ওগো বিদেশিনী…

বৈতরণী হক, হ্যাম্পশায়ার, ইংল্যান্ড

২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের কথা। আমার মেয়ে হয়নি তখনো। আমি আর আমার হাজবেন্ড ওয়াসি খুব বেড়াতাম তখন। ওয়াসির লম্বা ছুটি থাকায় আট-দশদিনের জন্য চলে গেলাম সুইজারল্যান্ডে। পর্যটন খ্যাত এলাকা ইন্টারলাকেনে কয়েক দিন কাটিয়ে যাত্রা করলাম জেনেভার পথে। জেনেভা যাচ্ছিলাম ট্রেনে। সুযোগ থাকায় ট্রেন বার্ণে আসার সঙ্গে  সঙ্গেই হঠাৎ করে আমরা নেমে গেলাম সেখানে যদিও আমাদের প্ল্যানে বার্ণে নামার কথা ছিলোনা। যাহোক তখন ভর দুপুর, আমাদের খুব খিদে পেয়ে গিয়েছিলো। এক রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। বুফেতে খাবার নেওয়ার সময় খেয়াল করলাম একজন বৃদ্ধ মহিলা আমাকে অনেক সময় ধরে বেশ দূর থেকে মনোযোগ দিয়ে দেখছেন। হঠাৎ উনি আমার কাছে এসে বললেন আমি বাংলাদেশি মেয়ে কিনা। আমি খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলাম কি করে বুঝলেন আমি বাংলাদেশি মেয়ে। উনি হেসে বললো আমার চোখ দেখে উনি বুঝতে পেরেছেন। এই কথা শুনে আমি ভীষণ আশ্চর্য  হয়ে গেলাম। ওখানে ভারতীয় মেয়েদের অভাব নেই বরং বাংলাদেশি খুব কম। সাদা সুইস বৃদ্ধার মুখে নির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের নাম শুনে মনে দোলা লাগার তো কথাই।

কিন্তু পরে উনি আমাদের যা শোনালেন তা আমার মনে আজো নাড়া দিয়েই চলেছে। ৮৪ বছরের মহিলা  (২০১৫ সালের কথা) পাশে বসে আমাদের সঙ্গে জীবনের কত কথাই না বললেন। মহিলার যখন ৬০ বছর তখন উনি তাঁর থেকে ২৫ বছরের ছোট এক সুইজারল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি ছেলেকে বিয়ে করেছিল। দীর্ঘ আট বছর সংসার করার পর উনার মনে হয়েছিল লোকটার জীবন এভাবে যেতে পারেনা তার সঙ্গে থেকে লোকটা সুখী হতে পারছেনা স্বাভাবিক ভাবে উনি বুঝতে পারছিলেন। তাই উনি স্বেচ্ছায়  লোকটিকে  ডিভোর্স করে দেন। ওই লোক পরে বাংলাদেশি এক মেয়েকে বিয়ে করেছেন, হয়েছেন দুই ছেলের বাবা। বৃদ্ধার তখন পর্যন্ত তার প্রাক্তন স্বামীর বাড়িতে যাতায়াত ছিলো আর উনি খুব খুশি যে তার স্বামী তার পরের স্ত্রী আর ছেলেদের নিয়ে সুখে আছেন। মজার কথা হলো সেই দুই ছেলে তাদের সৎ মাকে দাদী বলে ডাকে।

উনি যখন আমাদের সব বলছিলেন আমি উনার মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। আমি ওই ভদ্রলোকের কথা জানিনা কেন উনি পঁচিশ বছরের বড় সুইস মহিলাকে বিয়ে করেছিল তা নিয়ে গবেষণা করতেও চাইনা শুধু বুঝতে পারলাম যে ৮৪ বছরের মহিলা লোকটাকে খুব ভালোবাসে। এত দিন পর এত বছর পর উনি যেভাবে স্মরণ করছিলো সব তাতে বুঝাই যায় তার ভালোবাসার গভীরতা কতখানি, বৃদ্ধার চোখে মনে হচ্ছে আলো জ্বলছে ওই লোকটার কথা বলতে বলতে। লোকটার প্রতি বিন্দুমাত্র অভিযোগ নাই, রীতিমত লোকের প্রশংসায় মুখর। কথা শুনে বোঝাই যাচ্ছিল অযথা লোকটাকে আঁকড়ে ধরে না রেখে মুক্ত করে দিয়েছিল লোকটার সুখের জন্য। মহিলা বাংলাদেশে কখনো আসেননি তবে তার সাবেক স্বামীর মুখে শুনেছেন বাংলাদেশের কথা। তা নিয়েও উনি অনেক গল্প বললেন। খুব ইচ্ছা করছিলো উনার সঙ্গে  আরো কিছু সময় কাটানোর তবে ট্রেনের সময় হয়ে যাওয়াতে তা পারিনি। ভাগ্যিস সেদিন কোন কারণ ছাড়াই বার্ণে নেমেছিলাম তা না হলে এমন একটা অন্যরকম ভালোবাসার কথা জানতামই তো না!

নাটক সিনেমাতে আমি এইরকম  কাহিনী দেখলে সবসময় ফ্রেন্ড আর কাজিনদের সঙ্গে  মজা করে বলতাম সত্যিকার ভালোবাসা জাতি, ধর্ম, বয়স নির্বিশেষ- কথাগুলো বলতাম আর হাসতে হাসতে মাটিতে লুটিয়ে পড়তাম। কিন্তু এই বিদেশিনীকে না দেখলে বুঝতাম না যে ভালোবাসা আসলেই সবকিছুর উপরে আর ভালোবাসা প্রাপ্তি কখনো ত্যাগেও মিলে।

জানিনা সেই সুইস বৃদ্ধা বেঁচে আছে কিনা, বেঁচে থাকলে কেমন আছে। যেখানেই ভালো থাক হে বিদেশিনী- আমার মনে সবসময়ের জন্য এক সুন্দর স্মৃতি তুমি, তোমার জন্য  আজীবন আমার মনে জমে থাকবে অকৃত্রিম শ্র্দ্ধা আর ভালোবাসা।

ছবি: শিল্পী কনক চাঁপার ফেইসবুক থেকে