কে গাহিলো গান

শিল্পী কনকনকচাঁপা কচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

বয়স আমার ছয় কি পাঁচ, বাবা জানলেন আমি গাইতে পারি তখন থেকেই আমার কঠিন কঠিন গানের সঙ্গে পরিচয়। চাকুরীজীবী বাবা আগে নানাভাবে অবসর কাটাতেন।বন্ধুবৎসল মা বাবা প্রতিবেশীদের সঙ্গে ক্যারাম লুডু বাগাডুলি খেলতেন। বাবা নিজ হাতে লুডুর ঘর বানাতেন পিচবোর্ড এ ছক কেটে।তাতে খালাম্মাদের নাম লেখা থাকতো। পিনু মিনু মোনা বিনু।পাশাপাশি চার বাসার আন্টিদের ও আমার মায়ের নাম।ক্যারামের আড্ডায় বরিক পাউডারে ঘর বাড়ি পিছল হয়ে থাকতো। চাল ভাজা, কাঠালের বীজ ভাজা, কাঁচাকলা তেতুল ভর্তার নহর বয়ে যেতো। এইসব আড্ডাবাজীর ফাঁকে পাড়ার বাচ্চাদের আব্বা খালি গলায়ই শেখাতেন ” হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথে, চেয়োনা সুনয়না আর চেয়োনা, পথ চলিতে যদি চকিতে “এই ধরনের গান।হঠাৎই আব্বার এই ধরণের আড্ডা ও গান শেখানো কমে যেতে লাগলো কারণ আব্বা আমাকে আবিষ্কার করলেন নতুন ভাবে।দ্রুতই আব্বার রুটিন বদলে গেলো। বিকেলবেলা করে শেখাতে লাগলেন “মধুবনমে রাধিকা নাচেরে,পাওমে মুরালিয়া বাজেরে ” কঁহি দ্বীপ জ্বলে কঁহি দিল” আজারে ম্যায়তো কবসে খাড়ি ইস পার”। আম্মা রেগে যান, বলেন হিন্দি উর্দু ছাড়া তোমার গান হয়না? আব্বা লজ্জা পেয়ে বলেন মোমেনা, এই গান গুলোতে বড্ড সুন্দর কারুকাজ। আম্মা দাবার নতুন চাল দেন, নজরুল সংগীত এ কাজ নাই? আব্বা অবাক হয়ে হেসে বলেন তুমি তো ভালোই জানো দেখি! আম্মা তাচ্ছিল্য করে বলেন আমার আব্বার হারমোনিয়াম আছে ভুলে গেলে? এভাবেই চলতে থাকে জীবন, গানের খানাখন্দ, চড়াই উৎরাই পেরোই বাপ মেয়ে মিলে। এবার একটা হারমোনিয়াম উপহার পাই জেসমিন নানীমার কাছ থেকে, সে এক ভীষন আনন্দের অধ্যায়।নানাবাড়ির হারমোনিয়াম কালো, আর এ হারমোনিয়াম মেহগনি রঙের।অপূর্ব সুরেলা, যেন অন্তরের সব আরাধ্য কান্না, প্রেম, অনুরাগ, উপাসনা হারমোনিয়ামেই ভরা।আমি বাজাতে থাকি, যে সব সুর আমি জানি হুকুম দেবার আগেই আঙ্গুল সাদাকালো রীডে দ্রুত চলতে থাকে সুরে সুরে তালে।আব্বা চমৎকৃত! কারণ আব্বা বাজাতে পারেন না।খুব অবাক হয়ে চেয়ে থাকেন, হয়তো বা কান্না চাপান।কি জানি এসব হয়তো মনের কল্পনা। জীবনে পয়লা শেখা গান আমার “খোদার প্রেমের শরাব পিয়ে, দ্বিতীয় গান “ঐ জলকে চলে লো কার ঝিয়ারি ” যা শেখান আব্বা, দশ মিনিটেই শিখে যাই।এখানেই আব্বার আপত্তি! দশ মিনিটেই শেষ? এ শিখে লাভ কি! এই মেয়েকে এতো কঠিন কিছু দিতে হবে শিখতে নিদেনপক্ষে একঘন্টা যাতে লাগে।তবেই না সে গান এ মেয়ের কন্ঠে যাদুকরী গান হয়ে বিশেষ কোন গান হয়ে যাবে।

কি মুশকিল! কোথায় পাওয়া যায় সেই গান! বাবার গান খোঁজা শেষ হয়না।সংসারের কাজ কর্ম করা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছেন আব্বা, সেগুলো গিয়ে পড়ে আম্মার কাঁধে।সংসার এলোমেলো হতে গিয়েও মায়ের বিচক্ষণ হাতে তা ঠিকই এক ছন্দে চলতে থাকে।শুধু দায়িত্বের কাঁধবদল হয়। ওস্তাদজী বশীর আহমেদ যখন থেকে আমাকে শিষ্য হিসেবে হাতে নিলেন তখন থেকেই আব্বার স্বস্তি পাওয়ার কথা, কিন্তু আব্বা আর শান্ত হলেন কই, পৃথিবীর কঠিনতম গানের সঙ্গে তার মেয়ের পারঙ্গম ক্ষমতার যুদ্ধ তিনি লাগিয়েই ছাড়বেন। হাহাহাহা।হঠাৎ আব্বা ফ্ল্যাশব্যাক এ কিছু গান পেয়ে গেলেন।এবং তা ঠিকঠাক লিখে আমাকে শেখানন শুরু করলেন।আমি শিখতে থাকলাম গানে মোর কোন ইন্দ্রধনু আর স্বপ্ন ছড়াতে চায়… মিতা মোর কাকলী কুহু… কুহুর কাছে এসে আব্বা বিপদেই পড়লেন।এমনিতেই সাত মাত্রার তালের গান, তা সামলানোই কঠিন, তায় সুরশ্রী সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়! কঠিন গানের কঠিন তালের কঠিন আবর্তে আব্বা ফেঁসে যাচ্ছিলেন।কুহু বলে সুরশ্রী যে টান দিয়ে তার কম্পনাঙ্ক বড় থেকে ধীরেধীরে কমিয়ে আনতে থাকেন তা আব্বা গেয়ে আমাকে বুঝাতে পারছিলেন না।চিত্রকর বাবা আমার এবার কলম ধরলেন, ছবিতে গানের লেংথ আঁকতে চেষ্টা করলেন।আম্মার উষ্মা ভরা উচ্চারণ “ঘর দেখি পাগলে ভরে গেলো “আব্বাকে সংকুচিত করে দিতে গিয়েই আব্বা দম নিয়ে আবার প্রসারিত হতে চেষ্টা করেন।এবার আব্বার মাথায় উপযুক্ত উদাহরণ এসে ভর করে।আব্বা বলেন মাগো, পিংপং বল মাটিতে পড়ার আওয়াজ শুনেছো? বলি না আব্বা, শুনিনি।আব্বা বল কিনে আনেন, তার পতনের শব্দ শোনান।আমি গেয়ে উঠি মিতা কাকলী কুহু উ…. উ…উ…উ—উউউউউউউ…… আব্বা যেন আর্কিমিডিস! ইউরেকা বলেন কি? না, বলেন না, তাতে মেয়ের অহংকার আসতে পারে।ইউরেকা শব্দ চেপে গিয়ে বলেন বা ভাবেন আরো কঠিন গান কই পাই! হাহাহা।

একদিন অফিস থেকে এসে হন্তদন্ত হয়ে বসলেন। নিজের হাতে লেখা একটি গান বের করলেন, বললেন মাগো, অনেক কঠিন গান, কিন্তু তুমি পারবে, দম নাও মা।আমি হাসি, কঠিন সহজ আমি কখনওই বুঝিনি, তখনো না, এখনো না।শেখা লাগলে শিখবো, অসুবিধা কি! আব্বা শেখাচ্ছিলেন প্রতিমা বন্দোপাধ্যয় এবং চিন্ময় লাহিড়ীর গান, ত্রিবেণী তীর্থ পথে কে গাহিল গান।জাগায়ে তুলিলো মোর আকুল পরাণ! আহা! কি গান! আব্বা শেখান, গাইতে থাকেন, নিজেই নিজের সঙ্গে যুঝতে থাকেন, কান খাড়া করে বুঝতে চান তিনি যে শেখাচ্ছেন তা কি সঠিক ভাবে পারছেন? আমি আব্বার উদ্বিগ্নতা বুঝি কি বুঝিনা তাও বুঝিনা। গানের সঞ্চারী তে কিবা তব নাম খানি আমারে শুধাও, না বলা কথাটি মোর যাও বলে যাও, এই মোর শব্দটিতে কি নাকি একটা কাজ আছে আব্বা কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না, সেই দুঃখ রাখবার মত কৌটা আব্বার বা আম্মার ছিলোনা।আমার কি আর করার আছে, আমিও অসহায়।তারপর অনেকদিন পার হয়।সেই গান আমি অনেক গেয়েছি।গাইতে হয়েছে।কাউকে গান শোনাতে গেলেই আব্বা এই গান শুনিয়ে বোঝাতে চান তার কন্যা আয় তব সহচরী হাতে হাত ধরি ধরি গানের জন্য জন্মায়নি।হাহাহা। কিশোর বয়সে পৌঁছেছি, আব্বা এখন খালি তদারক করেন।কারণ তার জানা গানের ঝুলি আমি চেটেপুটে খেয়ে ঠনঠন করেছি শৈশবেই।বড় মামা আজিজুল বারী আমাকে একটা ক্যাসেট প্লেয়ার কিনে দিলেন।আমি বেছে বেছে ক্যাসেট কিনে এ গানটির ওই জায়গাটা সঠিক ভাবে তুলে নিয়ে আব্বার অফিস থেকে ফেরার পথে চেয়ে থাকি।আব্বা আসেন, আমি হারমোনিয়াম নিয়ে বসে পুরো গান শোনাই।আব্বা বিস্মিত, অনেকক্ষন চুপ থেকে অশ্রু সামলে বলেন, মাগো,আমার গানের পাখী, এই সঠিক কাজ তুমি কই পেলে! আমি বলি আব্বা, ক্যাসেট থেকে শিখেছি।আব্বা যেন কৃতজ্ঞ হয়ে গেলেন।পরিপূর্ণ হয়ে গেলেন।একটি সঠিক কারুকার্য তাকে অপূর্ণ করে রেখেছিল।তাঁর কন্যা সে শুন্যস্থান পূরণ করলো যেন। আজ আট বছর আমি আর এ গানটি গাইনা।একটা কারুকাজ আব্বাকে অপূর্ণ করে রেখেছিল, সেই আব্বা তাঁর পুরো উপস্থিতি হাতে নিয়ে চলে গেছেন। আমি তাকে কি দিয়ে পূরণ করি, কিন্তু আমার হৃদয়ের বাম অলিন্দে খালি বেজে যায় কে গাহিলো গান, জাগায়ে তুলিলো মোর আকুল পরাণ! বাবা, তুমি আর তোমার গান? কোথায় বাবা?

চিত্রশিল্পী: কনকচাঁপা