না বলা একটি সত্য গল্প

খোশরোজ সামাদ

বাবার সরকারী চাকরির সুবাদে স্কুল জীবন টাংগাইলে কেটেছিলো।মস্ত বাগান বাড়ির দোতলায় আমরা থাকতাম ।নিচতলায় কেয়ারটেকার থাকতো ।নাম মংলা ।বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই ।পেটা শরীর ।সে বিয়ে করে নি।একাকীই বিশাল বাড়িটার নীচতলায় থাকতো। সেই আলিশান বাড়ির চৌহদ্দির মাঝখানে বড়সর আকারের বাগান ছিল।কত শত ফুল-ফলের গাছ যে ছিল! মংলা কত বেতন পেত সেটা জানা না থাকলেও খুব কায়ক্লেশে যে দিনযাপন করতো এটা বেশ বুঝতে পেতাম ।দোতলা থেকে মংলার ঘর দিব্যি দেখা যেত ।বেশীর ভাগ দিন শাকান্ন ,ক্বচিৎ ছোট মাছ।কখনও মাংসের স্বাদ পেত কি না জনতে পারি নি ।ছেঁড়া লুঙ্গি ,রংচটা দু একটি ফতুয়া ,পায়ে চটি।

বাড়ির মালিক ছিলেন এক মেজর সাহেব ।তিনি পৈতৃক সুত্রে বাড়ীটি পেয়ে আমাদের ভাড়া দিয়ে অন্য শহরে থাকতেন । তিনি কদাচ আসতেন ।’বাড়িটির ঠিকমত পরিচর্যা হচ্ছে না’ এই জাতীয় কথা বলে মংলাকে উচ্চস্বরে শাসাতেন ।একবার ছোটখাট চুরি হল।সেই মেজর মংলাকে ভয়াবহ রকম মারলেন ।রক্তারক্তি হল। বুড়ো মংলা হাউমাউ করে কাঁদল ।পরে জেনেছিলাম মংলা মেজর সাহেবের আপন ফুপাত ভাই ।বেচারার জন্য আমার মন খুব খারাপ হলো।

কিছুদিন পর বিশ -বাইশ বছরের এক মেয়ে ছোট শিশুসহ মংলার কাছে এলো ।মেয়েটি মংলাকে ‘মামা’ বলে ডাকত ।শুনলাম মেয়েটির নাম সখিনা ।তার স্বামী তাকে যৌতুকের জন্য তালাক দিয়েছে। সহায় সম্বলহীন সখিনা শিশুপুত্র সেখানেই থাকা শুরু করল ।একদিন কারেন্ট চলে গেল ।খুব গরমে ঘুম ভেঙ্গে গেল।বারান্দায় দাঁড়ালাম। চাঁদের আলোতে মংলা আর সখিনাকে একসঙ্গে দেখলাম। গা গুলিয়ে উঠলো ।কিশোর মনে মংলার জন্য যতটা ভালোবাসা ছিল মুহূর্তেই সেটি যেন ঘৃণায় রূপ নিল ।মংলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে খারাপ মানুষ ভাবা শুরু হলো ।এই গল্পটি লজ্জায় কখনও কাউকে বলা হয় নি।

পেশা আর নেশার কারনে দুনিয়ার অসংখ্য জনপদ ,নগরী ঘুরেছি। বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে আলাপ হয়েছে । ।আফ্রিকার কঙ্গোর জেলখানা ঘুরে দেখেছি ।কয়েদীদের সঙ্গে কথা বলেছি । যাদের সঙ্গে কাজ করেছি তাদের অনেকেই সাদা চামড়ার ইউরোপীয়।খুব কাছের থেকে এদের দেখেছি । ভদ্রবেশের আড়ালে এদের কেউ কেউ ছিল উন্নাসিক ।কালো চামড়ার মানুষকে কৃত্রিম ভালোবাসা দেখাতে গিয়ে তাদের প্রতি অবজ্ঞা ,ঊপেক্ষা কখনও বা কদর্য ঘৃণাও প্রকাশ পেয়ে যেতো ।

এদের পূর্বপুরুষেরা কালোদের ক্রীতদাস করে রেখেছিলো।অমানবিক অত্যাচার , কথায় কথায় কালো মেয়েদের উপর যৌন নির্যাতন এরা ‘অধিকার’ মনে করতো। এরা বেনিয়ার বেশে এসে এই বাংলাকে দুইশ বছর শাসন-শোষন করেছে।নীল চাষিদের চাবকে পিঠের চামড়া তূলে নিয়েছে । বিদ্রোহের অজুহাতে বাংলার সৈনিকদের প্রকাশ্য দিবালোকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছে ।

কুট কৌশলে শাদা চামড়ার ‘ভদ্র’ মানুষগুলি এশিয়া আফ্রিকার প্রায় সব দেশ দখল করে শত শত বছর উপনিবেশ বানিয়ে রেখেছিলো ।এরাই শত বর্ষব্যাপী যুদ্ধ করেছে । এই সুন্দর গ্রহের উপর প্রথম এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের অভিশাপ চাপিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় কোটি কোটি শিশু -নারী – নিরাপরাধ অসামরিক মানুষকে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করেছে ।

আজকাল কাগজ খুললে দেখা যায় ,এই বাংলায় তস্করেরা ব্যাংক লুটে নিয়েছে ।ভূমিদস্যুরা জলাশয় দখল করে এই নগরীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে ।শক্তিধরেরা উন্মত্ত হয়ে শিশু -কিশোরীদের গণ ধর্ষণ করছে ।

বেশ কিছুদিন আগেই জেনেছি সেই মংলা মারা গেছে ।হ্যা,সেই মংলা ,সেই খারাপ লোকটি ।আচ্ছা ,যারা ব্যাংক লোপাট করে ,রাজধানীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলে ,শিশুকে গণধর্ষণ করে হত্যা করে তাদের চেয়েও কি মংলা বেশী খারাপ লোক ছিল ???

ছবি: গুগল