রেবেকা বেঁচে আছে আজও

ডাফনে দ্যু মরিয়ে

আশি বছর ধরে বইটা রয়েছে বেস্টসেলার তালিকায়। ১৯৩৮ সালে বেরিয়েই হিট। কুড়ি হাজার কপি প্রিন্ট হয়েছিল, এক মাসের মধ্যে ছাপতে হয়েছিল আরও কুড়ি হাজার। এখনও প্রতি মাসে হাজার চারেক কপি বিক্রি হয়। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ডে এক সমীক্ষায় দেখা গেছে দু’শো বছরের বেশী সময় ধরে জনপ্রিয় উপন্যাসের তালিকায় রয়েছে, জেন অস্টেনের ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস,’ শার্লট ব্রন্টের ‘জেন আয়ার,’ জর্জ অরওয়েলের ‘নাইনটিন এইট্টিফোর,’ লি হার্পারের ‘টু কিল আ মকিংবার্ড।’ আর একটি উপন্যাস সেই তালিকায় রয়ে গেছে ‘রেবেকা’।
কে রেবেকা? সে বেঁচে নেই। পাঠক তাকে চেনে শুধু রোগা, বেঁটে, খেটে-খাওয়া এক মেয়ের বয়ানের মধ্যে দিয়ে। রেবেকার মৃত্যুর বছর না ঘুরতে সেই মেয়েটি বিয়ে করে রেবেকার স্বামীকে। টুকরো টুকরো কথা জুড়ে তার সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হয় রেবেকা — অভিজাত, ফ্যাশনদুরস্ত, গৃহসজ্জানিপুণা, উৎসব-সমারোহে প্রাণস্বরূপা, পাড়া-পড়শির নয়নের মণি। হিংসের তীব্রতায় রেবেকাকে নিঃশেষে মুছে দিতে চায় রোগা মেয়েটি। আবার প্রতি মুহূর্তে স্পর্শ করতে চায়। রেবেকার হস্তাক্ষর, জামাকাপড়, অজস্র চিহ্ন দেখে আর মেয়েটি ভাবে, তবে এই রকম ছিল সে। এই ভাবে কাঁধের উপর ওয়াটারপ্রুফ ঝুলিয়ে নিত, ফোন তুলে হুকুম দিত কাজের লোকেদের।
ভালোবাসার উপন্যাসের ভীড়ে হিংসা দিয়ে মোড়া অন্য ধরণের উপন্যাস এই রেবেকা। লেখক ডাফনে দ্যু মরিয়ে ইংরেজি সাহিত্যের খুব উঁচুমানের লেখক, তা বলা চলে না।কিন্তু কিন্তু আশ্চর্য তাঁর কাহিনীর বিন্যাস, গল্পের মোড়ে-মোড়ে চমক তৈরির পারদর্শিতা। কাহিনীর এই অবিশ্বাস্য উত্থান পতন পাঠককে নিশ্বাস ফেলতে দেয় না।
গল্পের এক প্রধান চরিত্র প্রাসাদপ্রতিম ‘ম্যান্ডারলি।’ পেল্লায় উঁচু রডোডেনড্রনের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা গাড়ি-রাস্তার শেষে বাড়ি। পশ্চিমের ঘরগুলো থেকে দেখা যায় সমুদ্র, পূর্বের উইং থেকে অপরূপ বাগান, ‘হ্যাপি ভ্যালি’। কলমের গুণে বৃষ্টি-ধোয়া অ্যাজেলিয়ার গন্ধ আসে পাঠকের নাকে। ম্যান্ডারলির মর্নিং রুম, ডাইনিং রুম, লাইব্রেরিতে ফোল্ডিং টেবিলে শুভ্র টেবিলক্লথ পেতে চা পর্ব, সে হলো ইংরেজ আভিজাত্যের গোধূলিবেলা। ম্যান্ডারলি বাড়িটি ডি উইন্টার পরিবারের, কিন্তু সৌন্দর্য, গ্ল্যামারের জন্য গোটা কাউন্টির গৌরব।

সেই ম্যান্ডারলির মালিক, বিয়াল্লিশ বছরের সুপুরুষ, বদমেজাজি ম্যাক্সিমিলিয়ান ডি উইন্টার একুশ বছরের স্কুলছাত্রী মেয়েকে বিয়ে করলো। এই দ্বিতীয় স্ত্রী কাহিনীর বক্তা, কিন্তু তার নামের উল্লেখ নেই। হয়তো তার ব্যক্তিত্বের অভাব বোঝাতেই। শস্তার জামা-জুতো, ন্যাতানো চুল, আড়ষ্ট স্বভাব, আদবকায়দা সম্পর্কে অজ্ঞতা নিয়েই তৈরী

এই চরিত্রটি। সে কেবল ভাবে, সবাই পিছনে মুখ টিপে হাসছে। বলছে, ‘‘শেষে একে বিয়ে করল ডি উইন্টার? রেবেকার পরে!’’
রেবেকার কোনও ছবি নেই ম্যান্ডারলিতে, কিন্তু প্রতি মুহূর্তে সে আছে। তার রাতপোশাক ঝুলছে আলমারিতে, রুমালে তার সুরভি। বাড়ি-ঘরের সজ্জা, ডিনারের মেনু, সব রেবেকার নির্দেশ-মাফিক চলছে। বাড়ির প্রধান পরিচারিকা মিসেস ড্যানভার্স মালকিনের স্মৃতি আঁকড়ে বেঁচে আছে। নবাগতার প্রতি তার তীব্র বিদ্বেষ। ‘‘আমি কী দোষ করেছি?’’ প্রশ্ন করে নাজেহাল তরুণী। উত্তর আসে, ‘‘তুমি রেবেকার জায়গা নিতে চাও।’’। রেবেকা অনন্য, কিন্তু অতীত। রেবেকার রূপ-গুণে চিরমুগ্ধ ‘ড্যানি’-র কাছে কী অসহ্য সে চিন্তা! তরুণী স্ত্রীকে খোলা জানলার কাছে নিয়ে গিয়ে সে বলে, ‘‘তুমি কখনও ম্যান্ডারলির মালকিন হতে পারবে না। যা শেষ হবেই, তাকে শেষ করো। ঝাঁপ দাও নিচে।’’
দ্যু মরিয়ে গল্পটি লেখা শুরু করার সময়ে কিছু চরিত্র ভেবেছিলেন, আর ঠিক করেছিলেন যে ক্রমাগত ঘটবে ‘ক্র্যাশ ব্যাং’। সত্যিই একের পর এক ধাক্কায় প্রেমের উপন্যাস হয়ে ওঠে ক্রাইম থ্রিলার। ক্রমে স্পষ্ট হয়, রেবেকার সৌন্দর্য, সুরুচির পিছনে ছিলো বাঁধনছেঁড়া লাম্পট্য। অভিজাত বিয়ে ছিল তার স্বেচ্ছাচারিতার পাসপোর্ট। ভিক্টোরীয় ধাঁচের স্বামীও তার ব্যক্তিত্ব আর বুদ্ধির কাছে হার মানতে বাধ্য হয়। মৃত্যুর পরেও স্বামীকে নিয়ন্ত্রণ করে চলে রেবেকা।
রেবেকার মৃত্যুরহস্য যে দিন জানা যায়, সেই রাতে আগুনে শেষ হয়ে যায় ম্যান্ডারলি। উপন্যাসের যা প্রথম বাক্য, ‘কাল রাতে স্বপ্ন দেখলাম, আমি ম্যান্ডারলিতে ফিরে গিয়েছি,’ তা আসলে সমাপ্তি। ম্যান্ডারলি, মিসেস ড্যানভার্স, আর এই প্রথম বাক্যটি, ‘রেবেকা’ পড়লে এই তিনটি কেউ ভুলতে পারে না। ‘রেবেকা’ থেকে ফিল্ম করেন আলফ্রেড হিচকক। তবে রেবেকা’র চরিত্রের ছোঁয়া পেতে হলে বইটি পড়ার কোনো বিকল্প নেই।
দ্যু মরিয়ের জীবনের সঙ্গে তাঁর নভেলের অনেক মিল। তাঁর প্রবল আকর্ষণ ছিল কর্নওয়ালের ‘মেনাবিলি’ নামে প্রাচীন একটি বাড়ির প্রতি। দীর্ঘ দিন ভাড়া নিয়ে ছিলেন, শেষে মামলায় হেরে ছেড়ে দিতে হয়। আর রেবেকা? রেবেকার মধ্যেও দ্যু মরিয়ের ছায়া রয়েছে। তাঁর টমবয় স্বভাব, বোট চালানোর নেশা, ছোট চুল, রেবেকার মতোই। ছায়া দাম্পত্য হিংসেরও। তাঁর স্বামীর প্রাক্তন প্রেমিকা ছিলেন জ্যান রিকার্ডো। পদবীর আদ্যাক্ষর R লিখতেন বড় করে, লেজটা লম্বা আর বাঁকানো। জ্যান আত্মহত্যা করেন, কিন্তু দ্যু মরিয়ে সন্দেহ করতেন যে স্বামী তাঁর প্রতি আকৃষ্ট। ওই বাঁকানো R হয়ে উঠেছে রেবেকার স্বাক্ষর। সেই স্বাক্ষর-লেখা একটি বইয়ের পাতা কুটিকুটি করে ফেলে দ্বিতীয় স্ত্রী। আগুন লাগায় টুকরোগুলোতে। R অক্ষরটা আগুনের শিখায় যেন আরও বড়, আরও কালো হয়ে ওঠে।
আশি বছর পূর্তিতে প্রকাশ পেয়েছে বইয়ের বিশেষ সংস্করণ। তার মলাটে সাদা কাপড়ের উপর সাদা সুতোয় এমব্রয়ডারি করা একটি অক্ষর, R। নির্লজ্জ, নিঃশঙ্ক রেবেকা বেঁচে আছে আজও।

সাহিত্য ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা
ছবিঃ গুগল