আক্ষেপ …

মাসুদুল হাসান রনি

ফেইসবুক এর গরম আড্ডা চালাতে পারেন প্রাণের বাংলার পাতায়। আমারা তো চাই আপনারা সকাল সন্ধ্যা তুমুল তর্কে ভরিয়ে তুলুন আমাদের ফেইসবুক বিভাগ । আমারা এই বিভাগে ফেইসবুক এ প্রকাশিত বিভিন্ন আলোচিত পোস্ট শেয়ার করবো । আপানারাও সরাসরি লিখতে পারেন এই বিভাগে। প্রকাশ করতে পারেন আপনাদের তীব্র প্রতিক্রিয়া।

বইপড়া নিয়ে ইদানীং খুব বেশী আক্ষেপ বাড়ছে। গত দুইমাসে কেনা কতগুলি নতুন বই স্তুপ হয়ে পড়ে আছে ঘরের বিভিন্ন জায়গায়। কতদিন ভাবি একটা একটা করে পড়ে ফেলবো কিন্তু কেনার পর বইগুলি ছুঁইয়েও দেখা হয়নি।কোনটার প্যাকেট খোলাও হয়নি। জানি না এগুলি কবে পড়ে শেষ করবো। তারপরও আজ আবার বৃষ্টিস্নাত বিকেলে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৭ম তলায় বাতিঘর হতে বেশকিছু বই কেনা হলো। অথচ একসময় প্রচুর বই পড়া হতো ।বইপড়ার ক্ষেত্রে ছিলাম সর্বগ্রাসী । সবধরনের বইই পড়তাম,এখন অবশ্য রাজনীতি,জীবনী, ভ্রমন , ইতিহাসের বই বেশী টানে।
এখন সময় ও ব্যস্ততার কারনে পড়া হয়ে উঠে না বলে খুবই কস্ট হয়। কিন্তু আমার বই পড়ার অভ্যাসটা শুরু হয়েছিলো খুব ছোটবেলা খেকে। সময়টা গত শতকের সত্তুরের শেষ আশির দশকের শুরু। ক্লাস ফোর কি ফাইভে যখন পড়ি , তখন থেকে পড়ার নেশা শুরু হয়েছিলো। ক্লাসের পড়া ফাঁকি দিয়ে গোগ্রাসে গিলে খেতাম শিবরাম চক্রবর্তী,লীলা মজুমদার,আশাপূর্ণা দেবী,বিভুতিভুষন বন্দ্যোপাধ্যায়,সুকুমার রায়, সত্যজিত রায়,হাবীবুর রহমান ,মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন , শাহরিয়ার কবির,জুলেভার্ণ, স্যার আর্থার কোনান ডায়েল,জিম করবেট,ডানিয়েল ডিফো ।
এসময় দেব সাহিত্য কুটিরের কত বার্ষিকী যে পড়েছি ,এখন মনে করাও মুশকিল । এই লেখকদের বই আমাদের চট্টগ্রামের বাসায় কিছু ছিলো, কিছু পাড়াতো চাচা , ফুপিদের সংগ্রহ থেকে এনে পড়া হতো । পাড়াতো চাচারা হলেন আমার চাচাদের বন্ধুরা ,ফুপিরা হলেন আমার চার ফুপির বান্ধবীরা । বই দেয়াতে তাদের উৎসাহ কম ছিলো না ।
আরো কিছুদিন পর যখন ক্লাস সিক্সে উঠি তখন হাতে চলে আসে বড়দের গল্প ,উপন্যাস । আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নীহার রঞ্জন , ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায় ,শংকর , তারাশংকর বন্দ্যোপাধ্যায় ,বনফুল ,সমরেশ বসু , সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,রাহাত খান,সৈয়দ শামসুল হক । এসব বই পড়তে পড়তে কারো কারো চোখে ইচঁড়েপাঁকা হয়ে উঠেছিলাম ! মনে পড়ে সেভেন এইটে এসে থ্রিলার পড়ায় খুব ঝুঁকে পড়েছিলাম ।সে সময়টা আমরা বাসাবোতে থাকি ।আমার খুব প্রিয় এক বন্ধু ছিলো আহসান হাবীব । সে আমার নেশা ধরিয়ে দেয় রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুর , কাজী আনোয়ার হোসেনের কুয়াশা , মাসুদরানা সিরিজের বই পড়তে দিয়ে । বিনিমযে সে আমার বাবার সংগ্রহের ইংরেজী সাহিত্যের প্রচুর বই নিয়ে যেত। ইংরেজী সাহিত্যের নামীদামী লেখকদের সেই বইগুলোর অনেকগুলোই এখনো আমার সংগ্রহে আছে ।
তবে বই পড়ার অভ্যাস সুত্রপাতের আরো আগেই পেপার পড়ার অভ্যাসটা শুরু হয়েছিলো দাদা,বাবা,চাচা ও ফুপিদের দেখে দেখে । আমাদের চট্টগ্রামের বাসাটা ছিলো একান্নবর্তী পরিবারের। জন্মের পর থেকেই দেখেছি বাসায় নিয়মিত ৪/৫টি পত্রিকা রাখা হতো । এই র্দুমুল্যের বাজারেও যা এখনো অব্যাহত ।ঘুম থেকে উঠে পেতাম স্থানীয় পত্রিকা দৈনিক আজাদী । দুপুরে পেতাম ঢাকার পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজারভার ।এই ৩টি পত্রিকা মুলত: আমার দাদা , বাবা ও চাচাদের পড়ার পর হাতে পেতাম ।ফুপি ও মা-চাচীদের জন্য আসতো সাপ্তাহিক বেগম, সিনে পত্রিকা চিত্রালী , পুবার্র্নী ও বিচিত্রা। এইগুলোর প্রতি তেমন আর্কষন না থাকলেও।

তারপরও আমি সিনে বিনোদনের এক দূর্নিবার আর্কষনে কাড়াকাড়ি করে পত্রিকাগুলি দখলে নিতাম। চিত্রালীতে বড় বড় রংগিন ছবি ছাপা হতো কবরী, ববিতা, শাবানা,অলিভিয়া সহ কত অভিনেত্রীর! সেই ছবিগুলোর আর্কষন কম ছিলো না। বিচিত্রার প্রবাস থেকে, কুরুক্ষেত্র, ফ্যাশন কিংবা ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনের দারুন ভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। প্রতি সাপ্তাহে এ বিভাগগুলো বাড়ির সবার আগে পড়া চাই, তাই পত্রিকা আসলে সবার আগে দৌড়ে যেতাম হকারের কাছে। আসলে এভাবেই বই বা পেপার পড়ার অভ্যাসটা গড়ে উঠেছিল বলেই আজো সেই পড়ার নেশাটা রয়ে গেছে।এখনো প্রতিদিন সকালে প্রথমেই পেপার পড়া চাই। যেদিন সকালে পেপার দেখা হয় না, মনে হয় কি যেন বাকী থেকে গেল!
পেশাগত কাজের ব্যস্ততায় সময় করে এখন আর বই, ম্যাগাজিন পড়া হয়ে উঠে না বলে দারুন মর্মবেদনায় ভুগি।দিনের একটা বিরাট অংশ এখন দখল করে নিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। যতোদিন বেচে থাকবো ততোদিন বই পড়তে না পারার কস্ট অনুভুত হবে মর্মে মর্মে।

ছবি: গুগল