। উত্তর-পশ্চিম কোণ থেকে বইতে শুরু করলো উতাল-পাথাল হাওয়া। তারপরই সবকুল ছাপিয়ে শুরু হলো বৃষ্টি। মুহুর্তেই উধাও হয়ে গেলো গরম ভাব। বৃষ্টি ফোটায় শীতল হয়ে গেলো সব কিছু।

রমনা পার্কের কুসুমতলায় আসতে একটু ছুটতেই হলো মমকে। মাথা বাঁচানোর চেষ্টা যাকে বলে। তবে খুব যে বাঁচাতে পারলো তেমনটা নয়। দাঁড়িয়ে ঝড়-বৃষ্টির এই খেলাটা মগ্ন মনে দেখছিলো মম। প্রতিমাসে একবার নিয়ম করে রমনায় যায় সে। রমনা উদ্যানের গাছেরা খুব আপন তার। কাছের এবং পাশের জনদের ও প্রায়ই বলে-এই উদ্যানের সব গাছ চেনে সে, নাম জানে তাদের। বর্ষা, শীত, বসন্ত, গ্রীষ্ম প্রতি ঋতু, প্রতিমাস, প্রতিদিন একটু একটু করে বদলে যায় গাছ। বদলে যায় এই উদ্যানের সব কিছু। মম বলে, গাছেরা আকাশের রঙ দেখে নিজেদের সাজিয়ে নিতে জানে। বৃষ্টিফোটা গায়ে পড়ার সঙ্গে নেচে ওঠে গাছের পাতারা। মমর এসব কথায় অনেকে নতুন ভাবনা খুঁজে পায়। আবার অনেকে হেসে বলে, ‘পাগল একটা’।

নিজের এই পাগলামীটা খুব এনজয় করে মম। দিন নেই, ক্ষণ নেই; মন চাইলো তো ক্যামেরা হাতে বেরিয়ে পড়লো। ইন্টার পরীক্ষা দেয়ার পর থেকে সেই যে শুরু, চলছে ১২ বছর ধরে। দেশের এমন কোনো অরণ্য নেই যে সেখানে যায়নিমম। কখনো একদম একা; কখনো বা দল বেঁধে। প্রথম দিকে মেয়ের এমন খেয়ালে মা-বাবার আপত্তি থাকলেও শেষতক জয় হয়েছে মমর। নেচার ফটোগ্রাফির জন্য দেশে-বিদেশে কয়েকটি পুরস্কার তার এই পাগলামির হাওয়াটাকে আরো উস্কে দিয়েছে। আর আপন-পর সবাই সহজভাবে মেনে নিয়েছে বিষয়টিকে।

তো সেই মম। গ্রীষ্মের এই দুপুরে, রমনা উদ্যানে হঠাৎ বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা গাছদের দেখে, দুটো কাককে দেখে, নাগলিঙ্গম ফুলের পাপড়িতে জমে থাকা বৃষ্টিফোটা দেখে, হুহু শব্দতোলা বয়ে চলা বাতাসে ডাল আর পাতাদের নাচন দেখে এবং মেঘেদের ড্রিম ড্রিম শব্দ শুনতে শুনতে ভাবতে থাকলো সে একা, বড্ড একলা। কেনো এটা তার মনে হলো আর বুকের গভীর তলে অনুভুতিটা কেনো আলোড়ন তুলছে তা স্পষ্ট করে ধরতে পারছে না মম।

ঠিক সেই সময়, বৃষ্টিকণায় ঝাপসা হয়ে থাকা দক্ষিণ দিক থেকে লম্বা মতো একটা ছায়ামূর্তি ভেসে আসতে থাকে কুমুমগাছটা দিকে। একটু একটু করে ছায়ামূর্তিটা মানবে পরিণত হতে থাকে। মমর সামনে এসে দাঁড়ায় কালো টি-শার্ট, জিন্সপ্যান্ট আর কেডস পায়ে এক তরুণ। কাছে এসে কোনো ভূমিকা ছাড়াই অদ্ভুদ হাসি ছড়িয়ে বলে, আমার না একা একা ভিজতে আর ভালো লাগছে না। আপনি ভিজবেন আমার সঙ্গে?

বৃষ্টিভেজা তরুণের এমন আহ্বানে হ্যা, না কিছুই বলতে পারে না মম। একবার কেবল কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ আর ভেতরে থাকা ক্যামেরাটার অস্তিত্ব জেনে নেয়ার চেষ্টা করে বাঁ হাতের আঙুল দিয়ে। তারপর বলে, চলুন।

মুর্শিদা জামান

হোঁচট পাওয়া দৃশ্যরা

রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালো সুজয়। ডানদিকের গলিতে কদিন ধরেই একটা পুলিশের ভ্যান দাঁড়িয়ে থাকে। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নিজের বাড়ির বারান্দার দিকে তাকালো। এত উঁচু যে মিলির ম্যাক্সিটাকে ছোট বাচ্চাদের ফ্রক বলে মনে হচ্ছে। বাজ পাখির দৃষ্টি ওর। নিখুঁত অবলোকন বলেই না মিলির অনাবশ্যক দরদ, একটু অধীর দৃষ্টি এর কোনটাই গোপন থাকেনি। এই তো ক’দিন আগেও অফিসের পরে আড্ডা দিতে যেত হাতিরপুল। ওখানে তেঁতুল চা আর দই চিড়া খেয়ে হাফিজের মোটরসাইকেলে ফিরতো বাসায়। ঘুম ঘুম চোখে মিলির দরজা খোলা, ওর কোচকানো কপালে চুমু খাওয়া সবই ঠিকঠাক ছিল। কিন্তু সুজয়ের মনের গভীরে যে প্রশ্নের কুন্ডলি ফোঁস ফোঁস করছে সেটার উপযুক্ত ফণা বিষসমেত আছড়ে পড়ার আগে মিলিকে টের পেতে দিতে চায়না কিছুই। সেদিন ডিনারে ভেটকি মাছের ফিলে একটু বেশি ভাজা হওয়াতে মিলিকে যেইনা বলতে যাবে – ‘হালকা ভাজলেই তো পারতে’, অমনি তো দেখা হয়ে গেল মাছের ফিলের চেয়েও অতিরিক্ত পোড়া দৃশ্যটি।

মিলির তো বেগুনি রং মোটেও পছন্দ নয়। কিন্তু ও পড়েছিল শাড়ি, টিপ, চুড়ি সব বেগুনি রঙের। চিংড়ি সুজয়ের মোটে সয়না। এলার্জিও বাড়াবাড়ি ওর। কিন্তু চিংড়ির দু’রকম ডিশ ছিল টেবিলে সেদিন। বাসমতির চিড়ল চিড়ল ভাতের দানাগুলোকে পোকার মত দেখাচ্ছিল যার ফলে বাথরুমে বমির তরল স্রোত অনেক বেশি আরামদায়ক ছিল সেদিন। আজও বেগুনি রঙের ম্যাক্সি উড়ছে ওদের ফ্ল্যাটের বারান্দায়। রাস্তার এত নাগালে এই ফ্ল্যাটটা মিলির পছন্দেই নেয়া। সিঁড়িতে ঢুকবে এমন সময় দেখতে পেল মোটরসাইকেলটা পার্ক করা। চওড়া হাসি খেলে যায় সুজয়ের ঠোঁটে। ছোবল মারার জন্য তৈরী সে। ড্রইংরুমে দু’টো কফির মগ পাশাপাশি। ধোঁয়া উড়ছে। সুজয় দেখলো কেউ নেই সেখানে। মিলির টুকরো কথা ভেসে আসছে কিচেন থেকে। সুজয়ের পেশির তলায় গরম রক্তের ছোটাছুটি। তিরতির করে কাঁপছে কপালের নীল শিরা। কিন্তু ট্রে হাতে যাকে বেড়িয়ে আসতে দেখলো তাঁর জন্য কোনভাবেই প্রস্তুত ছিল না সুজয়। মৃদঙ্গ চাকমা!

এক সময়ের তুখোড় ছাত্র নেতা। পরিস্কার মিষ্টি ভাষায় ডায়াসে উঠে বক্তৃতা দিত যখন হলরুমের ইটও কেঁপে উঠতো সে কথার তোড়ে। সেই যে নব্বইয়ের গণ অভ্যুথান, মিছিল, দেয়াল লিখন, পুলিশের লাঠি চার্জ, সব মিলিয়ে মৃদঙ্গ চাকমা ছিল এক দেশলাই কাঠির নাম। যার এক স্ফুলিঙ্গে পুড়ে যেত সব।

তুই?

মৃদঙ্গের মুখে ধারালো কিন্তু সুমিষ্ট হাসি। ঝকঝক করে উঠলো ঘরটা। মিলিরও ভ্রুতে দুষ্টুমির নাচন। চমকে দিলাম কেমন তোমাকে। আরে সেদিন ইকবালরা এসেছিল মনে আছে তোমার! ঐ দিনই তো জানলাম দেশে ফিরেছে ও। উফ! কি করে যে লুকিয়ে রেখেছিলাম খবরটা। নাও, দ্যাখো কত্ত কি এনেছে তোমার জন্য।মৃদঙ্গর বুকের বাম পাশটা লাফাচ্ছে খুব। সুজয় শক্ত করে জড়িয়ে কানের কাছে মুখ নামিয়ে বললো, পারলি না তো! আমরা কেমন ছোট হয়ে যাচ্ছি দেখেছিস। আর বাড়িগুলো কি উঁচু! মৃদঙ্গ কিছু বলতে যাবে এমন সময় দরজায় প্রচন্ড জোড়ে নক করলো কেউ। তিন জোড়া চোখ এক হলো। গুরুতর সে দৃষ্টি।

শীবব্রত দেচৌধুরী

অচেনা বৃষ্টির ভেতরে

অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি সঙ্গে দমকা হাওয়া , নিকশ কালো আঁকাশের বুক চিরে মাঝেমাঝে বিকট শব্দে বিজলী চমকাচ্ছে । চারিদিকে জনমানবহীন গা ছম ছম নিরবতা । এমনি প্রলয়ংকারী ঝড়ের রাতে মিরপুরের রাস্তা দিয়ে ল্যাম্প পোস্টের আবছা আলোয় পথ দেখে প্রাণপনে দৌড়ে পালাচ্ছে মেয়েটি । কোথাও যে গিয়ে আশ্রয় নিবে সেই সুযোগ টুকুও নেই । রাস্তার দু’পাশের দোকানপাট সব বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগেই । বৃষ্টিতে ভিজে ওর পরণের শাড়ীটাও অনেক ভারি হয়ে গেছে, তাই দৌড়তেও অনেক কষ্ট হচ্ছে। তার পরেও সে থেমে নেই কারণ পিছনে মানুষরুপী হায়নার দল তাকে ধাওয়া করছে । চৌরাস্তায় এসে ডানদিকে মোড় নিতেই অপর প্রাণ্ত থেকে দ্রুত ছোটে আসা সাদা রঙের একটা মাইক্রোবাস মেয়েটির সামনে এসে হার্ড ব্র্যাক করে থামলো । তারপর কী হলো মেয়েটির আর কিছুই মনে নেই । চোখ মেলে চেয়ে দেখে ও একটা বিছানায় শুয়ে আছে , আর ওর সামনে সাদা অ্যাপ্রন পরা এক মহিলা দাঁড়িয়ে । একরাশ বিশ্ময় নিয়ে মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো , ‘ আমি এখানে কেনো , কোথায় আমি?’ উত্তরে মহিলা বললেন , ‘মিস মিলা , আমি আপনার  ডা: আইভি। কাল রাতে রাস্তায় পেয়ে পুলিশ আপনাকে এই হসপিটালে রেখে গেছেন , আর একটু হলেই পুলিশের গাড়ির নিচে চাপা পড়তেন , অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেলেন । আপনার ব্যাগে পাওয়া আইডি থেকে জানা গেলো আপনার পরিচয় , বলুনতো কী হয়েছিলো কাল রাতে ? আপনি ওরকম ঝড়বৃষ্টির রাতে কোথায় ছুটছিলেন? ডাক্তার আইভির প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে মিলা কি যেনো বলতে চাইছিল কিন্তু ভয়ে ওর মুখ দিয়ে যেনো কোনো কথা বের হচ্ছিল না। হঠাৎ মিলা ওর কপালে অভিকের হাতের মৃদু পরশ অনুভব করলো, সঙ্গে অভিকের উদ্ভিগ্ন প্রশ্ন – এই , এই মিলা কি হলো তোমার , এমন করছো কেনো? মৃদু ঝাঁকুনি খেয়ে এবার সত্যি মিলার ঘুম ভাঙ্গলো, পাশে শোয়া অভিকের দিকে তাকিয়ে বল্লো ‘সত্যি তুমি আমার পাশে আছো ? তা হলে এতক্ষন আমি কী দেখলাম ?! না আমি আর তা ভাবতে চাইনা অভিক , আমার ভীষন ভয় করছে!’ অভিককে দুহাতে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা মাথা রেখে আবার ঘুমিয়ে পড়লো মিলা ।

 

মোর্জিনা মতিন কবিতা

হয়তো কোনো শ্রাবণ সন্ধ্যায়

মেয়েটি প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেও রাস্তা ধরে হাঁটছিলো। রাস্তা কাটা। খোড়াখুড়ি চলছে। চলুক। এই নোংরা ঢাকা শহরে শান্তিমতো কে কবে হেঁটেছে! তবু এই বৃষ্টিময় সকাল, প্রাক দুপুর, সদ্য বৈশাখে পড়া একটা দিনকে সে যত্ন করে যাপন করছে…

আহা, এই মুহুর্তটা সকাল না হয়ে যদি হতো সন্ধ্যা, কোলাহলপূর্ণ না হয়ে যদি হতো নিঝুম, বৈশাখের নয়, যদি বৃষ্টিটা হতো শ্রাবণের, সে যে ব্লক-বাটিকের কাজ করানো ঘরে পরার থ্রি-পিস পরে আছে, তার বদলে পরনে যদি থাকতো প্রিয় সবুজ রঙের তাঁতের শাড়িটা, আর সঙ্গে থাকতো একজন, তাহলে কি একটু বেশি ভালো হতো না…

‘আপা, কই যাইবেন’ বলে একজন রিকশাঅলা রিকশার গতি কমায়। মেয়েটি জবাব দেয় না। কাটা রাস্তার ফাঁক-ফোঁকড় দিয়ে,  খোড়াখুড়ি থেকে গা বাঁচিয়ে চলছে মানুষজন, যানবাহন। মেয়েটি ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে। ভিজে জবজবে হয়ে যাওয়ার পর সে ছাতা বের করল, মাথায় মেলে দিল, কেন না, একজন তাকে বৃষ্টিতে ভিজতে দেখে মনে মনে বলেছে, ‘তোমার জ্বর এলে আমারো যে জ্বর আসবে!’

মেয়েটি যাচ্ছে হাসপাতালে। কথা ছিল না আসার। সকালে রুটি ডিমভাজি আর কফি খেয়েছে নিজ হাতে বানিয়ে। স্বামীকে খাইয়েছে। এরপর স্বামীর ময়লা কালো রঙের শার্ট ধুতে বসেছে ওয়াশরুমে। ডিটারজেন্ট পাউডার দিয়ে ধোয়ার পরে তার মনে হলো, যথেষ্ট পরিষ্কার হয় নি। তাই সে কাপড় কাচা সাবান ডলছিল শার্টে। শার্টের বোতামের ছিদ্রগুলোতে সাবান এঁটে গেল তার অলক্ষ্যে, তাই সে ঘর থেকে টুথপিক এনে বোতামের ছিদ্রগুলো থেকে লেগে যাওয়া সাবান আলগা করছিল। হঠাৎ মেয়েটি কোমরে জুতো সমেত স্বামীর পা আবিষ্কার করলো! তার স্বামী তাকে লাথি মারছে! কেন! তার এই চিকন কোমরে কলসির গলার মতো ভাঁজ দুনিয়ার কোন নারীর নাই। কত পুরুষের কামনা এই কোমর- তার স্বামী কি জানে! সে কোন পুরুষকে গ্রহণ করে নি। আর, যখন কী না সে তার স্বামীরই শার্ট ধুয়ে দিচ্ছে কেবল ডিটারজেন্ট পাউডার আর সাবান দিয়ে নয়, পরম মমতা আর যত্নেও । স্বামী বললো, ‘এই মাগী, রুটি বানাতে পারিস না? রুটি গোল হয় না?’ মেয়েটির বানানো রুটি যদিও চাঁদের মতো গোল হয়! মেয়েটির বিশ্বাসভঙ্গের বেদনার কাছে কোমরে পাওয়া ব্যথা খুব নগণ্য ছিল। তবু তার মনে হলো আজ একটু হাসপাতালে যাওয়া দরকার। কাপড় ধোয়া শেষ করে সে ঘরের কাপড়েই বেরিয়ে এলো বাইরে।

তিন মাসের বিবাহিত জীবনে মেয়েটি স্বামীর কাছে থেকে কখনো স্বামীসুলভ আচরণ পায় নি। একদিন কীভাবে যেন মেয়েটি স্বামীর কাছে এসেছিলো। তারপর আর কাছে আসা হয় নি কারো। তবে একজন কয়েকদিন থেকে আছে মেয়েটির সঙ্গে। সে তার রাজকুমার অথবা রূপকথা। যেই থাকুক না কেন, মেয়েটি আর রাখতে চায় না তাকে। দ্রুত পায়ে এগোয় নিকটবর্তী হাসপাতালের গেটে। হঠাৎ-ই রূপকথা না রাজকুমার বলে ওঠে, ‘মা, আমি তোমার কাছে একটা সুন্দর জীবন চাই, একটা সুন্দর পরিবার চাই, একটা সুন্দর সমাজ চাই, একটা সুন্দর পৃথিবী চাই।’

মেয়েটি রাজকুমার বা রূপকথার সব দাবী-দাওয়া মাথায় নিয়ে ফিরে আসে ঘরে।

তার চোখে ভাসে একটা দৃশ্য- প্রিয় সবুজ তাঁতের শাড়ি পড়ে, শ্রাবণের নিঝুম সন্ধ্যার বৃষ্টিতে ভিজছে সে, সঙ্গে আছে তার তরুণী রূপকথা বা তরুণ রাজকুমার। বৃষ্টি ধুয়ে নিচ্ছে তাদের জীবনের অসুন্দর গল্পগুলো…

আতিক দর্জি

থাকে শুধু ভালোবাসা

মেয়েটি প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেও রাস্তা ধরে ছুটছিলো ! বৃষ্টির বাড়তি গতির সঙ্গে পাল্লা না দিয়ে মেয়েটি তাঁর চলার গতি কমিয়ে দিলো । এরকম ঝুম বৃষ্টিতে সবাই নিরাপদ আর শুকনো জায়গা খোঁজে । কিন্তু শিলা তা করলো না । নদীর পাশ ধরে রাস্তাটা পাকা ব্রিজের দিকে গেছে । শিলার গন্তব্যও ব্রিজের দিকেই। এখন আর হাটতেও ভালো লাগছে না । সে নদীর দিকে তাকায়। বৃষ্টি পড়ার মুহূর্তে নদীর সৌন্দর্য অন্যরকম হয়ে যায়। নদীর তীরবর্তী এলাকায় বাস হলেও কখনও এই দারুণ সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখা হয়নি। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এতো বড় যে নদীর পানি দারুণভাবে সরে গিয়ে ফোঁটাগুলোকে জায়গা করে দিচ্ছে । অতিরিক্তি তাপে পানি যেমন বল্কায় ঠিক তেমনি একটি দৃশ্য । শিলা’র ভাবনা জুড়ে এখন শুধু বৃষ্টি আর নদী ।একটু আগে তাঁর জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি মাথা থেকে উধাও ।বৃষ্টি যেন মনটা কে ধুয়ে দিচ্ছে। তুমুল বৃষ্টির মধ্যেও চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা পানি । বৃষ্টির ফোঁটা আর চোখের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় । নদীর পানি আর বৃষ্টির রোমান্টিকতায় মুগ্ধ শিলা আবার হাটতে থাকে সামনের দিকে ।বৃষ্টিস্নাত চোখে পিছনে ফিরে তাকায় । কোথাও কেউ নেই । পানি ভর্তি চোখ যেন কাউকে খোঁজে । নাহ্ আসবেনা- পিছন দিক থেকে মুখ সামনের দিকে ফেরানোর মুহূর্তে বিড়বিড় করে বলতে থাকে শিলা । তুষারের প্রতি শিলার ভালোলাগাটা সেই ছোটবেলা থেকেই । মুখে না বললেও তুষার সেটা টের পেতো । আর সেই সুযোগটাই নিলো আজ তুষার । খালি বাসায় জড়িয়ে ধরে ঠোটে চুমু খাওয়াটা বেশ উপভোগ করছিলো শিলা ! দিশাহারা হয়ে কখন যেন নিজেও পাগলের মতো তুষার কে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় ওর ঠোট মুখ ! একটানে যখন সালোয়ারের ফিতাটা খুলে ফেলে তুষার তখন শিলা বাঁধা দেয়ার শক্তিটাও যেন হারিয়ে ফেলে । হিংস্র ষাড়ের মতো গর্জন করতে করতে এক সময় নিস্তেজ হয়ে যায় তুষার। ভালোবাসাহীন এই কিছুটা সময় তুষারকে কেমন যেন অচেনা মনে হয় শিলার কাছে। কিছুটা স্বার্থপরও মনে হয় । বের হওয়ার সময় একটি বারের জন্য ফিরেও তাকালো না ছেলেটি । এই বৃষ্টির মধ্যে মেয়েটিকে একা ছাড়া কতটুকু ঠিক হচ্ছে এই ভাবনাটাও যেন নেই। আর পিছনে তাকায় না শিলা। সামনের দিকে হাটতে থাকে। খুব দ্রুত । নিজেকে খুব ছোট মনে হয়। কালকে যখন দেখা হবে তুষার মনে হয় তাচ্ছিলের সঙ্গে তাকাবে তাঁর দিকে। বিষয়টি ভাবতেই শিলার কেমন যেন লাগে। বৃষ্টি আরও বাড়ে। তুমুল বৃষ্টি । হাটতে হাটতে ব্রিজের প্রায় কাছে চলে আসে শিলা । বর্ষার শুরুতে পাকা ব্রিজ থেকে পানি অনেক নিচে থাকে। স্রোতও কম । কালো মেঘে ঢাকা অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে মাথাটা ঘুরতে থাকে শিলার। ব্রিজের রেলিং ধরে শক্ত করে দাড়ানোর চেষ্টাটাও বিফল হয়ে যায় । হাত ফসকে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে নিজের জীবনটা কে খুব দামি মনে হয় । আকাশের ঘনকালো মেঘের আড়াল থেকে বিদ্যুতের চমকানোটা তার চোখে লাগে । ব্রিজের রেলিং থেকে ফসকে যাওয়া শিলার হাতটা ধরে ফেলে কেউ একজন । শরীরটাকে লেপ্টে নেয় নিজের শরীরের সঙ্গে। মেঘের ডাকাডাকি আর গর্জনে চারদিক প্রকম্পিত । মেঘে মেঘে ঘর্ষণে বিদ্যুৎ চমকায়। অন্ধকার পৃথিবীটা হঠাৎই আলোকিত ওঠে । ঠান্ডা বৃষ্টির কয়েকটি ফোঁটা একটু গরম মনে হয় শিলার কাছে । চোখ মেলে তাকায় সে । মাথাটা তার তুষারের কোলে । বৃষ্টি আরও বাড়ে তুমুল বৃষ্টি ।

রিয়াদুল হক

শেষবারের মত অপেক্ষা

মেয়েটি প্রচন্ড বৃষ্টির মাঝেও রাস্তা ধরে ছুটছিল। বৃষ্টির রাতে গাড়ী গুলো তার ছায়া বিদীর্ণ করে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন অপেক্ষা করে সে অনিমেশের। কিন্তু অনিমেষ আসেনা। কিন্তু শুক্লা যে অনড় তার ভালোবাসাকে সে নিজের করে নেবেই। ৭ বছরের দীর্ঘ প্রনয়ের শেষটা কেন বেদনার হবে। ঝগড়া তো হতেই পারে। তা বলে একে অপরের ছায়াও মারাবে না তা তো হতে পারে না।

ভেতর বেড়ে উঠা সত্ত্বাটা আর উপেক্ষা করতে পারছে না শুক্লা ইদানিং। সেটা যে ক্রমাগত জানান দিচ্ছে তার অস্তিত্ব। অনেকটা ক্লান্ত শরীর নিয়ে হেলতে দুলতে আগের জায়গায় ফিরে আসে শুক্লা। ঠিক যেখানটায় অনিমেষ ফেলে দিয়ে গিয়েছিল। এরই মাঝে লোক জমেছে অনেক।

শুক্লা অবাক হয় এখনি তো খালি ছিল কেউ ছিল না। লাল, নীল  কাল রঙের ছাতা গুলো ভেদ করে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় ঘটনা স্থলে। তাকিয়ে যা দেখে তা বিশ্বাস  হচ্ছিল না। এ যে ওর ই লাশ। চোখগুলো স্থির অব্যক্ত শুন্যে তাকিয়ে। চারপাশে চিৎকার আর অ্যাম্বুলেন্স এর শব্দ কানে ধরে আসছিল। এই দৃশ্যপট অতীত হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু প্রতিদিন যেন আবার নতুন করে দেখে শুক্লা।

তারপর অনেকদিন হয়ে বছর গড়িয়েছে।

এতদিনে শুক্লা নিজেও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। এত দিনের অপেক্ষায় এই রাস্তা তার নিজের  আবাসে পরিনত হয়েছে।

আজ ভুত চতুর্দশী। পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়া মানুষগুলো এই রাতে তাদের প্রিয়জনকে দেখতে আসে। শুক্লা  এতদিন এই রাতের অপেক্ষায় ছিল। আজ চিরতরে অভিমান ভাঙাবে অনিমেশের।সঙ্গে করে নিয়ে যাবে ওকে।

আর জিজ্ঞেস করবে কি দোষে সেই রাতে গাড়ী থেকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। ভালোবাসার রঙ ফিকে হয়ে গিয়েছিল। ভালো লাগার মানুষটা পরিনত হয়েছিল পিশাচে।

শুক্লা ভেতরে বাড়তে থাকা আরেকটি রক্তপিন্ডকে চেপে ধরে চিরবিদায় নিয়েছিল এই ধরা থেকে।

তাই আজ শেষবারের মত অপেক্ষা।

ছবিঃ গুগল