তবুও সন্ধ্যা আসে…

‘‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতোন
সন্ধ্যা আসে;
ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;’’

সন্ধ্যা হয় না, সন্ধ্যা আসে।ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে চিল প্রস্তুতি নেয়। কী সেই প্রস্তুতি? এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া কঠিন। সময়ের বিভাজন রেখায় সন্ধ্যাকাল বড় অদ্ভুত এক সময়। বিকেলের উদাসী আলো ফুরিয়ে কর্মক্লান্ত দিনের উপর সব নিভে যাবার দাগ টেনে দেয় যেন সন্ধ্যা। জীবনানন্দ দাশের অমোঘ অনুভূতি সন্ধ্যাকে করে তুলেছে রহস্যময়।
সন্ধ্যাকাল কী মানুষের মনকে বিষন্ন করে তোলে? নাকি দিনের ক্লান্তি ফুরিয়ে নতুন করে জেগে ওঠার প্রস্তুতি তৈরী করে ভেতরে? কবি টি. এস এলিয়ট তাঁর কবিতায় লিখেছিলেন, চলো, আমরা যাই/ যখন সন্ধ্যা অপারেশন টেবিলে নিথর রুগীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে আকাশে।সন্ধ্যা আমাদের মনের মধ্যে কী ভাবে ধরা দেয়, পৃথিবীর আলো নিভে আসার এই প্রক্রিয়া কেমন প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় আমাদের মনে? প্রশ্ন অনেকগুলো,কিন্তু উত্তরের দেখা মেলা ভার। তবুও বিষয়টি নিয়ে প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো দেশে বিদেশে কয়েকজন বিশিষ্ট মানুষকে। তারা কেউ প্রখ্যাত অভিনয় শিল্পী, কেউ নন্দিত নাট্যকার, কেউ খ্যাতিমান ফুটবল তারকা, এবং কেউ প্রখ্যাত গায়ক। তাদের কথায় নানা উত্তর মিলেছে। সেসব নিয়ে এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজন।

সন্ধ্যা আমার প্রিয় এক সময়

শম্পা রেজা, সঙ্গীত ও অভিনয় শিল্পী

গান আর অভিনয় নিয়ে ব্যস্ত শম্পা রেজা।পাশাপাশি আছে সংসারের ব্যস্ততা।প্রশ্নটা করতেই হাসলেন। ভাবলেনও কয়েক সেকেন্ড।মনের মধ্যে কথাগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে বললেন, ‘ছোটবেলায় সন্ধ্যা ছিলো ঘরে ফেরার সময়। তাই ভালো লাগতো না। খেলা ফেলে ঘরে ফেরা কারই বা ভালো লাগে। কিন্তু ফিরতেই হবে। আকাশ বার্তা পাঠাতো ঘরে ফেরার। ক্রমে যত বয়স বেড়েছে সন্ধ্যা নানা অবয়ব নিয়ে মনে ধরা দিয়েছে। কিন্তু এখন? এখন এই নাগরিক জীবনে সন্ধ্যা, রাত অথবা দুপুর সব কেমন জানি একাকার হয়ে গেছে। টের পাওয়ার আগেই সময়টা ফুরিয়ে যায়। কিন্তু সন্ধ্যাকে আমার ভালো লাগে।
একটা সময়ে সন্ধ্যাবেলা থাকতো নানা ধরণের সামাজিক অনুষ্ঠান। জড়িয়ে থাকতাম গানে। সন্ধ্যা প্রেম অথবা অভিসারের সময় হয়েও এসেছে। এখন এই শহরে বড় বড় বাড়ি আকাশ দখল করে ফেলেছে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে নেমে আসা সন্ধ্যাকে ভালো করে দেখাও যায় না। কিন্তু গোধুলী লগ্ন আমার খুব প্রিয়। এই সময়ে বাইরে থাকলে আমি আকাশ দেখি। মনে হয় নানা রঙ দিয়ে কেউ আকাশের গায়ে ছবি আঁকছে। এই যে আলো তার রঙ বদলে ক্রমেই অন্ধকার হয়ে আসে সেটা দেখতে ভীষণ ভালো লাগে।দিন আর রাতের সংযোগ সময় এই সন্ধ্যা। আমার প্রিয় এক সময়। কিন্তু তাকে দেখতে চাইলেও আজকাল দেখতে পারি না’।

সামসুল আলম মঞ্জু সাবেক ফুটবলার

সন্ধ্যাকে তুলনা করা যায় হাস্নুহেনা ফুলের সৌরভের সঙ্গে
এক সময় বাংলাদেশের ফুটবল তারকা। খেলেছেন মোহামেডান এবং আবাহনী ফুটবল ক্লাবে। উদ্দাম, ঝলমলে তারুণ্য তখন আমাদের ফুটবলে। সামসুল আলম মঞ্জু এখন আমেরিকা প্রবাসী। মাঝে মাঝে ফিরে আসেন প্রিয় স্বদেশে। ফোন করতেই উদাত্ত কন্ঠ শোনা গেলো। কুশল আলাপের বেড়া টপকে শুরু হলো সন্ধ্যা নিয়ে সংক্ষিপ্ত সংলাপ আমাদের।
মঞ্জু বললেন, ‘সন্ধ্যা সময়টা আমার কাছে বিষন্নতা নিয়ে আসে না কখনোই। এই সময়টা আমার কাছে প্রিয়জনের কাছে ফেরার সময়। আসলে বরাবরই আমি সন্ধ্যার পক্ষে। সন্ধ্যা আসলে শান্তির সময়, আনন্দের সময়। সন্ধ্যাকে তুলনা করা যায় হাস্নুহেনা ফুলের সৌরভের সঙ্গে, তুলনা করা চলে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত নারীর সঙ্গে।
সারাদিনের কাজের পর সন্ধ্যা আমার কাছে অবসরের ঘ্রাণ নিয়ে আসে।কেউ কেউ সন্ধ্যার আগমনে বিষন্ন বোধ করেন। আমার কাছে সন্ধ্যা চিরকালই আলো জ্বলা সময়।সন্ধ্যাবেলা আলো জ্বলে ওঠে আঁধার দূর করতে। তাই সন্ধ্যা আমার ভালোলাগার সময়।’


তবুও সন্ধ্যা আসে

কাওসার চৌধুরী চলচ্চিত্র নির্মাতা

কাওসার চৌধুরী চলচ্চিত্র নির্মাতা। তারচেয়ে বড় পরিচয় প্রাণখোলা এক মানুষ। সন্ধ্যা নিয়ে আমাদের আলোচনা সূত্রপাত ঘটলো জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন দিয়ে। আলোচনায় ঘুরে ফিরে এলেন রবীন্দ্রনাথ। আমাদের কথোপকথন চলতেই থাকলো এভাবে-সন্ধ্যার মত এত কাংখিত, এমন রোমান্টিক এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা- জগতে আর দুটি নেই।
সেই ভোর থেকে পাতায় পাতায় আলোর নাচন লাগিয়ে গোধুলিতে এসে বিদায় নেয় সূর্য! এ যেন অভিসার শেষে কোন রাজকুমারীর অন্তঃপূরে ফিরে যাওয়া, যখন তষ্কর প্রেমিকের কেবল চেয়ে থাকা ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকেনা!

সন্ধ্যা আসলে বিদায়ের, বিরহের। আবার প্রত্যাশারও বটে।
প্রতিটি সন্ধ্যা-ই কিন্তু নিশ্চিত করে আগামী এক তরতাজা-সকালের।
টাটকা সকাল। যেখানে ধুসর নেই, নেই কোন শংকা!

সেই ছোটবেলার এক শীতের সন্ধ্যা।
আমি তখন গ্রামের ইশকুলে থ্রি কিংবা ফোর-এ পড়ি। আমাদের বাড়ির উত্তর পশ্চিমে পুকুর পাড়ে ছিল একটি বাঁশঝাড়। সূর্য যখন পাড়ে বসতো, শীতের সেই আগত-সন্ধ্যায় বাঁশঝাড়ে পাখীর কিচিরমিচিরে মুখরিত হত চারিধার! এ সময়ে বাবার চোখে ফাঁকি দিয়ে চলে যেতাম সেই পুকুরপাড়ে। নানা বর্ণের পাখীর নানা ডাকে মন্ত্রমুগ্ধের মত উপভোগ করতাম স্বর্গীয় সেই দৃশ্য। সূর্য ডুবে যেতো কোন ফাঁকে! মসজিদ থেকে ভেসে আসতো আজানের সুর। আজান শেষ হতে না হতেই শোনা যেতো হিন্দু পাড়ায় কাঁসার ঘন্টা আর শাঁখের শব্দ; মেয়েদের উলুধ্বণি!
আমাদের বাড়ি থেকে হিন্দুপাড়া মাত্র ৫০০ গজ দূরে।
মাঝখানে ফসলি মাঠ। শীতের সন্ধ্যায়, গ্রামের দুরন্ত ধান-কুড়োনির দল নাড়ার আগুনে ধান পুড়িয়ে খই বানাতো। নাড়ার নিভে আসা আগুনের ধোঁয়া আর খই-এর মৌ মৌ গন্ধ অনাবিল এক নেশা তৈরী করতো সেই সময়! ধোঁয়ার কুণ্ডলি, আকাশে অস্ত যাওয়া সূর্যের রক্তিম আভা, পাখীর কিচিরমিচির, আজান আর উলুধ্বণি- অন্যরকম একটি আবহ তৈরী করতো আমার শৈশবে!

আহা রে শৈশব, হায় রে সেই সোনালী সন্ধ্যা-
‘সোনার খাঁচায়’ আর রইলোনা!

কবিগুরুর ভাষায় বলি–
“যদিও সন্ধ্যা আসিছে মন্দ মন্থরে,
সব সংগীত গেছে ইঙ্গিতে থামিয়া,
…………………..
তবু বিহঙ্গ, ওরে বিহঙ্গ মোর,
এখনি, অন্ধ, বন্ধ কোরো না পাখা” ।।

সন্ধ্যা আমাকে মগ্ন করে

মাসুম রেজা নাট্যকার

মাসুম রেজা এখন ব্যস্ত ঈদের নাটক লেখা নিয়ে। অবশ্য নাটক লেখা নিয়ে সবসময়ই ব্যস্ত থাকেন তিনি। বাংলা একাডেমী পুরস্কার পাওয়া এই নাট্যকারের লেখা নতুন মঞ্চ নাটক ‘সুরগাঁও’ সম্প্রতি দর্শকদের মাঝে সাড়া ফেলেছে। প্রশ্নটা শুনে উচ্ছল গলায় বললেন, ‘সন্ধ্যাবেলা আমি কোথাও থাকি না। সোজা ফিরে যাই আমার শৈশবে।ছোটবেলায় বাড়ির উল্টোদিকে একটা বাঁশবাগান ছিলো। বিকেলের আলো কাটিয়ে সেই বাঁশবাগানের ওপর দিয়ে ধীরে আঁধার নামতো, সন্ধ্যা হতো। সেই সন্ধ্যার স্মৃতিটা আমাকে এখনো ছুঁয়ে থাকে। আমাকে মগ্ন করে।
জানতে চেয়েছিলাম সন্ধ্যাকাল তাকে বিষন্ন করে তোলে কি না? উত্তরে জানালেন, ‘আজকাল কৈশোরের স্মৃতি আমাকে বড্ড বেশী আলোড়িত করছে। অনেক কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। সন্ধ্যা নামলে আমি সেই কৈশোরে ফিরে যাই। সেখানেই থাকি। সন্ধ্যা আমার মনকে বিষন্ন করে না।তবে কখনো ঘুম থেকে উঠে যদি দেখি সন্ধ্যা হয়ে গেছে তখন কেমন যেন কষ্ট বোধ করি।সেই অনুভূতিটা ঠিক বোঝানো যাবে না।

আমার সন্ধ্যায় মেঘে মেঘে স্মৃতিরা জানালা খোলে

সুরজিৎ চ্যাটার্জি, ব্যান্ড শিল্পী ও মিউজিশিয়ান, কলকাতা

পশ্চিমবঙ্গের ব্যাস্ত ব্যান্ড শিল্পী ও মিউজিশিয়ান সুরজিৎ চ্যাটার্জি। ফোনে কলকাতায় কথা হচ্ছিল। সন্ধ্যা নিয়ে প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনের কথা শুনে বললেন, ‘চমৎকার আইডিয়া! সন্ধ্যে নিয়ে এতো কিছু বলার আছে কোনটা রেখে কোনটা বলি।এত স্মৃতি এডিট করা খুবই কষ্টকর।’ তারপর নিজের মতো করেই নিজে বিনিময় করলেন সন্ধ্যা নিয়ে একান্ত কিছু অনুভূতি।
সন্ধ্যে তুমি কার? আপাতত আমার।আর আমার সন্ধ্যা ডানায় ডানায়।আমার সন্ধ্যায় মেঘে মেঘে স্মৃতিরা জানালা খোলে।সন্ধ্যা কিছু বলেনা।চুপ করে বসে থাকে কখনও বীরভূম রামপুর হাটের রেল কোয়াটারের ঘুলঘুলির চড়ুই পাখির বাসায়।কখনও শেয়ালদার এক নাম্বার প্লাটফর্মের পাশে চায়ের দোকানের গরম চায়ের চুমুকে।কখনও ভবানীপুরের বারান্দার মানিপ্ল্যান্টের হলুদ-সবুজ পাতায়।কখনও নাকতলায়,মালঞ্চে আর এখন রুবী হাসপাতালের পাশে রাজডাঙ্গায়। কত সন্ধ্যা চুপ করে দেখলো আমায় কত জায়গায়। আমি তো পরিব্রাজক আর আমার সন্ধ্যার গানের সূর কখনও দুঃখের কখনও আনন্দের আর কখনও যে কি আমি অনেক সময় নিজেই বুঝিনা।
বীরভূমের সন্ধ্যায় ফুটবল খেলে কাদা মেখে বাড়ি ফেরা। মা বলতো -‘এতো দেরী, কোথায় খেলতে গিয়েছিলি?’ -‘চাদমারির মাঠে মা।’ -‘বলবি তো? আমি চিন্তা করছি। যাও হাত-পা ধুয়ে পড়তে বসো।’ পড়তে বসার কথা বলতে গেলে মা তুই থেকে তুমিতে চলে আসতেন।মানে ওটা মার আদেশ। বাবা পুলিশে চাকরী করতেন।সারাক্ষন ব্যাস্ত।তাই আমার মা আর দিদি ঘেরা জীবন ছিলো। সারাদিন যা-ই করি না কেন সন্ধ্যা মানে ছিলো হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসা।যখন উত্তর কলকাতার শিয়ালদাতে এলাম, তখন আমি ক্লাশ সেভেনে।পড়াশোনার সঙ্গে সন্ধ্যায় এসে পড়লো দিদির গানের মাস্টারমশাই।দিদি গান শিখতো আমি তবলা বাজাতাম।সপ্তাহে দুইদিন আসার কথা কিন্তু ষাটোর্ধ মাস্টারমশাই আমাদের এতো ভালোবাসতেন যে চারদিনও চলে আসতেন।তাই দিদির জন্য আমার একটা পাপ করতে হতো।দরজার কিহোল দিয়ে দেখে দিদি তিরিং বিরিং করে লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকে বলতো,-‘এইতো কালকেই এতক্ষন প্র্যাকটিস করলাম, আ জ আমি কিছুতেই পারবো না।’ অগত্যা আমাকে দরজা খুলে মাস্টারমশাইকে মিথ্যে বলতে হতো, -‘ দিদি তো একটু বেরিয়েছে। -‘ওহ কখন ফিরবে?’ -‘দেরী হবে মনে হয়। পিসির বাড়ি গেছে।’ -‘ওহ আচ্ছা, ঠিক আছে পরে আসবক্ষন।’ মাস্টারমশাই চলে যেতেন।জানিনা আমি কতটা অভিনয় করতে পারতাম, আর আসল ব্যাপারটা উনি বুঝতেন কিনা? একদিন সন্ধ্যাবেলাতে একই ভাবে আমি বললাম -‘দিদি তো একটু বেরিয়েছে। মাস্টারমশাই চলে যাচ্ছিলেন হঠাৎ ঘুরে বললেন,-‘ তোমারও তো তবলাটা বাজানো হচ্ছে না?’আমি সুবোধ বালকের মতো মাথা নেড়ে বললাম-‘সে-ই তো।’ -‘আচ্ছা চলো আজ বরং আমি গান গাই তুমি তবলা বাজাও।তাহলে তোমার প্র্যাকটিস হবে।’ দিদি পাশের ঘরে চুপ করে বসে আর আমার সেই সন্ধ্যা…!সেই সন্ধ্যায় মাস্টারমশাই কত গান গেয়েছিলেন আমার মনে নাই।একের পর এক।শুধু মনে আছে ঘন্টা দুয়েক আমি বাজাতে বাজাতে তবলার উপর ঢুলে পরেছিলাম।মাস্টারমশাই বললেন,-‘ঘুম পেয়েছে?’ -‘কই নাতো।’ -‘ আচ্ছা তাহলে রাগ আশাভরির একটা বন্দিশ করি।অনেকদিন গাওয়া হয়নি।’ সেদিন প্রায় তিন ঘন্টা তবলা বাজাতে হয়েছিলো।বাজাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম মাস্টারমশাই আজ প্রতিশোধ নিচ্ছেন।তিনদিন দিদির সঙ্গে কথা বলিনি।দিদিকে শেষ পর্য্ন্ত কুড়ি টাকা দিয়ে আমার মানভঞ্জন করতে হয়েছিলো।
সন্ধ্যা তো রোজ আসে, আসবেই।যখন কমলীনির সঙ্গে আমার প্রেম হলো তখন আমার আর্থিক অবস্থা শোচনীয়।ট্রাক্সিতে চড়ার পয়সা নেই, সিনেমায়ও নিয়ে যেতে পারতাম না।কি ভরসায় যে আমার সঙ্গে প্রেম শুরু করেছিলো ওপরওয়ালাই জানেন। পয়সা ছিলোনা বলে আমাদের প্রেম ছিলো সন্ধ্যায় রাস্তায় হাটা।তা নিয়ে গানও লিখেছিলাম পরে ‘আমার রাস্তা ভালো লাগে সাদা কালো রঙ্গিন, দুস্তর দিশেহারা কেমন সীমাহীন, আরো ভালো লাগে তোমার সাথে সেই রাস্তায় সারাদিন।’ এ জীবেনের প্রায় সমস্ত সন্ধ্যা কিছু না কিছু দিয়েছে তার নিজের মতো করে।কখনও হার কখনও জিৎ।কিন্তু এ জীবনে একটা সন্ধ্যার সঙ্গে আমি কোনদিন কথা বলবো না।কিছুতেই না।যে সন্ধ্যা বছর দু’য়েক আগে আমার মাকে নিয়ে চরে গেলো।সন্ধ্যা ছয়টা দশ। গেলো তো গেলোই আর কোনদিন এলো না।একঘর লোক যখন আমায় শান্তনা দিচ্ছিলো যে,‘ মা তোমার সঙ্গেই আছে।’ আমি তখন জানতাম যে মা আর কোনদিনই ফিরে আসবে না।সন্ধ্যা ছয়টা দশ মাকে নিয়ে চলে গেলো। আজ আমি পুরুলিয়ার একটা গ্রামে এসেছি , কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা করতে।হঠাৎ করে বিকেল পাঁচটায় সন্ধ্যা নেমেছে। সন্ধ্যা কিনা জানিনা অন্ধকার হয়ে এসেছে। খুব মেঘ ডাকছে। আর এক্ষুনি বৃষ্টি নামলো মুষলধারে।সমস্ত আবর্জনা ধুয়ে যাচ্ছে।আমার চোখ ফুটে দেখা পৃথিবীর প্রথম সন্ধ্যা আমার মায়ের দেয়া। সন্ধ্যা তুমি কার ? আমার প্রত্যেকটা সন্ধ্যা আমার মায়ের। লিখতে লিখতে কখন চোথ ভিজে এসেছে খেয়াল করিনি।এখন মেঘ ডাকছে ঘুরঘুরিয়ে।চোখের জল আর বৃষ্টির জলের পার্থক্য বুঝতে পারছি না।শুধু এই দূযোর্গের সন্ধ্যায় মনে হচ্ছে, এই পৃথিবীর সমস্ত মায়েরা যেন নিরাপদে থাকে।

আমাদের এই নগর জীবনে সন্ধ্যা হারিয়ে যাচ্ছে

মৌটুসী বিশ্বাস,অভিনয় শিল্পী

মৌটুসী বিশ্বাস ব্যস্ত নাটকের কাজ নিয়ে। তাকে ধরা গেলো একটি শ্যুটিং হাউজে। এটা সেটা কথার পরে সন্ধ্যাবেলা নিয়ে মৌটুসী জানালেন তার প্রতিক্রিয়া। মৌটুসী জানালেন, সন্ধ্যাবেলা যখন বাসায় থাকেন এক ধরণের বিষন্নতা তাকে আক্রান্ত করে। এই অনুভূতিটা তার ছোটবেলা থেকেই হয়। মৌটুসী বললেন, ‘সন্ধ্যাবেলা আগে মানুষ বাড়ি ফিরতো। এখন সন্ধ্যা টের পাই ঘড়ির কাটায়। আমাদের এই নগর জীবনে সন্ধ্যা হারিয়ে যাচ্ছে। তেমন করে আর সন্ধ্যাবেলাটাকে অনুভব করতে পারি না। আগে আমাদের চারতলা বাড়ির জানালা খুলে রাখতাম। জানালা দিয়ে সন্ধ্যা দেখতাম। এখন মশার যন্ত্রণায় জানালাও খুলে রাখা কঠিন। তবে যখন কাজে থাকি সন্ধ্যা হলে মনের মধ্যে ছুটির ঘন্টা বাজতে থাকে, কাজ শেষ হওয়ার সময়টা এগিয়ে আসে। তখন আনন্দই লাগে।
বৃষ্টির সন্ধ্যা মৌটুসীর প্রিয়। কথায় কথায় ফিরে গেলেন সেই চট্টগ্রামে বসবাসকালের স্মৃতিতে। বললেন, ‘তখন বর্ষাকালে সকাল থেকে বৃষ্টি নামতো একটানা। তখন সেই বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যা খুব প্রিয় ছিলো ’
অবসর সময়ে রাত জাগতে ভালোবাসেন মৌটুসী। কারণ নির্জনতা তার প্রিয়, প্রিয় নৈঃশব্দও। তবে রাতের পাশাপাশি সুযোগ পেলে সন্ধ্যাবেলাকেও উপভোগ করেন তিনি।সময়টা বড় অদ্ভূত সুন্দর তার কাছে।

প্রাণের বাংলা প্রতিবেদক